মেইন ম্যেনু

আপনার শিশু কি ক্যান্সারে আক্রান্ত ?

ইস্টার এবং ড্যান লেভির ১৪ মাসের ফুটফুটে ছেলে অ্যান্ড্রু লেভির লিউকোমিয়া ধরা পড়লো। তার ক্যান্সার একেবারে বিরল। লিউকোমিয়া হাড়ের মজ্জার সেই সব কোষের ক্যান্সার যা নতুন রক্ত কণিকা সৃষ্টি করে। শিশুদের মধ্যে যে ক্যান্সারটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় তার নাম লিম্ফোসাইটিক লিউকোমিয়া। এটা সহজে ভালো হয়। আবার বছরে ৪৫ জন শিশুর হতে পারে অ্যাকুট মেগাক্যারিয়োব্লাস্টিক লিউকোমিয়া (এএমকেএল)। অ্যান্ড্রু সেই দলেরই একজন।

ক্যান্সার ধরা পড়ার পর দুই সপ্তাহ পর আরো খারাপ খরব আসলো। যে শিশুদের এএমকেএল হয় তাদের মধ্যে গুটিকয়েকের লিউকোমিয়ার ওপরের স্তরে বিশেষ এক প্রোটিন দেখা যায় যার নাম আর.এ.এম। এটি যাদের দেহে পাওয়া যায় তাদের নিরাময় সম্ভব নয়। অ্যান্ড্রুয়ের তাই হয়েছে। এ বিষয়টি অ্যান্ড্রুয়ের চিকিৎসক লুসিল প্যাকার্ড চিলড্রেন্স হসপিটালের অনকোলজিস্ট নরম্যান ল্যাকাইয়োকে জানালেন সিয়াটল ল্যাবের হেমাটোলজির প্রেসিডেন্ট মাইকেল লোকেন।

এ ধরনের ক্যান্সারে কেউ বাঁচে না বলেই জানান চিকিৎসক। হরর মুভির মতো পরিবেশে ছেলেকে নিয়ে দিন কাটাতে থাকলেন বাবা-মা। রোগ ধরা পড়ামাত্র অ্যান্ড্রুয়ের বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট প্রয়োজন হয়ে পড়ে। প্রথমে লিউকোমিয়া কোষগুলোকে মেরে ফেলতে হবে। এর জন্যে কেমোথেরাপি দিতে হবে। তারপর কোনো দাতার কাছ থেকে কোষ নিতে হবে। এ কাজে অ্যান্ড্রুয়ের ৩ বছরের বোন লিয়া এবং ৫ বছর বয়সী ভাই উইলসকে পরীক্ষা করা হয়। উইলসকে বেছে নেওয়া হয় অবশেষে। দুই বার কেমোথেরাপি দেওয়ার পরও ক্যান্সার থেকেই যায়। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়।

অ্যান্ড্রুয়ের পাশে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক গ্রুপ। কিন্তু মায়ের দিন কাটে হাসপাতালে। মা চাকরি করতেন যা ছেড়ে দেন। বাবা বাড়িতে অন্য দুই সন্তানকে নিয়ে থাকছেন।

তিন মাস হাসপাতালে থাকার পর তারা সবাই হাসপাতালের কাছাকাছি একটি অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসেন। যেন সবাই কাছাকাছি থাকতে পারে। ইস্টার হলেন ছেলের সার্বক্ষণিক সেবিকা। বহু জটিল চিকিৎসার পর বোন-ম্যারো পরীক্ষায় অ্যান্ড্রুয়ের দেহে কোনো ক্যান্সারের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। পরিবারটি একটি ভিডিও পোস্ট করেছে। সেখানে তারা আনন্দ উদযাপন করছেন।

অ্যান্ড্রুয়ের সুস্থ হওয়া উপলক্ষে তারা আর পুরনো বাড়িতে ফেরত যাবেন না বলেই ঠিক করলেন। বরং নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু স্বাস্থ্যের পরীক্ষা করাতে গিয়ে আবারো দুঃসংবাদ। ক্যান্সার ফিরে এসেছে। নতুন পরিকল্পনা হাতে নিলেন চিকিৎসকরা।

বাবা-মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এই ছোট্ট শিশুটি আর বাঁচবে না, ধরেই নিলেন তারা। আবারো সেই কঠিন চিকিৎসা এই ছোট্ট শিশুর ওপর। আবার পরিবারটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এমন নানা দিক ভেবে চিকিৎসা নেবেন না বলে মনস্থির করলেন বাবা-মা।

হতবাক হয়ে গেলেন চিকিৎসকরা। তারা অ্যান্ড্রুকে এভাবে ছেড়ে দিতে পারেন না। তারা শিশুটিকে সুস্থ করে তুলবেন বলেই বদ্ধপরিকর। তারা আবারো কেমোথেরাপি দিতে চান। কিন্তু রাজি হলেন না ইস্টার এবং ড্যান।

