মেইন ম্যেনু

ইপকো প্রকল্প: বাড়বে যানজট, হুমকিতে নিরাপত্তা

অচল হবে শাহজালাল বিমানবন্দর!!

নিরাপত্তা শঙ্কা, যানজট ও ভবিষ্যৎ জায়গা সংকুলানের চিন্তা না করেই হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল ফটক ঘেঁষে নির্মিত হচ্ছে বিশাল পাঁচ তারকা হোটেল। একই প্রকল্পের আওতায় সেখানে গড়ে উঠছে নয় লাখ বর্গফুটের একটি আন্তর্জাতিকমানের শপিং মল। সঙ্গে আরও একটি তিন তারকা হোটেল। প্রায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন এ প্রকল্পের কাজ শেষের পথে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি চালু হলে এক কথায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে বিমানবন্দরের। ভবিষ্যতে সরকারের জন্য এটি হবে গলার কাঁটা।

সরেজমিন দেখা গেছে, নির্মাণাধীন হোটেল ও শপিং মলের কারণে বিমানবন্দরের একাংশ ঢেকে গেছে বললেই চলে। বিশেষ করে উত্তরা থেকে আসার পথে এখন বিমানবন্দরের পরিবর্তে আগে চোখে পড়ছে বিশাল এ অবকাঠামোটি। প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি ইপকো বলেছে, হোটেল দুটি চালু হতে কিছু সময় লাগলেও আগামী জুনের মধ্যে শপিং মল চালু হয়ে যাবে।

