মেইন ম্যেনু

আইএস উত্থানে ব্লেয়ারকে সতর্ক করেছিল গাদ্দাফি

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে আগেই সতর্ক করেছিলেন লিবিয়ার ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি। এমনকি এই জঙ্গি সংঠনটি ইউরোপ আক্রমণ করবে বলেও ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন তিনি।

৭ জানুয়ারি ফাঁস হওয়া ব্লেয়ার এবং গাদ্দাফির মধ্যকার ২০১১ সালের একটি ফোনালাপের অনুলিপি থেকে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এতে দেখা যায়, আল কায়েদার ব্যাপারেও ব্লেয়ারকে সতর্ক করেছিলেন গাদ্দাফি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে ফোনালাপের এসব অনুলিপি।

ফোনে কর্নেল গাদ্দাফি টনি ব্লেয়ারকে বলেছিলেন, যদি তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তবে ইসলামি চরমপন্থীরা লিবিয়া দখল করে নেবে এবং পরবর্তীতে তারা ইউরোপ দখলের অভিযানে নামবে। আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওসামা বিন লাদেন এবং আল কায়েদার ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ব্যাপারেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

প্রথম ফোনালাপের অনুলিপি। এতে জঙ্গিদের ইউরোপ আক্রমণের কথা বলা হয়েছে

প্রথম ফোনালাপের অনুলিপি। এতে জঙ্গিদের ইউরোপ আক্রমণের কথা বলা হয়েছে

ব্লেয়ারকে সতর্ক করে দিয়ে গাদ্দাফি বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই ইতিমধ্যে উত্তর আফ্রিকায় জিহাদিরা ব্যাপক ধ্বংসজ্ঞ চালাচ্ছে। যদি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় তবে একটি ‘ইসলামি রাজ্যের’ উত্থান ঘটবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে শরণার্থীর স্রোত আসতে থাকবে।

২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ফোনে দুইবার গাদ্দাফিকে ‘নিরাপদ স্থানে’ চলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন টনি ব্লেয়ার। যুক্তরাজ্যের বর্তমান সংসদের সাংসদরা মনে করেন, গাদ্দাফির এসব সতর্কবার্তাকে ‘ভুলভাবে প্রত্যাখ্যান’ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আইএসের উত্থান এবং লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইরাকের অসংখ্য মানুষ গৃহহারা হওয়ার পর গাদ্দাফির ভবিষ্যৎবাণীর তাৎপর্য বোঝা গেছে।

২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সোয়া ১১টায় দেয়া প্রথম ফোনকলে প্রায় আধ ঘণ্টা ব্লেয়ারের সাথে কথা বলেন গাদ্দাফি। লিবিয়াতে আল কায়েদার উত্থান এবং সারাদেশে তাদের হামলার ব্যাপারে ব্লেয়ারকে বিস্তারিত বলেন তিনি। সংগঠনটি উত্তর আফ্রিকা দখলে নেয়া লক্ষ্যে লিবিয়াজুড়ে গৃহযুদ্ধ চালাচ্ছে বলেও ব্লেয়ারকে জানান গাদ্দাফি।

তিনি বলেন, ‘ওরা লিবিয়া থেকে আমাকে উচ্ছেদ করতে চায়। ওরা ভূমধ্যসাগর দখলে নেবে এরপর ইউরোপ আক্রমণ করবে।’ বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানানোর জন্যও ব্লেয়ারকে অনুরোধ করেন তিনি।

শুধু লিবিয়াতেই নয় আলজেরিয়া, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও জঙ্গিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন গাদ্দাফি।

2

ওই একই দিন বিকেল পৌনে চারটার আরেকটি ফোনকলে ব্লেয়ারকে লিবিয়ার প্রকৃত অবস্থা দেখে যাওয়ার জন্য বলেন তিনি। এ সময় তাকে অনেকটা ক্ষুব্ধ মনে হচ্ছিল। সন্ত্রাসবাদ এবং আল কায়েদাকে ব্লেয়ার সমর্থন করেন কিনা- তার কাছে এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চান গাদ্দাফি।

ব্লেয়ার তাকে বলেন, ‘যদি তোমার যাওয়ার জন্য ‍নিরাপদ কোনো জায়গা থাকে তবে সেখানে চলে যাও। কারণ তুমি চলে না গেলে এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ কোনো সমাধান হবে না। তোমাকে দেশ ছাড়তে হবে।’

গাদ্দাফি তাকে শান্তিপূর্ণ পন্থায় ক্ষমতা ছাড়ার কথা বলেছিলেন। উপনিবেশ স্থাপনকারী রাষ্ট্রগুলো যেভাবে নির্দিষ্ট দেশের নেতাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যায়, সেভাবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন গাদ্দাফি। তবে এ ব্যাপারে বাইরের কোনো দেশের হস্তক্ষেপ থেকে লিবিয়াকে মুক্ত রাখতে চেয়েছিলেন তিনি।

এই ঘটনার ঠিক দুই সপ্তাহ পরেই ন্যাটোর জঙ্গি বিমানগুলো হামলা শুরু করে লিবিয়াতে। যুক্তরাজ্যও অংশ নেয় এই হামলায়। শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং ওই বছরের অক্টোবরে তাকে হত্যা করা হয়।

3

এর আগে ব্রিটেনের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক এবং গাদ্দাফির পতনে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ বিষয়ে সংসদীয় তদন্ত কমিটির জেরার মুখে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ ২০০৪ সালে ত্রিপোলির এক শহরতলীতে একটি তাঁবুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার গাদ্দাফির সঙ্গে এক চুক্তির কথা তুলে ধরেন, যা ‘ডিল ইন দ্য ডেজার্ট’ বা ‘মরু প্রান্তরে চুক্তি’ নামে খ্যাত। এই চুক্তি গাদ্দাফিকে তাদের একজন আন্তর্জাতিক শত্রু থেকে ঘনিষ্ট মিত্রতে পরিণত করে।

২০১১ সালে লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার কার্যালয়গুলো থেকে উদ্ধারকৃত বিভিন্ন কাগজপত্র থেকে জানা যায়, মিত্রতার নমুনা হিসেবে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করা লিবিয়ার গাদ্দাফি বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল দেশটি। অনেককে গৃহবন্দিও করে রাখা হয়েছিল। তবে লিবিয়াতে গাদ্দাফি পতন আন্দোলন শুরু হলে এই বিদ্রোহীদের দেশে ফেরার সুযোগ করে দেয় যুক্তরাজ্য সরকার।