মেইন ম্যেনু

‘অকাজের’ আইনজীবী সমিতি!

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের একটি কল্যাণ তহবিলে কোটি টাকা জমা থাকলেও তা কোনো কাজেই লাগে না বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা। তহবিলের টাকা আইনজীবীদের কল্যাণে ব্যবহার করার কথা থাকলেও বার্ষিক ভোজ ও বিভিন্ন প্রণোদনা অনুষ্ঠান ছাড়া কল্যাণমূলক কাজে এ অর্থ ব্যয় হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, অনেক সিনিয়র আইনজীবীই বলছেন, এসব সমিতি আইনজীবীদের কল্যাণে কখনোই কাজে লাগেনি!

আইনজীবীরা জানান, তহবিলে প্রতিমাসে লাখো টাকা জমা হচ্ছে। বছর শেষে এই টাকার পরিমাণ কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উন্নত চিকিৎসাসহ নানা কাজে প্রয়োজন হলেও এই টাকা আইনজীবীদের কাজে আসছে না।

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন গঠন করা হয় এর সদস্যদের সমস্যা দেখভাল ও তাদের আইনি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অধিকতর দক্ষ করে তোলার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সংগঠনটি এই দু’টির প্রথমটিতে আশিভাগ ও দ্বিতীয়টিতে শতভাগ ব্যর্থ।’

তিনি বলেন, ‘আমার ৫৪ বছরের মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতায় এই সমিতির দ্বারা কোনো আইনজীবীর কল্যাণ হয়েছে বলে শুনিনি। এটা খুবই দুঃখজনক। বছরে হাজার হাজার টাকা জমা দিই। সুপ্রিমকোর্টে কোটি টাকা জমা হয়। অথচ সদস্যরা এ থেকে তেমন উপকার পান না।’

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে আইনজীবীদের মৌলিক সমস্যা সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীরা টাকার অভাবে বই কেনা, নিজেদের চিকিৎসা করাতে না পারাসহ অন্যান্য সমস্যারও সমাধান পাচ্ছেন না।’

বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে বার রয়েছে। জেলার আইনজীবীরাই এ বারের সদস্য। জেলার প্রতিটি বার ও সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নিয়ে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। দেশের প্রায় এক লাখ আইনজীবীর প্রতিষ্ঠান এটি। প্রতিষ্ঠানটি আইন বিভাগে স্নাতক শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আসতে তালিকাভুক্তির সুবিধা দিয়ে থাকে। এই একটি বিষয় ছাড়া বাকি সব কাজেই সুপ্রিমকোর্ট বারের সঙ্গে বাংলাদেশ বারের সব কার্যক্রমে মিল রয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের অভিযোগ রয়েছে। আইনজীবীদের সুবিধার কারণ দেখিয়ে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ চট্টগ্রামে বারের একটি শাখা খুলে সেখানে বেশ কিছু টাকা ট্রান্সফার (হস্তান্তর) করেন। পরে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন নিজেও সুপ্রিমকোর্টের সোনালী ব্যাংকের বার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা হস্তান্তর করেন এবং নিয়ম বহির্ভূতভাবে একটি বেসরকারি ব্যাংকে বারের সব লেনদেন করার দায়িত্ব দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকের বার কাউন্সিলের অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু টাকা আইনজীবীদের কল্যাণ তহবিলে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে আমার জানামতে সেই টাকার পরিমাণ ৫০ কোটি নয়, এক কোটির কাছাকাছি।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে নতুন যে ব্যাংকটির (সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক) শাখা খোলা হয়েছে তা সরকার ও বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুসারে করা হয়েছে। সোনালী ব্যাংকে প্রচুর ভিড় হয়। এতে আইনজীবীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাই দীর্ঘ অপেক্ষার পর অ্যাটর্নি জেনারেল ও বার কাউন্সিলের সচিব (সাবেক জেলা জজ) আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে এই শাখাটি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার সুযোগ নেই।’

সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সরকারের সহযোগিতার অভাবে বারের কোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, মফস্বলের আইনজীবীদের থাকার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের পাশেই একটি আবাসিক হল করা হয়েছিল, যেখানে বেশ কয়েকজন আইনজীবী দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বাস করছেন। এমনকি হলের প্রতিদিনকার খাবারের জন্য ২০ হাজার টাকার অনুমোদন থাকলেও সেখানে নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বার কাউন্সিলের নব-নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান আইনজীবী আব্দুল বাসেত মজুমদার  বলেন, ‘মফস্বলের আইনজীবীদের জন্য বারের বিছানাপ্রতি ২০০ টাকায় যে গেস্ট হাউজটি রয়েছে তার খরচ পুষিয়ে খাবারের মান ভালো রাখা কঠিন। এই গেস্ট হাউজটির পরিধি বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারের কাছে ভবনের পরিধি ও জায়গা বাড়ানোর অনুরোধ করব।’

তিনি আরো বলেন, ‘বার কাউন্সিলে আইনজীবীদের জমানো টাকা ছাড়া অন্য কোনো অনুদানের টাকা নেই। জীবিত অবস্থায় এই টাকা যেন ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায় সে প্রয়াস নিয়ে আমরা একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলাম। কিন্তু এর ফলে আইনজীবীদের জমানো সামান্য টাকা জীবদ্দশায় শেষ হয়ে গেলে মৃত্যুর পর তার আর কিছুই থাকে না।’

সরকারের কাছ থেকে অনুদান পাওয়া গেলে কল্যাণ তহবিলের টাকা আইনজীবীদের জীবদ্দশাতে খরচ হতে পারে বলে অভিমত দেন তিনি।বাংলামেইল