মেইন ম্যেনু

অনেক সমস্যার কথা জানালেন বিচারকরা

অনলাইন ডেস্ক
বেতন-ভাতা শতভাগ বাড়ানোর বিষয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বাধীন জুডিসিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ কয়েক দফা দাবি জানিয়েছেন নিম্ন আদালতের বিচারকরা। গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে ঢাকায় আয়োজিত জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে কর্মরত বিচারকরা বলেন, কয়েক বছর ধরে বিচারকরা বেতন-ভাতা, এজলাস, আবাসন, যানবাহনের সংকটসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোতে তাদের সমস্যার কথা সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্ত এখনও এসব সমস্যার সমাধান হয়নি। অনেক এলাকায় ন্যায়বিচার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিচারকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পাশাপাশি মামলাজট নিরসনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করেন বিচারকরা।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিচার বিভাগীয় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন পর্বে আয়োজিত সম্মেলন সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চলে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সভাপতিত্বে প্রথম পর্বে সম্মেলন উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। দ্বিতীয় পর্বে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো.আবদুল ওয়াহহাব মিঞার সভাপতিত্বে বিচার বিভাগের ডিজিটালাইজেশন ও সংস্কার নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পরে তৃতীয় ও শেষ পর্বে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে নিম্ন আদালতের বিচারকরা তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। এতে বক্তব্য রাখেন দিনাজপুরের জেলা জজ হোসেন শহীদ আহমেদ, সিলেটের বিভাগীয় বিশেষ জজ ফাহমিদা কাদের, মানিকগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন নিগার, ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) শেখ হাফিজুর রহমান, ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এইএম ইসমাইল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ টু আই প্রজেক্টে কর্মরত যুগ্ম জেলা জজ এম মোয়াজ্জেম হোসেন, খুলনার সিনিয়র সহকারী জজ মারুফ হোসেন প্রমুখ।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিচারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্মেলনের তৃতীয় পর্বে প্রধান বিচারপতিকে কাছে পেয়ে নিম্ন আদালতের বিচারকরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। পরে এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়টি সরকারের নজরে নেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, বিচারকদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সমস্যাগুলো দ্রুত সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নজরে নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।
এর আগে বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক জেলা জজ বলেন, গত ২২ এপ্রিল বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে পে কমিশন সুপারিশ করেছে। সাত মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১২ সালে বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিষয়ে পে কমিশন যে সুপারিশ করেছিল, অনেক অপেক্ষার পর সেটি বাস্তবায়িত হলেও পুরোটা হয়নি। এ কারণে এবারও সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে বিচারকদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
দেশের ১৭১টি আদালতে এজলাস নেই- এমন তথ্য জানিয়ে এক জেলা জজ বলেন, এজলাস সংকটের কারণে বিচারকরা পুরোটা সময় বিচারকাজ করতে পারছেন না। একজন বিচারক এজলাস ছেড়ে দিলে তবেই আরেকজন বিচারক ওই এজলাসে বিচারকাজ পরিচালনা করেন। অর্থাৎ এজলাস ভাগাভাগি না হলে বিচারকাজ বন্ধ থাকে। এসব সমস্যা মোকাবেলা করেই সংশ্লিষ্ট বিচারককে মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মাসিক প্রতিবেদন দিতে হচ্ছে।
সম্মেলনে বিচারকরা অভিযোগ করেন, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ কয়েকটি আদালতে পর্যাপ্ত যানবাহন ও আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় বিচারকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিকেলের পর অনেক বিচারক চৌকি আদালত থেকে জেলা শহরে এসে বসবাস করেন। একজন অতিরিক্ত জেলা জজ বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের বাসস্থান নির্মাণের নির্দেশ দিলেও এখনও সব বিচারকের বাসস্থান নিশ্চিত করা হয়নি। প্রত্যেক জেলায় কর্মরত সব বিচারককে একই স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এক স্থানে সবার বাসা হলে নিরাপত্তা ও বিচারকদের যাতায়াত দুটো ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে। এ ছাড়া সম্মেলনে একাধিক বিচারক তাদের জন্য সার্বক্ষণিক যানবাহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনে চিহ্নিত সমস্যা সমাধানের দাবির পাশাপাশি অনেক বিচারক প্রধান বিচারপতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে মামলাজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছেন। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) শেখ হাফিজুর রহমান মামলাজট নিরসনের উপায় হিসেবে আদালতে সাক্ষী হাজিরে ই-ডেস্ক চালুসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ার প্রধান কারণ সাক্ষীদেরকে যথাযথ সময়ে আদালতে উপস্থাপন না করা। আইন অনুসারে সাক্ষীদের হাজির করার বিষয়ে আদালত পুলিশের ওপর নির্ভরশীল। পুলিশ সাক্ষী হাজির না করলে আদালতে শুনানির তারিখ বারবার পেছানো হয়। এ সমস্যা সমাধানে আদালতে ই-ডেস্ক চালু করার সুপারিশ করে হাফিজুর রহমান বলেন, আইন সংশোধন করে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পুলিশ চার্জশিট দেওয়ার সময় সাক্ষীর মোবাইল নম্বরসহ ঠিকানা উল্লেখ করতে বাধ্য হয়। ই-ডেস্ক থেকে আদালতের সংশ্লিষ্টরা নির্ধারিত তারিখের আগে সাক্ষীর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন এবং আদালতে তার হাজির হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে। এতে মামলাজট অনেকাংশেই কমে আসবে।