মেইন ম্যেনু

আপনার শিশুকে ঘুমাতে দিন

ঢাকার রাস্তায় ভোর বেলা বের হলেও স্কুলমুখী শিশুদের দেখা মিলবে। ঠিকমত দিনের আলো ফোটেনি, অথচ শুরু হয়ে গেছে স্কুলের তোড়জোড়…মায়ের তাড়া। বাধ্য হয়েই আধো ঘুম আধো জাগরণ মুখে স্কুলের দিকে রওনা হতে হয় তাদের। রিকশায় বা গাড়িতে মায়ের কালে শিশুদের ঘুমাতে দেখাটাও তাই আহামরি কোন দৃশ্য নয়।

একজন বৃটিশ বিজ্ঞানী অভিযোগ করেছেন, ভোরবেলা শিশুদের স্কুল শুরু হওয়ার ফলে পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। শিশুদেরকে পর্যাপ্ত ঘুমাতে না দেওয়ার কারণ যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন এ বিজ্ঞানী।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল কেলি হার্ভাড ইউনিভার্সিটির আরেকজন বিজ্ঞানীর সাথে এ বিষয়ে গবেষণা করে বলেছেন, ৮-১০ বছর বয়সী শিশুদের কমপক্ষে সাড়ে আটটা বা তার পর, ১৬ বছর বয়সী শিশুদের সকাল ১০ টায় এবং ১৮ বছর বয়সীদের সকাল ১১ টার মধ্যে স্কুলে শুরু করা উচিত। এর আগে নয়। গিবেষক পল কেলি হিসেব করে দেখেছেন, বৃটিশ শিশুরা সপ্তাহে অন্তত ১০ ঘন্টা ঘুম বঞ্চিত হয়। গত বছর প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানান পল কেলি।

শিশুদের কম ঘুমানোর প্রবণতা শুধু ঢাকায় বা এ উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এ প্রবণতা এখন সমগ্র বিশ্বজুড়ে। ঘুম বাদ দিয়ে শিশুরা নিত্যনতুন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে মেতে থাকছে। গবেষক, ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের এ কম ঘুমানোর প্রবণতা ডায়াবেটিস, স্থুলতা, বিষন্নতার মত রোগের কারণ হতে পারে।

গবেষণার জন্য পল কেলি একশ’টি স্কুলের শিশুদের উপর জরিপ চালান। এ স্কুলগুলোর শুরু সময় ভিন্ন ভিন্ন। ভারতের ক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন, দেশটিতে অধিকাংশ স্কুলই শুরু হয় সূর্য উঠার আগে। বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার এমনকি স্কুলগুলোর প্রধানরাও বিনা বাক্য ব্যায়ে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বাচ্চারা ঘুম বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে তারা এটাও বলছেন, স্কুলের সময় পরিবর্তন করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

নিদ্রা বিশেষজ্ঞ ডা.রামানাথন লায়ার বলেন, বছরের পর বছর ধরে শিশুরা ঘুম বঞ্চিত হচ্ছে। বছরখানেক আগে আমি আমাদের ডাক্তার কমিউনিটির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু দু:খের বিষয় হচ্ছে, কেউই তাতে সাড়া দেয়নি।

ভারতের মুম্বাইয়ের ভি এন স্যুল স্কুলের প্রিন্সিপাল মিনাক্ষী ওয়ালকে বলেন, পর্যাপ্ত ঘুমের পর স্কুলে আসতে পারলে বাচ্চাদের জন্য খুবই ভালো হতো। কিন্তু মুম্বাইয়ে পর্যাপ্ত স্কুল ও স্থান সঙ্কট এবং অতিরিক্ত ট্রাফিক জ্যামের কারণে স্কুলগুলোকে দু’শিফটে স্কুল পরিচালণা করতে হয়। এমনকি প্রথম শিফটে যাদের স্কুল শেষ হয় তারাও দিনের বাকী সময় পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারে না। কারণ দিনের বাকীটা সময়ের বেশির ভাগই স্কুলের কাজ করতে হয় তাদের।

বান্দ্রার লিলাভাতি হাসপাতালের ডা. শশাঙ্ক জোসি বলেন, ভারতের সমস্যাটা হচ্ছে, এখানে স্কুলের পরও বাচ্চাদের আরো ক্লাস (কোচিং) করতে হয়। যেটা তাদের ঘুমের এবং অবসর সময় নষ্ট করে। এছাড়া তারা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্ত, সেটিও তাদের পর্যাপ্ত না ঘুমানোর অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, এ কারণে বাচ্চাদের স্থুলতা ও স্মৃতিভ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তবে ডা. লায়ারের কাছে এ সমস্যার সমাধানও আছে। তার মতে অভিভাবক ও স্কুলের পক্ষ থেকে বাচ্চাদের মধ্যে ঘুমের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। টিভি দেখা ও মোবাইলে গেমস খেলার পরিবর্তে তাদেরকে ঘুমাতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিশুদেরকে রাত সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তে ও ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে উঠতে উৎসাহিত করতে হবে। এ ডাক্তার বলছেন, শেষ রাতে টিভি স্ক্রিনের মত উজ্জল কোন কিছুর দিকে তাকানোর ফলে চোখের রেটিনার উপর বিরুপ প্রভাব পড়ে।

তবে ঘুম যাতে আবার অতিরিক্ত হয়ে না যায় সেদিকেও নজর রাখতে বললেন ডা. জোসি। তিনি বলেন, ভারতীয়দের একঘন্টা বেশি ঘুমাতে বললে আবার তারা দিন পার করে দেয়!