মেইন ম্যেনু

অবশেষে সরকারের মাধ্যমেই এমএনপি

মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি বা এমএনপি হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া যে পদ্ধতিতে গ্রাহক তার আগের নম্বর পরিবর্তন না করেই যেকোনো পছন্দের অপারেটর সার্ভিস গ্রহণ করতে পারবেন। টেলিকম অপারেটরদের মধ্যে সুষম প্রতিযোগিতা এবং গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের সব সেলফোন অপারেটরকে সাত মাসের মধ্যে মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) চালু করতে ২০১৩ সালের ১৩ জুন নির্দেশ দেয় বিটিআরসি। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, তিন মাসের মধ্যে এমএনপি সেবা চালুর জন্য সব অপারেটরকে একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করতে হবে। এ কনসোর্টিয়াম পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি সিস্টেম (এমএনপিএস) গড়ে তুলবে। কিন্তু এ পদ্ধতি কার্যকরে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর অনাগ্রহের কারণে সরকারের মাধ্যমে মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিচ্ছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)।

তিন বছর সময় অতিক্রম করলেও অপারেটরগুলো এমএনপি বাস্তবায়ন করতে না পারায় আর সময় দিতে চাচ্ছে না কমিশন। এজন্য শিগগিরই একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি। মোবাইল অপারেটরগুলোকে আরো প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছতা ও সেবার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) লাইসেন্স নিলামের পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলেও জানায় এ কমিশন (বিটিআরসি)।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি অপারেটরদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক সভায় এমএনপি বাস্তবায়নে বিটিআরসির অবস্থান সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া হয়। বার বার তাগিদ এবং তিন বছর সময় দেওয়ার পরও অপারেটরগুলো তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নেওয়ায় এবার সরকারি উদ্যোগে এমএনপি বাস্তবায়ন করতে চায় বিটিআরসি।

গুরুত্বপূর্ণ এই কাজের লাইসেন্স দেওয়ার নিলাম পদ্ধতি নিয়ে গত মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ে এক সভার আয়োজন করা হয়। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘আরো প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছভাবে অপারেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা এমএনপির লাইসেন্স ইস্যুর প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, লাইসেন্সিং পদ্ধতিতে স্বচ্ছ ও সেবার মান নিশ্চিত করতে আরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন।’

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, নিলামী নীতিমালায় অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তায় নিলামে অর্থের (দরের) পরিমাণ পরিবর্তন করা গেলেও কারিগরি যোগ্যতার ক্ষেত্রে তা অপরিবর্তিত থাকতে হবে।

নিলামের পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন আনার জন্য বিলম্ব হচ্ছে উল্লেখ করে তারানা হালিম বলেন, ‘আগামী মার্চ মাসে এমএনপি লাইসেন্সের নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। বিধি মোতাবেক এ ব্যাপারে শিগগিরই ঘোষণা দেওয়া হবে। এই শিল্পের স্বার্থে নিরপেক্ষতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য আমরা এমএনপি চালু করতে যাচ্ছি। নিলামের মাধ্যমে একটি অপারেটরকে ১৫ বছর জন্য এমএনপি লাইসেন্স দেওয়া হবে, লাইসেন্স ফি বার্ষিক ২০ লাখ টাকা। উপরন্তু, দ্বিতীয় বছর থেকে এমএনপি লাইসেন্সধারী অপারেটর সরকারকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে রাজস্ব দিতে হবে।’

একটি নিবন্ধিত বাংলাদেশি বা প্রবাসী বাংলাদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি দেশের নিলামে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে, এই প্রক্রিয়ায় যে কোনো বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশি কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতেই নিলামে অংশগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু, বিদেশি কোম্পানির শেয়ার সর্বোচ্চ ৫১ শতাংশ রাখা যাবে, কোম্পানিটিকে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করতে হবে এবং এতে বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।

বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানান, কমিশন এখন নিজে এমএনপি বাস্তবায়ন করবে। কারণ মোবাইল অপারেটরগুলোকে এমএনপি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য দুটি প্রদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়েছে। এর একটি মোবাইল অপারেটরগুলোর নেতৃত্বে কনসোর্টিয়াম মডেল এবং দ্বিতীয়টি তৃতীয় পক্ষের মডেল। এই তৃতীয় পক্ষ তারাই ঠিক করবে। অপারেটর মডেলে মোবাইল অপারেটরগুলো এই সেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যয়ভার বহন করবে।

তবে দেশে এমএনপি বাস্তবায়নে পাঁচ বছর সময় এবং ১৫ কোটি ডলার ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে অপারেটররা। কারণ এই সেবা চালু করার মতো অবকাঠামো দেশে এখনো প্রস্তুত নয় বলে উল্লেখ করেছেন তারা। এজন্যই বিটিআরসি এখন নিজ উদ্যোগে এমএনপি বাস্তবায়ন করতে চায়।

অপারেটরদের সূত্রে জানা গেছে, এমএনপি চালু আছে এমন দেশগুলোয় এটি বাস্তবায়নে গড়ে চার বছর সময় লেগেছে। কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা চালু করতে সময় প্রয়োজন। এ ছাড়া এমএনপি বাস্তবায়নে কারিগরি ও আর্থিক বেশকিছু বিষয় সংশ্লিষ্ট। সবকিছু মাথায় রেখেই এগুতে হবে।

তারা আরো জানান, একটি সিমে অপারেটররা ৩০০ টাকা কর দিয়ে থাকে। কিন্তু একজন গ্রাহক সংযোগ কেনার ৪৫ দিন পর অন্য অপারেটরে সুইচ করলে সেই সিম কর কে দেবে, কীভাবে দেবে সেই বিষয়টিও সুরাহা করতে হবে। এ ছাড়া দেশে এ নিয়ে কোনো গবেষণা বা জরিপও এখন পর্যন্ত হয়নি। দেশের অবকাঠামোও এই ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত না।

বিটিআরসি বলছে, এমএনপি চালু হয়েছে, এমন দেশগুলোয় অপারেটরের মধ্যে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি। গ্রাহক ধরে রাখতে প্রত্যেক অপারেটরই সেবার মানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সামগ্রিকভাবে লাভবান হন গ্রাহকরা।

সূত্র জানায়, কমিশন মোবাইল অপারেটরদের জন্য সেল্যুলার মোবাইল ফোন অপারেটর লাইসেন্সের নবায়নের সময় নবায়নকৃত লাইসেন্সিং গাইডলাইনে অপারেটরদের এমএনপি চালু করার শর্ত প্রদান করা হয়। এখন যেহেতু এমএনপি বাস্তবায়ন একটি সময়োপযোগী সেবা, তাই দেশের সকল মোবাইল অপারেটরকে ওই লাইসেন্সিং গাইডলাইনের শর্তাবলী পালন করা বাঞ্ছনীয়।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, এমএনপি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি ইতিমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অপারেটর নিয়োগে নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো ধরণের পরিবর্তন আসছে তা এখনো বলা যাচ্ছে না।

নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে টেলিযোগাযোগের দিক থেকে এগিয়ে থাকা দেশগুলো এমএনপি চালু করেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৭২টি দেশে এমএনপি সার্ভিস চালু রয়েছে। মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি সুবিধা প্রথম সিঙ্গাপুরে চালু হয় ১৯৯৭ সালে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানে এমএনপি সার্ভিস চালু হয় ২০০৭ সালের মার্চে। ২০১১ সালে ভারতও এই সেবা চালু করেছে।