মেইন ম্যেনু

আইএসের ভিডিওর উৎস সন্ধানে গোয়েন্দারা

রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিসানে নিহত পাঁচ জঙ্গির বক্তব্য সংবলিত একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) বাংলাদেশের ওপর এই নতুন ভিডিও প্রকাশ করে। ১৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে গত জুলাইয়ে গুলশানে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গির কথাবার্তা, হামলার ঘটনা ও আইএসের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ শুরু করেছে।

কথিত ওই ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ধর্মীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজনের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্সের প্রধান রিটা কাৎজ জানান, গুলশান হামলায় জড়িতদের নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে আইএস। এ ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্বনেতাদের ছবি ব্যবহার করে তাদের ‘কাফের’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া গণমাধ্যমের সমালোচনা করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময় জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে কথিত আইএসের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে জঙ্গিদের হাস্যোজ্জ্বল ছবি পাওয়া যায়।

গুলশান হামলার প্রায় তিন মাসের কাছাকাছি সময়ে এসে হামলাকারী সন্দেহভাজন জঙ্গিদের মৃতদেহ গত বৃহস্পতিবার দাফন করা হয়। এর পরই গত শুক্রবার ১৫ মিনিটের এ ভিডিও প্রকাশ করে আইএস। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ডিসি মহিবুল ইসলাম জানান, ভিডিও দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এটা গুলশান হামলার আগে তৈরি করা। এটির উৎস ও জড়িতদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে, সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ নিয়ে কাজ করছে। এরই মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় জঙ্গিদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। উগ্রপন্থিদের নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করতে, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হয়তো জঙ্গিরা তাদের দুর্বলতা লুকাতে এসব অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

ভিডিও পর্যবেক্ষকারী একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ভিডিওর একটি অংশের কিছু বক্তব্যে কণ্ঠ দিয়েছে সাবেক নির্বাচন কমিশনার শফিউর রহমানের ছেলে তাহমিদ রহমান শাফি। তার বিরুদ্ধে উগ্রপন্থায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মূল ভিডিও গুলশান হামলার আগে তৈরি করা হলেও একটি অংশে হামলার পরের কিছু দৃশ্য সংযোজন করা হয়। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, হামলার আগে ভিডিও এবং অডিও তৈরি করে রাখে জঙ্গিরা। পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে হামলায় জড়িতরা আগেই ছবি ধারণ করে রেখেছিল। জঙ্গিদের ‘মিডিয়া শাখা’য় যারা কাজ করে তারাই এসব তৎপরতার তথ্য নানাভাবে প্রচার করে। নব্য জেএমবির সদস্য নুরুল ইসলাম মারজান, বাশারুল্লাহসহ অনেকে সংগঠনের মিডিয়া শাখায় কাজ করেছে। এক সময় তামিম চৌধুরী সংগঠনের মিডিয়া শাখা দেখভাল করত।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে সাংবাদিক তাসনিম খলিল ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে বলেন, ভিডিওতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ধর্মীয় নেতার কথা বলা হয়েছে। যেমন শোলাকিয়া ঈদ জামাতের ইমাম ফরিদউদ্দীন মাসউদকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, তিনি আসলে সরকারের পক্ষের লোক। এ ছাড়া শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দু’জনকেই উদ্দেশ করে ভিডিওতে বলা হয়েছে, তারা তাগুদ বা ইসলামের শত্রু।

ভিডিওটির দ্বিতীয় অংশে দেখা যায়, গুলশান হামলার ঘটনায় নিহত পাঁচ জঙ্গি কালো পাঞ্জাবি ও মাথায় বিশেষ ধরনের স্কার্ফ পরে আইএসের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একজন একজন করে তারা যখন কথা বলছিল, তখন তাদের হাতে একে-৪৭ রাইফেল ও ছুরি দেখা যায়। জঙ্গিরা কোরআন-হাদিস থেকে বিভিন্ন উদৃব্দতি তুলে ধরে। গুলশানে রেস্তোরাঁয় হামলা করার পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরে তারা। নতুন ভিডিওতে নিহত জঙ্গিদের পোশাকি নাম ব্যবহার করা হয়।

গুলশান হামলার ঘটনার প্রায় তিন মাস পর এসে কেন এ ভিডিও প্রকাশ করা হলো এবং এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে- এসব প্রশ্নে তাসনিম খলিলের বক্তব্য, আইএসের ও এ ধরনের জঙ্গি সংগঠনগুলো তাদের কোনো সদস্য কোথাও হামলা করে নিহত হলে নিহতদের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর এ ধরনের ভিডিও প্রচার করে থাকে। গুলশানে হামলাকারী জঙ্গিদের ক্ষেত্রেও তা-ই করা হয়েছে। তাদের মৃতদেহ দাফন হওয়ার পর ভিডিও প্রকাশ হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এরা সাধারণত কোনো জঙ্গি তৎপরতা বা হামলা চালানোর আগে কিছু বার্তা ভিডিও করে রাখে। ধারণা করা হচ্ছে, গুলশানে হামলাকারীরাও বাংলাদেশের কোনো গ্রাম থেকে ভিডিওটি করে। ভিডিওতে বাচ্চাদের চিৎকার ও গরু-বাছুরের ডাক শোনা গেছে।

গুলশান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনার ছবিও ভিডিওতে আছে, সে ব্যাপারে তাসনিম খলিল বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলায় নিহতদের মৃতদেহ পড়ে আছে- এমন ছোট একটা দৃশ্য ভিডিওতে দেখা যায়। এতে আমি একটু অবাকই হয়েছি। কারণ এ ভিডিওর ব্যাপারে আইএসের অ্যাকসেস থাকার কথা নয়। এ ধরনের ভিডিও সাধারণত বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী করে এমন ঘটনার পরে। সেটি আইএসের ভিডিওতে কীভাবে এলো, তা একটা রহস্য।খবর সমকালের।