মেইন ম্যেনু

অলিম্পিকে কেন পদক জেতে না বাংলাদেশ?

সে সময় বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ছিলেন তিনি। প্রথমবারের মতো লাল-সবুজ পতাকা উঁচিয়ে ধরেছিলেন বিশ্বক্রীড়ার সবচেয়ে বড় আসরেও। তবে ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে গিয়ে বাংলাদেশের প্রথম অলিম্পিয়ান সাইদুর রহমান ডন বুঝতে পেরেছিলেন, অন্যদের চেয়ে কতটা বেশিই পিছিয়ে আছেন তিনি।

বুঝতে পেরেছিলেন, ১০০ ও ২০০ মিটারের প্রাথমিক হিট থেকে পরের ধাপে যাবেন, সেটির সম্ভাবনাও অনেক কম।

সম্ভাবনা বাড়বে কী করে? অনুশীলনের সুযোগ নেই, আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধারও বালাই নেই। ডনের প্রস্তুতি, নিজেকে গড়ে নেওয়ার ব্যাপারগুলো তাই বাধা পেল। অলিম্পিকে যখন যান, বয়স ছিল ২১ বছর। অথচ তিনি দৌড়ের জন্য কৃত্রিম ট্র্যাকে প্রথম নেমেছিলেনই তার দুই বছর আগে। ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর কোনো স্পাইকই ছিল না, ১৭ বছরের আগে পাননি কোনো কোচের সান্নিধ্য।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কোনো কোচের অধীনে কাজ করা, কিন্তু তখন অনুশীলন করতেন বাড়ির পাশের ঘাসের মাঠে। ১০০ ও ২০০ মিটারের মাপটাও নিতেন হাতের মাপে। এরপর স্নিকার (দৌড়ের জন্য বিশেষ জুতো নয়) বেঁধে শুরু হয়ে যেত দৌড়, কোনো বন্ধু বা আত্মীয়কে বলতেন ঘড়ি দেখে তাঁর নিজের তৈরি করা ফিনিশিং লাইন শেষ করতে কত সময় লাগে সেটি বলার জন্য।

ইয়াহুকে সাক্ষাৎকারে ডন বলছিলেন, ‘কীভাবে দৌড়াতে হয়, সেটি আমাকে শেখানোর কেউ ছিল না। বড় বড় পদক্ষেপ কীভাবে ফেলতে হয়, সেটি কেউ শেখায়নি। ওয়েট ট্রেনিং, ধৈর্য, নমনীয়তা…কিছুই শেখানোর মতো কেউ ছিল না। সত্যি বলতে, আমি শুধু অন্যদের দৌড় দেখতাম। বিভিন্ন অ্যাথলেটের বই পড়ে শিখতে চাইতাম। তাঁরা কীভাবে কী করছেন, কী খাচ্ছেন—সবকিছু। তবে বেশ কঠিন ছিল ব্যাপারটা।’

ঠিকঠাক প্রস্তুতি না নিতে পেরে সেই অলিম্পিকে ১০০ মিটারে সবচেয়ে বেশি সময় নিয়েছিলেন ডন, ২০০ মিটারে শেষ দিক থেকে দ্বিতীয়। তবু বাংলাদেশে ফেরার সময় একটা গর্ব তাঁর সঙ্গী ছিল, একটা অচলায়তন তো ভেঙেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে মার্চ পাস্টে যাওয়া, দুটি ইভেন্টে দৌড়ানো…ডনের আশা ছিল, তাঁর কীর্তি বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের কাছে অলিম্পিক-স্বপ্নটাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে। হয়তো সেই পথ ধরে কয়েক বছর পর আরও বড় সাফল্যও আসবে।

ডন বলছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সরকার আরও অর্থায়ন করবে, অনেক ছেলেমেয়ে অনুপ্রাণিত হবে…সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খেলাধুলার জগতে সেটি দুর্দান্ত সূচনা হয়ে থাকবে।’

