মেইন ম্যেনু

অপারেশনের পর কেমন আছেন সেই বৃক্ষ মানব!

তিন বছরের শিশুকন্যা কাছে থাকার পরও কোলে তোলে একটু আদর করতে পারছেন না তিনি। বাবা হিসেবে এটি অনেক বেশি কষ্টের। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আকুতির চোখেমুখে তাকিয়ে থাকেন ছোট্ট মেয়েটির দিকে। কারণ তিনি অন্য সবার মতো স্বাভাবিক নন। তার কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস তাহিরাকে জন্মের পর দুবাহুতে করে কোনো দিন আদর করতে পারেননি। কিন্তু এখন স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

আবুল বাজানদার। বিরল রোগে আক্রান্ত এই মানুষটিকে আমরা বৃক্ষ মানব হিসেবে চিনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তার সেই স্বপ্ন দিন দিন যেন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।

শনিবার চিকিৎসকরা এক হাতে অস্ত্রোপচার করে ভারমুক্ত করার পর তার এ আবেগ আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এখন শুধু বলছেন, দোয়া করেন আমি যাতে স্বাভাবিক জীবনে অন্যদের মতো বাঁচতে পারি। কাজকর্ম করে আমার শিশুকে মানুষ করতে পারি।

রবিবার ১২টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের ৫১৫ কেবিনে আবুলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এমনই আবেগপূর্ণ কথা বলেন। তিনি বলেন, এক হাত এখন হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে আড়াই কেজি ভারমুক্ত হলাম। তবে, ডান হাতের ব্যান্ডেজের কারণে নড়াচড়া করতে পারছি না। ব্যান্ডেজ খুললে বুঝতে পারবো কতটা ভারমুক্ত হয়েছি।

বালিশের ওপর অপারেশন করা হাত রেখে কথা বলছেন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তখন বাম হাতে স্যালাইন চলছিল। কেবিনের মধ্যে দুটি সিটের একটিতে শুয়ে আছেন তিনি। অপর সিটে তার মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে আছেন স্ত্রী হালিমা।

কাছে থেকে সেবা করছেন মা আমেনা বিবি। মা ও স্ত্রীকে কিছুটা খুশি লাগছিল তখন। আবুল বলেন, আশা করি সুস্থ হতে পারবো। ভালো হয়ে গ্রামে ফেরার ইচ্ছা তার। তিনি জানান, আগে ভ্যান চালাতাম। এখন আল্লাহ যদি সুস্থ করেন, তাহলেও তো আগের মতো ভ্যান চালাতে পারবো না। ছোট্ট কোনো ব্যবসা করার ইচ্ছা আছে।

প্রথম দিনের অপারেশন সম্পর্কে আবুল বলেন, অপারেশনের আগে ভয়ে ভয়ে ছিলাম। শরীর অবশ করার পর আর কিছুই বুঝতে পারিনি। তিনটার পরে মা-স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়। এখন ভালো লাগছে। সকালে জুস খেয়েছেন তিনি। কেবিনে তার স্ত্রী বলেন, দশ বছর ধরে তার স্মামীকে মুখে তুলে খাইয়েছেন তিনি।

এখন স্ত্রী হিসেবে আমিও স্বপ্ন দেখছি, আমার স্বামী ভালো হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন। আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করবেন।

অপারেশনের দিন খুব ভয়েছিলাম। কি জানি হয়। এখন ভালো লাগছে। বাকি হাত-পায়ের অপারেশন ভালো মতো যাতে হয়, এজন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি। তার স্বামীর জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।

বিরল রোগে আক্রান্ত আবুল বাজানদারের এক হাতে অস্ত্রোপচার করে ভারমুক্ত করা হয়েছে গত ২০ ফেব্রুয়ারি। সাড়ে তিন ঘণ্টার অপারেশনে তার হাতের পাঁচ আঙুলের ওপর বেড়ে ওঠা অংশ ফেলে দেয়া হয়েছে। জটিল অপারেশন নিয়ে চিকিৎসকরা সংশয়ে থাকলেও শেষতক তারাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালামের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল আবুলের ডান হাতের পাঁচটি আঙুলেই অস্ত্রোপচার করেন। চিকিৎসকরা জানান, প্রথমে আবুলের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীতে অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত ছিল। অস্ত্রোপচার কক্ষে চিকিৎসকদের তাৎক্ষণিক পরামর্শে আবুলের ডান হাতের পাঁচটি আঙুলেই অস্ত্রোপচার করা হয়।

তারা ভয় পাচ্ছিলেন যে, অস্ত্রোপচারের পর আঙুলগুলো শনাক্ত করা যাবে কি না। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর আবুলের ডান হাতের আঙুলগুলো আলাদা করা গেছে। আশা করা হচ্ছে, আঙুলগুলো কাজ করবে।

চিবিৎসকরা জানিয়েছেন, পৃথিবীতে বাংলাদেশসহ এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকজনকে এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। তাদের ইন্দোনেশিয়ায়, রোমানিয়া এবং সর্বশেষ এই বাংলাদেশে দেখা গেল। এই রোগী বাংলাদেশে প্রথম।

হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে তার চিকিৎসা হবে। তার জন্য গঠন করা হয় নয় সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। চিকিৎসকদের ধারণা, আবুল বাজেদার ‘এপিডার্মোডিসপ্লাসিয়া ভেরাসিফরমিস’ রোগে আক্রান্ত। রোগটি ‘ট্রি-ম্যান’ (বৃক্ষমানব) সিনড্রম নামে পরিচিত। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে সংক্রমণের কারণে এ রোগ হয়।

খুলনার পাইকগাছার এই যুবক ১০ বছর ধরে এ রোগে ভুগছেন। তার হাত ও পায়ের আঙুলগুলো গাছের শিকড়ের মতো হয়ে গেছে এবং দিনে দিনে তা বাড়ছে। তাকে গত ৩০শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।