মেইন ম্যেনু

অজ্ঞাত লাশ ফেলার নিরাপদ জোন !

রাজধানী এবং এর আশপাশের এলাকায় হত্যার পর লাশ কোথায় ফেলতে খুনীরা নিরাপদ ভাবেন? এমন প্রশ্নের এক কথায় উত্তর-ঢাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা সাভার এবং আশুলিয়া। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মন্তব্য এটি।

ওই কর্মকর্তার মতে, রাজধানীর প্রবেশদ্বার এবং শিল্প কারখানার বিষয়টি মাথায় নিলে গুরুত্বপূর্ণ এদুটি উপজেলায় জনবসতি ব্যাপকহারে বাড়ছে। যে কারণে, এদুটি ‍উপজেলায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও খুনের ঘটনাও দিন দিন বাড়ছে। এমনকি অন্যত্র হত্যার পর নিরাপদ ভেবে লাশ পেলে যাওয়া হচ্ছে আশুলিয়া কিংবা সাভার এলাকায়।

গত ছয় মাসের এক হিসেব থেকে জানা যায়, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ২২ টি। সর্বশেষ বুধবার সকালে সাভারের আশুলিয়ার কুড়গাঁও এলাকার পুরাতন পাড়া থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে বস্তাবন্দি দুটি অজ্ঞাত লাশ।

ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম জানান, বুধবার সকালে আশুলিয়ার কুড়গাঁওয়ের পুরাতনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী রাজ্জাকের টিনশেড বাড়ির ভেতরে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ দেখতে পান স্থানীয় লোকজন। বিষয়টি আশুলিয়া থানায় জানানো হলে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।

একই সঙ্গে বাড়ির মালিক রাজ্জাকসহ চারজনকে আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, রাজ্জাকের বাড়ির একটি টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে আরো এক ব্যক্তির বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়।

এবিষয়ে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) মোস্তফা কামাল বলেন, বস্তাবন্দি লাশ দুটি উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই লাশ দুটির পরিচয় বের হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আশুলিয়া এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলাম। তিনি জানান, আশুলিয়া হচ্ছে অপরাধ করার নিরাপদ জায়গা। এখানে বেশিরভাগ বসবাসকারী গার্মেন্টেকর্মী। তারা সন্ধ্যার মধ্যেই বাসায় ঢুকে ক্লান্ত দেহ নিয়ে রাত কাটান। আর বাইরে অপরাধ চক্রের সদস্যরা নিরাপদেই অপরাধ সংঘটিত করে চলে যায়।

নূর ইসলামের ভাষায়, আশুলিয়া এলাকা থেকে এ পর্যন্ত যত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তার বেশিরভাগই ওই এলাকার নয়। অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ এখানে এনে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। তাছাড়া ব্যাংক ডাকাতিসহ চুরি-ছিনতাইতো আছেই। অনেক সময় ছিনতাই করতে গিয়েও একাধিক খুনের ঘটনাও ঘটিয়েছে দুবৃত্তরা।

চলতি বছরের শুরুতেই সাভার ও আশুলিয়া এলাকার পৃথক দুটি স্থান থেকে শহিদুল ইসলাম (৪৪) নামে এক ব্যবসায়ী এবং মনিরুল ইসলাম (২৮) নামে এক পোশাক শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সুত্রে জানা যায়, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মনসুর মার্কেটের খান এন্টারপ্রাইজ নামে একটি রেন্টএ কার অফিস থেকে পরিবহন ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামের (৪৪) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশের পায়ের রগ কাটা ও রশিতে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

অন্যদিকে আশুলিয়ার ডেন্ডাবর উত্তরপাড়ার একটি বাসা থেকে মনিরুল ইসলাম (২৮) নামে এক পোশাক কারখানার শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি আশুলিয়ার স্কাইলাইন নামে একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলায়।

কাছাকাছি সময়ে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল থেকে দুই নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় চামড়া শিল্প নগরীর পেছনের একটি খোলা মাঠ এবং আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের মুন্সীপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে অজ্ঞাত ওই দুই নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ধারণা, দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও ওই দুই নারীকে হত্যা করে লাশ গুম করার জন্য ফেলে রেখে যায়। তাদের পরিচয় আজ পর্যন্ত সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। গত ১৮ মার্চ সাভার ও আশুলিয়া থেকে অজ্ঞাত এক যুবক ও এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ সুত্রে জানা যায়, স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে আশুলিয়া ইউনিয়নের চানগাঁও এলাকার একটি বাঁশঝাড়ের ভেতরে থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে সাভার পৌর এলাকার ছায়াবিথী মহল্লা থেকে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাত তরুণীর লাশ।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ওই যুবক ও তরুণীকে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ গুম করতেই নিরাপদ ভেবে এ এলাকায় ফেলে রেখে গেছে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনার ১০দিন পর গত ২৮ মার্চ সাভারের হেমায়েতপুরের যাদুরচর ও আশুলিয়ার গোরাট এলাকা থেকে আরো দুটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘হত্যাকারীরা কাউকে হত্যার পর লাশ ফেলার জন্য নিরাপদ জায়গার খোঁজ করতে থাকে। মনে হচ্ছে, সেই হিসেবে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া এলাকায়ই এখন বেশি পছন্দ অপরাধীদের। এটি বন্ধ করতে হলে পুলিশি নজরদারি আরো জোরদার করতে হবে।’

ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার হাবীবুর রহমান হাবীব বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই বাইরের অপরাধীরা সাভার-আশুলিয়া এলাকায় লাশ ফেলে যায় বলে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। ফলে ওইসব মামলাগুলোর তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি হয় না। তাছাড়া, সাক্ষীর অভাব, লাশের পরিচয় না পাওয়া এবং আসামীকে খুঁজে না পাওয়ার কারনে এসব হত্যাকান্ড অধরাই থেকে যায়।রাইজিংবিডি