এদিকে বহুল আলোচিত এ প্রকল্প নিয়ে শেষ পর্যায়ে এসেও চলছে নানা সমালোচনা। দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের পাশে এমন একটি স্থাপনা- কেউই মেনে নিতে পারছেন না। যৌক্তিক এবং বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরছেন তারা। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, এটি তো অনেক বছর আগেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সব দিক বিবেচনা করেই করা হয়েছে। এখন সমস্যার কথা বলে লাভ নেই। টানেল নির্মাণ হলে আর যানজট থাকবে না বলে দাবি করেন তিনি। বিমানবন্দরের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ভবিষ্যতে বিমানবন্দর সম্প্রসারণে স্থান সংকুলান কীভাবে হবে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, হবে, হবে; জায়গা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের এত অল্প দূরত্বে এমন একটি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও কোনো সমস্যা হবে না বলে দাবি করেন মন্ত্রী।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইপকো প্রকল্প চালু হলে বিমানবন্দরের সামনের মহাসড়কে যানজট কয়েকগুণ বাড়বে। এমনিতে বিমানবন্দরের এ মোড়ে সারাদিন যানজট লেগেই থাকে। একদিকে বিমানবন্দর থেকে বের হন বিমানের যাত্রীরা, অন্যদিকে রাস্তার বিপরীতে রেলস্টেশন থেকে বের হন রেলের যাত্রীরা। আছে রেলক্রসিং সিগন্যাল। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ার প্রবেশমুখ হিসেবে ব্যবহƒত হয় উত্তরায় এ মহাসড়কটি। সেই সঙ্গে মহানগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী গণপরিবহনের চাপ তো আছেই। সবমিলিয়ে প্রতিদিন অসহনীয় যানজটে নাভিশ্বাস উঠে মানুষের। হিমশিম খেতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হোটেল ও শপিং মল চালু হলে মানুষ ও পরিবহনের চাপ কয়েকগুণ বাড়বে। শপিং মল কিংবা হোটেলে যাওয়া-আসার জন্য প্রধান সড়ক ছাড়া বিকল্প কোনো পথের ব্যবস্থা না করায় মানুষের সমাগমে রাস্তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। এতে অচল হয়ে পড়তে পারে বিমানবন্দরে যাতায়াতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর প্রস্তাবিত থার্ড টার্মিনালের সঙ্গে বিমানবন্দরের কানেকটিং পয়েন্টের সরাসরি সংযোগ, মহাসড়ক থেকে ওভার পাস দিয়ে টার্মিনালে পৌঁছানো বা রেলস্টেশন থেকে নিচের টানেল দিয়ে টার্মিনালে পৌঁছানোর যে কাঠামো রয়েছে তাও কবে হবে ঠিক নেই। যানজট কমাতে এটি আদৌ কতখানি কার্যকর হবে, সেটিও বলা মুশকিল। কেউ কেউ বলছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পটি ইপকো প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও হতে পারে। বিমানবন্দরে আগাগোড়াই চোরাচালান ও নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রশ্ন রয়েছে। প্রায়ই সোনাসহ বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্যের চোরাচালানের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসী হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ বিমানবন্দরকে সুরক্ষার ক্ষেত্রে এত অল্প দূরত্বে এমন একটি ‘পাবলিক প্লেস’ কতখানি যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এমন একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে যদি কেউ বিমান টার্গেট করে গুলি চালাতে চায়, তবে সেটি তেমন কোনো কঠিন কাজ হবে না। যেহেতু এই বিল্ডিংয়ের সিকিউরিটির দায়িত্ব বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নয়, সেহেতু কড়া নিরাপত্তাও নিশ্চয় থাকবে না। বহু দেশে বিমানবন্দর ভিত্তিক ফাইভ স্টার হোটেল ও শপিং মল থাকে; কিন্তু এত কম দূরত্বে গা ঘেঁষে কোথাও এমন হতে দেখিনি। আর যেহেতু হোটেলে বসেই যাত্রীরা বিমানে চেক-ইনের সুযোগ পাবেন, সেহেতু লাগেজ চেকিং কতখানি সুষ্ঠু ও কার্যকরী হবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বিমানবন্দরে বর্তমানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে মাত্রারিক্ত যাত্রী ও কার্গো বহন করা হচ্ছে। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে বিমানযাত্রী বৃদ্ধির শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে যেখানে ৬-৭ শতাংশ সেখানে বাংলাদেশে যাত্রী প্রবৃদ্ধির হার ৮-৯ শতাংশের বেশি। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ৬০-৬৫ লাখ যাত্রী বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করছে। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সে কারণে শিগগিরই সেখানে বহুল আলোচিত থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরুর প্রক্রিয়া করছে সরকার। টার্মিনাল নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউশিন করপোরেশনই এক সমীক্ষায় ক্রমবর্ধমান যাত্রীর বিপরীতে বিমানবন্দরের এ অক্ষমতার চিত্র তুলে ধরে। এমনকি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে হারে যাত্রী বাড়ছে এতে ২০২০ সাল নাগাদ এর সংখ্যা দাঁড়াবে এক কোটি। এক যুগ পর হবে অন্তত দেড় কোটি। তখন থার্ড টার্মিনাল দিয়েও কাজ হবে না। করতে হবে নতুন প্ল্যান, নতুন টার্মিনাল ও অবকাঠামো।

তখন ইপকো প্রকল্পকে দেওয়া ১৫ একর জমির জন্য আফসোস করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ থাকবে না। কেননা বাস্তবতা হলো থার্ড টার্মিনালের কাজটি অনেকাংশে আটকে আছে জায়গার কারণে। টার্মিনালের পরিকল্পনা কাঠামোর মধ্যে কিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পড়ায় সেগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতি জেনেও ইপকোকে বিমানবন্দর সীমান্তের মধ্যে এখনই কেন এতখানি জমি দেওয়া হলো সেটিও সবার প্রশ্ন।

জানা গেছে, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে নেওয়া হয় এ পরিকল্পনা। তখন ইপকো সিভিল এভিয়েশনের ১৫ একর জমির ওপর দুটি হোটেল ও একটি শপিং মল করার প্রস্তাব দেয়। এরপর সরকারের সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে ইপকোকে জমি ভাড়া দেয় সিভিল ইভিয়েশন। পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর নানা জটিলতায় কাজ বন্ধ থাকে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে ফের এটি চালু হয়। যদিও শুরু থেকেই বিপক্ষে ছিলেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।