এত বছর পর পেছনে ফিরে দেখে মনে হয়, এর চেয়ে ভুল ধারণা আর হতে পারত না ডনের।

বাংলাদেশের অংশ নেওয়া প্রথম সেই অলিম্পিকের পর ৩২ বছর কেটে গেছে। উন্নতি বলতে এই সময়ে জনসংখ্যার হিসাবে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু অলিম্পিকে

সাফল্য? শূন্য। পদকের ঘরটা এখনো শূন্যই পড়ে আছে। পদক তো দূরে থাক, কোনো অ্যাথলেটকে ঘিরে সেটির আশা জাগবে, এমন পরিস্থিতিও কখনো তৈরি হয়নি। শীতকালীন কোনো অলিম্পিকে বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেটের অংশ নেওয়া হয়নি। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকেও যে ৪৩ জন অংশ নিয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাফল্য—নিজের ইভেন্টে ২১তম হওয়া।

এটা ঠিক, জনসংখ্যার হিসেব অলিম্পিক সাফল্যের জন্য কোনো ভিত্তি নয়। তবু এমন জনসংখ্যা নিয়ে আর কোনো দেশ পদকহীন নেই। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ৪০টি দেশের মধ্যে, বাংলাদেশ ছাড়া, শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত কঙ্গো (জনসংখ্যার হিসেবে ১৮ বৃহত্তম) আর মিয়ানমার (২৬তম) কোনো পদক পায়নি। এর মধ্যে মিয়ানমার কিছুদিন আগেই সামরিক শাসন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে।

রিও অলিম্পিকেও আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো খবর নেই। কিন্তু কেন প্রথম অলিম্পিকের ৩২ বছর পর এসেও সেই একই গল্প বারবার শুনতে হচ্ছে? কেন এখনো অংশগ্রহণই বড় কথা বাংলাদেশের জন্য?

অনেকগুলো কারণই আছে এর। প্রথমত, শুধু ক্রিকেটের প্রতিই বাংলাদেশের মানুষের অন্ধ ভালোবাসা। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ২২ গজে ব্যাট-বলের লড়াইকে ঘিরে, সবচেয়ে বেশি দর্শক টানে এই খেলাটি। মাশরাফি-সাকিব-মুস্তাফিজরা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় তারকা। ছোট ছোট শিশুরাও তাঁদের মতো হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই বেড়ে ওঠে। কোনো একদিন জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন, জাতীয় তারকা হওয়ার স্বপ্ন।

ক্রিকেটের প্রতি মানুষের এই ভালোবাসার ফসল—স্পনসরদের এই খেলার দিকেই ঝোঁকা। সরকারও এই খেলাতেই সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছে, যুব প্রকল্পগুলো অন্য খেলাগুলোর চেয়ে ক্রিকেটেই কিছুটা ভালোভাবে চলে, সুযোগ-সুবিধা ও খেলোয়াড়দের বেতন-ভাতা ক্রিকেটেই কিছুটা সম্মানজনক। এ সবকিছুর প্রভাবেই হয়তো বাংলাদেশ জাতীয় দল এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে। সাফল্য আসছে। চক্রবৃদ্ধির অঙ্কের মতো আকর্ষণও তাই ক্রিকেটকে ঘিরেই জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শাইক সিজার। তিনিই ইয়াহু স্পোর্টসকে বলছিলেন, ‘ওখানে সব সম্পদ যেন বিনিয়োগ করা হচ্ছে ক্রিকেটকে ঘিরে। অনেক অনেক আগে, এই জায়গাটা ফুটবলের দখলে ছিল। কিন্তু এখন সেটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।’

ক্রিকেটের উন্নতি মানে অন্য খেলার অবনতি নয়, তবে ক্রিকেট ছাড়া অন্য খেলাগুলো স্পনসর-সরকারের নজরে ওভাবে পড়ছে কি? একজন তরুণ প্রতিভাবান ক্রিকেটার ভবিষ্যতে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সম্মান ও অর্থের আশা করতে পারে। কিন্তু অন্য খেলার সবচেয়ে বড় তারকার ক্ষেত্রেও হয়তো ব্যাপারটি তেমন নয়। স্বাভাবিকভাবেই, বড় বড় স্পনসরদেরও আগ্রহ ক্রিকেটকে ঘিরেই বেশি। ফুটবলে অবশ্য এখন অল্প পরিসরে হলেও স্পনসর আসছে। কিন্তু অন্য খেলাগুলোয়? অলিম্পিকে যে খেলাগুলোতে বাংলাদেশ অংশ নেয়, সেগুলোর বেশির ভাগেই একজন অ্যাথলেটের জন্য শুধু খেলে জীবিকা চালানো প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। নিয়মিত লিগ এই খেলাগুলোতে এখনো স্বপ্নের নাম, আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়াও তাই একটা প্রহসন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

