মেইন ম্যেনু

আইএস উত্থানে সৌদিই দায়ী

বিভিন্ন মহল থেকে সব সময় দাবি করা হয়, সৌদি আরবে উদ্ভূত ওহাবি মতবাদই বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইদানীংকালের নৃশংস জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের অর্থায়নের জন্যও অভিযুক্ত করা হয় দেশটিকে। বলা হয়, দেশটি সরাসরি তাদেরকে অর্থ দিয়ে সহায়তা দিচ্ছে অথবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটিকে অর্থ সহায়তা দানকারী অভ্যন্তরীণ দাতাদের রুখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এসেছে রাজতান্ত্রিক ধনী রাষ্ট্রটি। ইতিমধ্যে ৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে সন্ত্রাস-বিরোধী একটি যৌথ সামরিক জোট গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে তারা।

সৌদি আরব আসলেই আইএসের মতো জঙ্গি সংগঠন কিংবা সন্ত্রাসবাদ উত্থানে দায়ী কি না- এ বিষয়ে পাঁচজন বিশেষজ্ঞের মত নিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। দেশটির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক নিয়ে তারা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির সমকালীন মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়া বিষয়ক গবেষক বার্নার্ড হাইকেল মনে করেন, আইএসের মতাদর্শ সরাসরি ওহাবি মতবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, ‘ইসলামিক স্টেটের ধর্মীয় মতাদর্শ এসেছে জিহাদি সালাফি মতবাদ থেকে।’

তিনি বলেন, ‘সালাফিরা ইসলামের প্রাচীন ও আক্ষরিক (মৌলবাদি) ধর্মতত্ত্বীয় ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করে। এর অনুসারীরা কট্টরপন্থি এবং যেসব মুসলিম তাদের তত্ত্বে বিশ্বাস করে না সালাফিরা তাদের নিন্দা করে। ওহাবি মতবাদের জনক মোহাম্মদ ইবনে আবদ আল ওহাব সালাফি সম্প্রদায়ের (মাজহাব) লোক ছিলেন।’

তার মতে, আঠারো ও উনিশ শতকে ওহাবিরা ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামরিক সফলতা পায় এবং আরবের অধিকাংশ শহরে প্রভাব বিস্তার করে। আর এ কারণেই সৌদি রাজতন্ত্র ওহাবিদের মতাদর্শ মেনে নেয়।

তিনি জানান, কোনো শহর দখল করার পর ওহাবিরা নিজেদের মতবাদ শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক নিয়োগ দিতো। যেসব বইয়ের মাধ্যমে তারা পাঠদান করতো সেগুলো এখন আইএস ব্যবহার করে।

অন্যদিকে আইএসের দাবি, সৌদি রাজতন্ত্র ওহাবি মতবাদ থেকে সরে এসেছে এবং তারাই সালাফি বা ওহাবি আদর্শের সত্যিকার প্রতিনিধি।

যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিকসের অধ্যাপক সৌদি বংশোদ্ভূদ মাদাবি আল রাশিদ মনে করেন, ১৯৬০ ও ১৯৭০ শতকে আরব বিশ্ব বিভিন্ন বিপ্লবী ধারণায় পূর্ণ ছিল। সৌদি সরকার ওহাবিদের এর একটি প্রতিষেধক বলে মনে করলো। কারণ এ মতবাদিরা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতো না এবং শাসকদের মেনে চলার জন্য বলতো।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারে ওহাবিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়েছিল। তারা নাগরিকদের তাদের শাসকদের অনুগত থাকার নছিহত করতো। এ কারণে সৌদি রাজপরিবারও ছিল খুশি।

তার মতে, ওহাবি মতবাদে এমন কিছু বিপ্লবী বয়ান আছে, যা কাউকে ইসলামের নামে নৃশংসতা চালাতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

তবে সৌদি বংশোদ্ভূত আরেক গবেষক আমিন দীন মনে করেন, মানুষ সালাফি মতবাদকে ভুলভাবে বুঝে থাকে। এই মতবাদটি শাসনব্যবস্থাকে পবিত্র বলে মনে করে। তাই রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে এটি খুবই কার্যকর।

১৯৯০ সালে বসনিয়া যুদ্ধে যোগ দেয়া এই গবেষক বর্তমানে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কাজ করছেন। তিনি সৌদি আরবকে আইএস উত্থানে দায়ী বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, চলতি বছরেই শুধু সৌদি আরব আইএসের সাথে জড়িত সন্দেহে ১ হাজার ৮৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সৌদি সরকারকে সমর্থন করে তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে আইএসের প্রতি সহানুভূতি দেখানোই আপনার কারাগারে যাওয়ার কারণ হতে পারে।’

দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির কাউন্টার টেরোরিজম প্রোগ্রামের পরিচালক ম্যাথু ল্যাভিট মনে করেন, বাইরের দেশ থেকে খুব সামন্যই অর্থ সংগ্রহ করে আইএস। তারা নিজেরাই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। যদিও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন সৌদি আরবের একটি প্রধান সমস্যা ছিল, তবে এ সমস্যা কাটিয়ে উঠেছে দেশটি। বিশেষ করে আইএসের অর্থায়নের ব্যাপারে।

তিনি জানান, আল কায়েদা যেমন একসময় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ছিল। তেমনি আইএসও বর্তমানে স্বাবলম্বী। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তদন্ত অনুসারে, শুধু অবৈধ ব্যবসা থেকে এক বছরে আল কায়েদার উপার্জন ৭ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০ কোটি ডলার হয়। এছাড়া ২০০৫ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ অর্থ আল কায়েদা বাইরে থেকে সংগ্রহ করে।

তিনি বলেন, বর্তমানে আইএসের অর্থের প্রধান উৎস : অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, তেল চোরাচালান এবং অন্যান্য অপরাধ কর্মকাণ্ড। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুসারে, খুব সামান্য সংখ্যক দাতাই সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে জড়িত।
ইতিমধ্যে আইএসের অনেক সন্দেহভাজন এবং তাদের অর্থ দেয়ার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অনেককে সৌদি আরব গ্রেপ্তার করেছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে লন্ডনে সৌদি দূতাবাসের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইয়াহইয়া বলেন, আইএসের জন্য সৌদি আরব একটি বড় ধরনের হুমকি। এসব সংগঠনকে অর্থ দেয়া বা সমর্থন করার অভিযোগ শুধু ভিত্তিহীনই নয়, এটি দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অবস্থানের প্রতি অবমাননাকর।

যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধে সৌদি আরবের কঠোর অর্থনৈতিক অবস্থান আছে বলেও জানান তিনি।

ওহাবি মতবাদের সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইসলামের বেশিরভাগ শিক্ষাই বিকৃত করা হয়েছে। মোহাম্মদ ইবনে আবদ আল ওহাবের কিছু বই আইএস ব্যবহার করলেই যে তারা তার সব শিক্ষায় বিশ্বাস করে- ব্যাপারটি এমন নয়। তাদের মতবাদের সাথে খাপ খায়, এমন ব্যাখ্যা তারা যেকোনো সূত্র থেকে নিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সিরিয়া এবং ইরাকে এখন যা ঘটছে তার জন্য ২৭০ বছর আগের কারো শিক্ষাকে দায়ী করা বিভ্রান্তিকর।’

তবে এতোকিছু পরও ওহাবি মতবাদই ইসলামি অনুশাসন (শরিয়ত) কঠোরভাবে প্রতিপালনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। এরা শিরকের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। এমনকি মহানবীর (সা.) স্মৃতিচিহ্নগুলোও এই যুক্তিতে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি সরকার। নবীর অনেক স্মৃতিচিহ্নই ইতিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে।

সৌদি রাজপরিবারও ওহাবি মতবাদ কঠোরভাবে মেনে চলে। তাদের পূর্ব পুরুষের কোনো কবরই তারা কংক্রিট দিয়ে বাঁধে না। এমনকি কবরের চিহ্ন রাখাকেও শিরকের কাছাকাছি বলে বিশ্বাস করে।

এভাবে শরিয়তের নিজস্ব ব্যাখ্যা এবং কঠোরতা আরোপের কারণে অন্য ভূখণ্ডে অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে ওহাবি ইসলামের সংঘাত বেশি হয়।

2015_12_19_21_55_32_vRRdvrfCtnOjyDjbw9JdJ0EWT2HGhp_original
নিমরুদে আইএসের ধ্বংসযজ্ঞ

আইএসের পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞ বিশেষ করে মূর্তিপূজার যুক্তিতে নিমরুদ, পালমিরার অনেক প্রাচীন ও অমূল্য ঐতিহ্য ধ্বংস করার ঘটনাগুলো সৌদি ওহাবি মতবাদের সাথেই মিলে যায়। এছাড়া আফগানিস্তানে তালেবানি শাসনামলে বামিয়ান বুদ্ধ ঐতিহ্য ধ্বংসও করা হয়েছিল একই যুক্তিতে।

2015_12_19_21_55_28_GaIKsJGlfQ9D53boGnVfRKE5zOXZL9_original
এই পালমিরা আর নেই