মেইন ম্যেনু

অন্নদাশংকর রায়কে ফাঁকি দিয়েছিলেন তসলিমা

অন্নদাশংকর রায়কে ফাঁকি দিয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। কথা দিয়ে কথা রাখেননি। মৃত্যুর আগে, তখন অন্নদাশংকর খুব অসুস্থ।

তসলিমা আসবেন তাই অসুস্থ শরীর নিয়েও ভালো কাপড় চোপড় পরে সারাদিন ড্রইং রুমের চেয়ারে বসে ছিলেন অন্নদাশংকর। নার্স অনেকবার বিছানায় নিতে চেয়েছেন, রাজি হননি। নার্স বলেছিলেন, রাত হয়ে গেছে, আর হয়তো আসবে না। তারপরও তিনি নড়েননি চেয়ার থেকে। বলেছেন, না না ও আসবেই। কিন্তু সেদিন সত্যিই তসলিমা আর আসেননি।

অবশ্য বিষয়টি নিয়ে আজো অনুশোচনায় ভূগছেন তসলিমা নাসরিন। এই নিয়ে সোমবার অর্থাৎ আজ ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তসলিমা। স্ট্যাটাসটিতে তিনি এসব বিষয়ে খোলাখুলি-ই বলেছেন। তার স্ট্যাটাসটি এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হলো :

“আমাকে খুব ভালোবাসতেন অন্নদাশংকর রায়। আমি যখন বাংলাদেশে আক্রমণের শিকার হচ্ছি, তখন থেকেই তিনি আমাকে নিয়ে অনেক বলেছেন, অনেক লিখেছেন। একবার তো ঘোষণা করলেন, আমি যেন সঙ্গে পিস্তল রাখি নিজের নিরাপত্তার জন্য।

ইউরোপের নির্বাসন জীবন থেকে যখনই কলকাতায় যেতাম, চাইতেন সবার আগে তাঁর বাড়িতে যাই। দুপুরের খাবার নিয়ে বসে থাকতেন, একসঙ্গে খাবেন। কত কথা যে বলতেন, কত কথা যে শুনতে চাইতেন। শুনতে চাইতেন বেশি।

একবার তিনি আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। সেই সাক্ষাৎকারটা পুরো রেকর্ড করে নিয়ে এক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছাপিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটা নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত ছিলেন। তাঁর ছিল অসুস্থ শরীর। চলতে ফিরতে পারতেন না। অথচ আশ্চর্য, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে ‘আমার মেয়েবেলা’র প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করতে দিব্যি চলে এলেন। ওই শরীর নিয়ে তিনি তখন বাড়ির বাইরে কোথাও যান না। তাঁকে কোলে করে এনে চেয়ারে বসাতে হয়, কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতে হয়। আমাকে ভালোবাসেন বলেই তিনি অনুষ্ঠানে আসতে রাজি হয়েছিলেন।

ওখানেই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত ভাষণটি দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ তসলিমার মা, পশ্চিমবঙ্গ তসলিমার মাসি। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি হয়না, কিন্তু তসলিমার বেলায় মনে হচ্ছে মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি..’। আমি কি তাঁর এই স্নেহ ভালোবাসার মর্যাদা ঠিক ঠিক দিতে পেরেছিলাম? আমার মনে হয় না।

বিদেশ থেকে কলকাতার কত কারও জন্য কত উপহার নিয়ে আসতাম। প্রতিবার ভুলে যেতাম অন্নদাশংকর রায়ের কথা। আমি কলকাতায় এসেছি শুনেই তিনি খবর পাঠাতেন, একবার যেন দেখা করতে আসি। অপেক্ষা করতেন আমার জন্য। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়তাম তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। একবার খুব অল্প সময়ের জন্য তাঁর বাড়ি গেলাম, কথা দিয়ে এলাম দু`দিন পর যাবো। দু`দিন পর এলো। যথারীতি ভুলে গেলাম যেতে। তার পরদিন গিয়ে দেখি তিনি অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন বিছানায়। আমি যে এসেছি দেখতে পেলেন না।

নার্স বললেন আমি আসবো বলে আগের দিন সারাদিন ভালো কাপড় চোপড় পরে ড্রইং রুমের চেয়ারে বসে ছিলেন। নার্স অনেকবার বিছানায় নিয়ে আসতে চেয়েছেন, রাজি হননি। বলেছেন, আজ তসলিমা আসবে। নার্স বলেছিলেন, রাত হয়ে গেছে, আর হয়তো আসবে না। তারপরও তিনি নড়েননি চেয়ার থেকে। বলেছেন, না না ও আসবেই। কথা যখন দিয়েছে আসবেই।

পরদিনের ওই অচেতন অবস্থা থেকে আর ফেরেননি অন্নদাশংকর রায়। খবর পাই, মারা গিয়েছেন। নিজেকে সেই থেকে আর ক্ষমা করতে পারিনি।”