জ্যাভলিনে দেশের নয়বারের চ্যাম্পিয়ন আরিফুল হক বললেন, ‘সাঁতার, ফুটবল, ভলিবল, ট্র্যাক—এই খেলাগুলো এখন আর সরকার বা স্পনসরদের কাছ থেকে খুব বেশি সাহায্য পায় না। এ জন্য অ্যাথলেটরাও এই খেলাগুলোতে আসতে আগ্রহী নন। দরিদ্র এই দেশে যেখানে পরিবারগুলোর আয় অনেক কম, কেউই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সন্তানকে খেলাধুলা শেখাতে সমর্থ নয়।’

ক্রিকেটের বাইরে উঠতি তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণের তেমন সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক মঞ্চে অংশগ্রহণের আগের সার্কাসও হাস্যকর। দৌড়বিদ, সাঁতারু, বা অলিম্পিকে অন্য খেলাগুলোতে যাঁরা খেলতে যান, সাধারণত আন্তর্জাতিক আসরের এক থেকে তিন মাস আগে থেকে শুরু হয় তাঁদের ক্যাম্প। সেখানেও এখনো ইলেকট্রনিক টাইমিংয়ের বদলে হাতঘড়িতেই চলে সময়ের হিসেব। ক্যাম্পের বাইরে থাকার সময়টাতেও ট্র্যাক, জিম, শুটিং রেঞ্জ—এগুলোতে যাওয়ার সুযোগ-সুবিধাও সবার থাকে না। ফল তো চোখের সামনেই।

আর অলিম্পিকে দলের সঙ্গে কে যাবেন সেটিও এক নাটক। অ্যাথলেটের চেয়ে বেশি থাকেন ফেডারেশনের কর্মকর্তা, কিন্তু কোচ থাকেন না বললেই চলে। রিওতেই ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দলে সাতজন অ্যাথলেটের জন্য সাঁতার বা দৌড়ের জন্য কোনো কোচ ছিলেন না।

চার বছর আগে লন্ডনেও চিত্রটা ছিল একই। সেই অলিম্পিকে অংশ নেওয়া সিজার বললেন, ‘অলিম্পিকে অ্যাথলেটদেরই আসার কথা। ওরাই এখানে আসার জন্য সারা জীবন কষ্ট করে। কিন্তু ২০১২তে আমরা বাংলাদেশের হয়ে পাঁচজন অ্যাথলেট এলাম, সঙ্গে প্রতিনিধি ছিলেন ২০ জন। আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি কী হচ্ছে, কিন্তু কিছু একটা তো ধোঁয়াশাপূর্ণ ছিলই।’

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে এমন গল্পগুলো নিয়েই ইয়াহু স্পোর্টসের কাছে হতাশার কথা বললেন প্রথম অলিম্পিয়ান সাইদুর রহমান। তাঁর অলিম্পিক অংশগ্রহণের পর ৩২ বছরে যেখানে আরও এগোনোর কথা ছিল, সেখানে আরও পেছাচ্ছে বাংলাদেশ।

প্রমাণ? এই অলিম্পিকেই বাংলাদেশের দ্রুততম মানব যে টাইমিং করেছেন, সেটি ১৯৮৪ অলিম্পিকে সাইদুর রহমানের করা টাইমিংয়ের চেয়েও বেশি।

এমন অবস্থায় পদকের আশা করাই তো নিতান্ত বালখিল্য। সে আশার পথেও সমস্যাগুলো কী, সেটি সবাই জানে। কিন্তু সমাধানের পথগুলো কী, সেটি কে খোঁজে?