এবার শিশুটি যতদিন বাঁচুক তার জন্যে ভালো কিছু দিতে চাইলেন বাবা-মা। এটা দীর্ঘ জীবনের জন্যে নয়। সে তো মরেই যাবে। যে কয়দিন থাকে, মানসম্পন্ন জীবন দিতে চাইলেন।

নতুন বাড়িতে ওঠার কিছু দিন পরই অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকলো অ্যান্ড্রুয়ের। প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁকড়ে যেত সে। মানসিক যন্ত্রণায় মায়ের পাগল হওয়ার জোগাড়।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা উচ্চ ক্ষমতার অপিওয়িড প্রয়োগে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করতেন। তাকে কালো তোয়ালেতে জড়িয়ে নিতে বলতেন হাসপাতালের একজন সেবিকা। কারণ যখন-তখন তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হবে। দৃশ্যটা সহ্য হবে না তখন।

কিছু দিন বাড়ে চিকিৎসকদের দল শিশুটির মৃত্যুর জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিতে বললো পরিবারকে। অ্যান্ড্রু খেলনা বিমান দারুণ পছন্দ করতো। তাই এক বিমানবন্দরের পাশে এক সমাধিস্থলে অ্যান্ড্রুকে শোয়ানের ব্যবস্থা আগে থেকেই রাখা হলো। অ্যান্ড্রু লেভি মেমোরিয়াল ফান্ড খুললেন বাবা-মা। চিকিৎসরা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পরিবারকে বিদায় জানালেন।

এক দিন শিশুদেরকে ডাকলেন ড্যান এবং ইস্টার। উইলসকে বললেন, তার কোষ অ্যান্ড্রুয়ের দেহে দারুণ কাজ করেছে। কিন্তু দেহ তা ধরে রাখতে পারেনি। আসলে ভাইয়ের মৃত্যু যেন তাদের কষ্ট না দেয় তার জন্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে ওদের।

এ অবস্থায় একদিন অ্যান্ড্রুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন মা। বাড়ির সামনের মাঠে বল খেলছে উইলস। হঠাৎ অ্যান্ড্রু মায়ের কোলে উঠে বসলো। হামাগুড়ি দিয়ে বল ধরতে গেলো। হা হয়ে গেলেন ইস্টার।

চিকিৎসক দলকে এর পর অ্যান্ড্রুয়ের অবস্থা ভিডিও করে পাঠাতে থাকলেন ইস্টার। ও পিৎজা খাচ্ছে, হাসছে আর খেলছে। চিকিৎসরাও হতভম্ব। রক্ত পরীক্ষায় ওর অবস্থা বেশ ভালো দেখা গেলো। অনেক কিছুই ধারণা করা হলো। হয়তো তার লিউকোমিয়া নয়, বড় ধরনের কোনো সংক্রমণ ঘটেছিল। অথবা নতুন ইমিউন সিস্টেম দেহে অনেক পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছে। তা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে।

বয়স দুই বছর পূর্ণ করলো অ্যান্ড্রু। যা কখনো ভাবেননি বাবা-মা। সে এখন হাঁটে এবং খেলা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই শিশুটি বেশ স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠলো। ভাই-বোনদের সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে বল খেলে।

তবে আরো একবার পরীক্ষা করতে চাইলেন বাবা-মা। হাসপাতালে নিলেন। পর পর দুই বার পরীক্ষা করে চিকিৎসক অবাক। এর দেহে কোনো ক্যান্সার নেই।

কোষ প্রতিস্থাপনের দায়িত্বে ছিলেন জেনিফার উইলার্ট। বললেন, ক্যান্সার কিভাবে এমনিতেই গায়েব হয়ে যায়? এটা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা। এমনটা ঘটার কোনো কারণ বিজ্ঞানের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করা যায় না। কিন্তু তা ঘটে গেছে।

শিশু যখন কোনো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়, তখন বাবা-মায়ের অবস্থা অন্য কেউ বুঝতে পারেন না। মৃত্যু যখন নিশ্চিত তখন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কিংবা অপেক্ষা ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে? কিন্তু অ্যান্ড্রুয়ের ঘটনায় কি ভাবা যেতে পারে? শেষ পর্যন্ত দেখতেই হবে। নিশ্চিত মৃত্যু কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যত ছাড়া ভাবার আর কোনো পথ নেই এখানে। কিন্তু ভয়ের সঙ্গে আশাবাদ ধরে রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ভাববেন না, শিশুটি মরণাপন্ন রোগে আক্রান্ত এবং মৃত্যু তার নিশ্চিত। তার প্রমাণ ছোট্ট শিশু অ্যান্ড্রুই তো দিয়ে দিলো। সূত্র : নিউ নিয়র্ক টাইমস