মেইন ম্যেনু

আইনের আওতায় আসছে ফেসবুকের ভুয়া আইডি

বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। জানা যাচ্ছে, অাসলের চেয়ে ভুয়া অাইডির সংখ্যা বেশি। এসব ভুয়া অাইডি চিহ্নিত করে অাইনের অাওতায় অানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (অাইসিটি) বিভাগের উদ্যোগে ‘সাইবার নিরাপত্তা অাইন-২০১৫’ এর খসড়ায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির প্রস্তুতি চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া অাইডির মাধ্যমে রাজনৈতিক উস্কানি, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, কটূক্তি, ছবি বিকৃতি, অন্যের ছবির সঙ্গে ছবি জুড়ে দেওয়া, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের ছবি প্রকাশ- ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। এদের কারণে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা অনিরাপদ বোধ করেন । বিভিন্ন মহল থেকে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েও থামানো যায়নি ভুয়া অাইডিধারীদের। এসব কারণেই বিষয়টি অাইনের অাওতায় অানার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে অাইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ অাহমেদ পলক বলেন, অবশ্যই কাজটি করতে হবে। ফেক অাইডি চিহ্নিত করা না হলে দিন দিন এই সমস্যা বাড়বে। এখনই উদ্যোগ না নিলে সামনে হয়ত ফেক অাইডিধারীদের নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ নিয়ে এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অালোচনা করে কীভাবে তাদের অাইনের অাওতায় অানা যায় সেসব চূড়ান্ত করা হবে বলে তিনি জানান।

২০১১ সালে দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ১০ লাখ বেড়ে তা দাঁড়ায় ২৩ লাখে। পরের বছর (২০১৩) জানুয়ারির ১ তারিখে ফেসবুক ব্যবহারকারী ছিল ৩৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৮০ । ২০১৪ সালের অক্টোবরে এ সংখ্যা কোটি ছাড়ায় ।

বলা হচ্ছে, খুব অল্প সময় দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো থ্রি-জি। এসময় থ্রি-জি চালু হওয়ায় মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন থেকে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, তখন থেকে ফেক অাইডি খোলার হারও বাড়ে।

সম্প্রতি ‘সাইবার সিকিউরিটি আইন-২০১৫’ সর্বসম্মতিক্রমে নাম বদলে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন-২০১৫ করা হয়েছে। নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে আইনের সংজ্ঞা, অপরাধ ও শাস্তির পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়েরও। ওই অাইনের খসড়া পূর্ণগঠনের লক্ষ্যে গঠিত ‘সাইবার সিকিউরিটি ড্রাফট পূণর্গঠন কমিটি’র সদস্য তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস বা ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচয় গোপন করে উপস্থিত হওয়া এবং কোনও অপপ্রচার চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অামরা ফেক অাইডি চিহ্নিত করে অাইনের অাওতায় নিয়ে অাসার বিষয়টি খসড়ায় যুক্ত করব। পরে শাস্তির বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে।

মোস্তাফা জব্বার অারও বলেন, যদিও ফেক অাইডি তৈরি করতে গুগল বা ফেসবুক অনুমোদন দিচ্ছে, তবু সেসব অামাদের দেখার বিষয় নয়। অামরা কাউকে পরিচয় গোপন করে কিছু করতে দেব না। ধরা পড়তেই হবে এবং তাকে বা তাদের অাইনের অাওতায় নিয়ে অাসা হবে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে নিরাপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হবেন কিনা? কারণ অনেকে ফেসবুকে পেজ খুলে ব্যবসা, প্রচার-প্রসারের কাজ চালাচ্ছেন। ছদ্মনামেও অাইডি আছে অনেকের। কারও কারও একাধিক অাইডি রয়েছে। বিষয়গুলো কীভাবে দেখা হবে সেসব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কমিটি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অামাদের কাজ হবে ডিজিটাল দুনিয়ায় সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে অানা এবং সবার নিরাপত্তা বিধান করা। কেউ যাতে করে অন্যের মাধ্যমে অযথা হয়রানি না হন, ভোগান্তিতে না পড়েন, সেসব বিষয় নিশ্চিত করতে কমিটির সবাই কাজ করছেন। ফেক অাইডি চিহ্নিত করার সময় কেউ যাতে কোনও হয়রানির শিকার না হন তা খসড়া চূড়ান্ত করার সময় খতিয়ে দেখা হবে।

‘সাইবার সিকিউরিটি ড্রাফট পূণর্গঠন কমিটি’র অপর সদস্য এশিয়ান ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের (অ্যাসোসিও) সাবেক চেয়ারম্যান অাবদুল্লাহ এইচ কাফি বলেন, অামরা ফেসবুকের ভুয়া অাইডির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। নিরাপত্তার স্বার্থে অামরা কোনও ছাড় দেব না। সামনের বৈঠকে অামরা অালোচনা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করব।

অাবদুল্লাহ এইচ কাফি কেবল ফেসবুক নয়, ই-মেইল অাইডি খোলা এবং মোবাইলের সিম কেনার সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সুপারিশ করা হবে বলে জানান। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে পাসপোর্ট নম্বর ব্যবহারের জন্য তার সুপারিশ থাকবে। তার মতে, এসব আইডি খোলার বিপরীতে যেকোনও ভ্যালিড আইডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকলে যে কাউকে চিহ্নিত করার কাজটি সহজ হয়ে যায়।

তিনি জানালেন, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা গ্রহীতাদের ই-মেইল অাইডি খোলার সময় জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে খসড়ায় উল্লেখ থাকবে। তার মতে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হলে অনলাইনে ভুয়া অাইডি খোলার হার একেবারে কমে যাবে। সাধারণ মানুষ যাতে কোনও হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও তারা সজাগ থাকবেন ।

পরিচিত ব্যবহারকারীরা বলছেন, ফেসবুকে ভুয়া আইডি, ভুয়া ই-মেইল অাইডি খুলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে অাসছে। ব্লগ ও ফেসবুক নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগ কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা বলছেন, একজনের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তাতে লেখা হচ্ছে হচ্ছে ধর্ম, রাষ্ট্রবিরোধী মন্তব্যসহ অারও অনেক কিছু।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন একবার মন্তব্য করেছিলেন, এদেশে ফেসবুকের ভুয়া অাইডি অরিজিনাল অাইডির চেয়ে বেশি। তিনি বলেন, আমি র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং করে দেখেছি, একেকজনের ২-৩টা করে আইডি আছে। এসব ভুয়া আইডি দিয়েই বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে বাংলাদেশ অপারেটরস নেটওয়ার্ক গ্রুপের (বিডিনগ) ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন অাহমেদ সাবির জানান, বাংলাদেশে ফেসবুক লাইকারদের সংখ্যা অাশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। লাইক নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে। দেশে প্রকৃত অাইডির চেয়ে ফেক অাইডির সংখ্যাও বেশি বলে তিনি মনে করেন। তার মতে ফেক অাইডি না হলে লাইক ব্যবসা করা যায় না।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামে ভুয়া লাইকের ব্যবসা খুব বেশি। এসব কারণে তার অাশঙ্কা বাংলাদেশে প্রকৃত ফেসবুক ব্যবহারকারীর চেয়ে ভুয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি। বাংলা ট্রিবিউন