মেইন ম্যেনু

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ও এনবিআরের ব্যাখ্যায় বেকায়দায় সরকার

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট আরোপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দেওয়া ব্যাখ্যা আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একেক রকম মন্তব্য অশান্ত করে তুলেছে শিক্ষার্থীদের। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত শুল্ক বা ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে রবিবার থেকে লাগাতার ধর্মঘট ও অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। এ আন্দোলনে ঢাকা অচল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকায় বেকায়দায় পড়েছে সরকার।

শনিবার বাংলা একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের কারণে টিউশন ফি যেন না বাড়ে তা প্রতিহতের ব্যবস্থা নাও। অর্থমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানালেও তার এই বক্তব্য মূলত নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অবস্থান নেওয়ার প্রকাশ্য ইঙ্গিত যাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে এক ধরনের উস্কানি হিসেবেই বিবেচনায় নিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।

বৃহস্পতিবার শিক্ষায় ভ্যাট আরোপের বিরুদ্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রথমে ঘোষণা ও পরে মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) দিয়ে জানানো হয়, ভ্যাট দিবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী নয়। এর পরপরই অর্থমন্ত্রী সিলেট থেকে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন একই কথা। আর ঠিক পরেরদিন শুক্রবারই তিনি আবারও কথা পাল্টে বলেন, ভ্যাট আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীদেরই দিতে হবে। এভাবে নতুন নতুন আপডেটের নামে স্ববিরোধী বক্তব্য ও বার্তায় বেকায়দায় পড়ছে সরকার।

এদিকে, অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর যতোই কথার মারপ্যাঁচে শিক্ষায় শুল্কারোপ বা ভ্যাট বসানোর ফন্দি-ফিকির চালাচ্ছেন ততোই অশান্ত হয়ে উঠছে শিক্ষাঙ্গনগুলোর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ অর্থমন্ত্রীর এসব কথাবার্তায়। পৃথক অনুষ্ঠানে পররর্তীতে উপজেলা পর্যায়েও শিক্ষায় ভ্যাট দিতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করায় সারাদেশের অভিভাবকদের মধ্যে এ বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শোনা যাচ্ছে। অনেকেরই ধারণা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপ সম্ভব হলে কিছুদিনের মধ্যেই বেসরকারি স্কুল-কলেজ এমনকী কিন্ডারগার্টেনেও ভ্যাট বসাবে সরকার। তাই অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য কোনওভাবেই আশ্বস্ত করতে পারেনি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এখন এই দাবিতে একাট্টা।তারা বলছেন, আমরা এক টাকাও ভ্যাট দিব না সেই নিশ্চয়তা চাইছি যেখানে, সেখানে নানাদিক থেকে নানা বক্তৃতা দিয়ে এ আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলা একাডেমির ওই বক্তৃতায় মুহিত বলেন, ফিস-টিস, ডেভলপমেন্ট ফান্ড ইত্যাদি ইত্যাদির মাধ্যমে ভ্যাটের টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে আমি বলেছি, তোমরা (শিক্ষার্থী) আগামী বছরের জন্য প্রস্তুতি নাও। যাতে ভ্যাটের কারণে তোমাদের ফিস আবার না বাড়ে। এটি প্রতিহত করার প্রচেষ্টা নাও।

এ বিষয়ে ছাত্রইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক সিয়াম সারোয়ার বলেন, অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্য আন্দোলনকারীদের শান্ত করার কৌশলমাত্র। সরকার সত্যিই যদি এমনটা চাইতো তবে ইতিমধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফির সীমারেখা নির্ধারণ করে দিতো। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ভ্যাট নিয়ে এনবিআরের ব্যাখ্যা ভ্যাটের মূল চেতনার পরিপন্থী। কেননা, ভ্যাট আরোপ করা হয় সেবাগ্রহীতার ওপর। সেবাদানকারী কর্তৃপক্ষ ওই অর্থ আদায় করে সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার কাজটি করে মাত্র। এ প্রসঙ্গে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারকে খুশি করতে গিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর যে বিশাল চাপ তৈরি করা হয়েছে, ছাত্রসমাজ তার প্রতিবাদ করবে বলে ধারণা ছিল না।

এদিকে, এনবিআরের চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সঙ্গে ভ্যাটের ভুল ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আরোপিত ভ্যাট বিষয়ে যে ব্যাখ্যা আপনাদের সবার কাছে পাঠানো হয়েছে, এর বাইরে কিছু বলার নেই।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এটা শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাবে। কারণ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষার্থীরাই ভ্যাট দিয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভ্যাট দিলে টিউশন ফি বাড়ানো ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না। প্রচলিত টিউশন ফির মধ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভ্যাট দিতে হলে, তাদের আয় সাড়ে ৭ শতাংশ কমে যাবে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থান সংকুলানের অভাবে বাজার বুঝে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। ধারদেনা করে, জমিজমা বিক্রি করে, বাড়তি কাজ করে অভিভাবকেরা সন্তানকে পড়াচ্ছেন। তাদের ওপর ভ্যাট আরোপ করাই সরকারের আয় বাড়ানোর চেষ্টা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, কর বা ভ্যাট বাড়াতে গিয়ে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে বিশ্লেষণও হওয়া দরকার। বাজেট প্রণয়নের পর থেকেই অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপ করা সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আরোপিত ভ্যাট শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফেলবে। এনবিআরের আরও সতর্কতার সঙ্গে এই জায়গাগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

তবে এনবিআরের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে একজন কর আইনজীবী বলেন, ‘যিনি ভোক্তা, সবক্ষেত্রে ভ্যাট দিতে হয় তাকেই। এ ধরনের ব্যাখ্যা মুঠোফোনে দিয়ে সরকারকে আরও বিপদে ফেলেছে এনবিআর। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেবা দিচ্ছে, ছাত্ররা নিচ্ছে। এক্ষেত্রে ভ্যাট প্রতিষ্ঠান দেবে, এই ব্যাখ্যা মোটেও খাটে না।’ সাম্প্রতিক যে আন্দোলন সেটাকে বিভাজিত করার জন্য এ ধরনের দায়সারা ব্যাখ্যা দিয়েছে এনবিআর বলেও তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আখতার ইমাম বলেন, ‘ভ্যাট আরোপ হবে ভোক্তাদের ওপর। টিউশন ফির সঙ্গে অতিরিক্ত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ যদি শিক্ষার্থীরা পরিশোধ করে, তবেই আমরা তাকে ভ্যাট বলতে পারি। আরোপিত ভ্যাট আসলে শিক্ষার্থীদের ওপরই যাবে। এনবিআর না জেনে ব্যাখ্যা দিয়েছে বলে আমার মনে হয় না।’

অর্থনীতিবিদ সাজ্জাদ জহির এনবিআরের ব্যাখ্যাকে অপেশাদার মন্তব্য করে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এনবিআরের পরামর্শক্রমে সরকার শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা না করেই ভ্যাট আরোপ করেছে। কোনও রকম আলাপ-আলোচনা না করে তারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে, এটা খুব দুঃখজনক। এনবিআরের কাছ থেকে এ ধরনের অপেশাদার আচরণ আশা করা যায় না।’