মেইন ম্যেনু

আফসানাকে ধর্ষণের পর হত্যাঃ অভিযোগ তেজগাও কলেজের ছাত্রলীগ নেতা রবিনের দিকে!

‘আমি ভালো আছি, কোনো চিন্তা করিস না। ঈদের অনেক আগেই এবার বাড়ি চলে আসব রে। ভুলেও আমাকে ছাড়া গরু কিনবি না। এবার হাটে কিন্তু আমিও যাব। গরুর গলায় মালা ঝুলিয়ে সবাই একসঙ্গে মজা করতে করতে হেঁটে ঘরে ফিরব।’ গত ১২ আগস্ট রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোবাইল ফোনে বড় ভাই ফজলে রাব্বির সঙ্গে এটাই ছিল মিরপুর শ্যাওড়াপাড়ায় অবস্থিত সাইক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আফসানা ফেরদৌসের (২৪) শেষ কথা।

সবাইকে কাদিয়ে আফসানা নামের সম্ভাবনাময়ী তরুনীর হত্যাকান্ডে আরও একটি ঘৃন্য নির্মম ঘটনার জন্ম হলো এবার । টানা কয়েকদিন নিখোঁজের পর গত শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাওয়া যায় আফসানার লাশ। প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে চিকিতসকেরা জানান, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর গলায় কিছু পেচিয়ে হত্যা করা হয় আফসানাকে। এই হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিনের বিরুদ্ধে। আফসানার পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের দাবী আফসানা হত্যাকাণ্ডের মুল হোতা ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রবিন ও তার বন্ধুরা ।

আফসানার স্বজনেরা জানিয়েছেন, আফসানা এক সময় কিছু ছাত্রীদের সাথে তেজগাঁও এলাকায় থাকতো। তবে গত ১৩ আগষ্ট ঘটনার মাসখানেক আগে ২ জন রুমমেটের সঙ্গে মানিকদি এলাকার একটি বাসায় উঠেছিলো।
আফসানার কাছের বন্ধুরা বলছে, তেজগাঁও থাকাকালীন তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে আফসানা। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। পরে এলাকা ছেড়ে চলে যায় আফসানা।

ঘটনার ১০ দিন আগে আফসানা ও রবিনের পরিচিত বন্ধুরা আবার তাদের এক করে দেয়। কিন্তু ঘটনার ২ দিন আগে ফের সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এই নিয়ে আফসানাকে দেখে নেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয়। এর ২ দিন পরই লাশ পাওয়া যায় আফসানার।

স্বজনদের দাবী, ‘ মোবাইল ফােনে অপরাধীরা এখন প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে আফসানার ভাই-মাকে।
গত সোমবার বিকালেও রবিনের ভাই পরিচয় দিয়ে দিপু নামে একজন বলেছে, ‘এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি কইরেন না। আপনারা অনেক দূরে থাকেন। আমাদের কিছুই করতে পারবেন না। একটা মিসটেক হয়ে গেছে। আসেন আমরা বসে মীমাংসা করে ফেলি।’

আফসানা হত্যাকান্ডে তার গ্রাম রুহিয়া কানিকশালগাঁও সহ পুরো ঠাকুরগাঁওয়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। একই সাথে ক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। আফসানা হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে আজ ১৭ আগস্ট একযোগে ঠাকুরগাঁও ও রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হবে ।

আফসানার স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হয় গতকাল। তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

আফসানার রহস্যজনক মৃত্যুর বিষয়ে কাফরুল থানার ওসি সিকদার মোহাম্মদ শামীম হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হলেও কাউকে এখনো আটক করা হয়নি। ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড না অন্য কিছু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে বিস্তারিত জানা যাবে। তদন্তের বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

ঘটনার নেপথ্যে

গত শনিবার রাতে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে আফসানার মামি সৈয়দা ইয়াসমিন রুমার মোবাইলে। ফোনে তাকে বলা হয়, ” আমি সাগর বলছি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আপনার মেয়ে লাশ আছে নিয়ে যান।” রুমা কিছু বুঝতে না পেরে ঢাকায় বসবাসরত তার ভাই তৌফিক এলাহীকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। পরে তৌফিক এলাহী বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ খবর নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এসে তার ভাগনি আফসানা ফেরদৌসীর লাশ শনাক্ত করেন।

আফসানা মিরপুরের সাইক ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজির স্থাপত্য বিদ্যার শেষ বর্ষের ছাত্রী ও ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী ছিলেন ।নিহত আফসানা ফেরদৌসীর বাবা আখতার হোসেন প্রায় ছয়মাস আগে মারা গেছেন। এক ভাই দুই বোনের মধ্যে আফসানা ছিলেন সবার বড়।

আফসানার ভাই ফজলে রাব্বী জানান, “গত শনিবার (১৩ আগস্ট) রাতে মাকে অপরিচিত এক নাম্বার থেকে ফোন করে জানানো হয়, আফসানা বাংলাদেশ মেডিকেলের জরুরী বিভাগে ভর্তি আছে । এই খবর শুনে মা কাঁদতে শুরু করলে আমি ফোনটা ধরি । পরে ঐ প্রান্ত থেকে বলা হয় লাশ বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। তখন আমি বিষয়টি ঢাকায় আত্মীয়স্বজনদের জানাই। খবর পেয়ে পরিচিত জনেরা ধানমণ্ডির বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু আফসানার লাশ সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে ঐ নাম্বারে আমরা বার বার ফোন করলে ফোন রিসিভ করেনি । পরে আবার অন্য একটি নাম্বার থেকে জানানো হয় লাশ আল হেলাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে আছে । সেখানে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, এ নামে একটি লাশ কাফরুল থানায় রয়েছে। এরপর কাফরুল থানায় পৌঁছানোর পর আফসানার ছবি দেখালে থানায় ডিউটিরত পুলিশ জানায় এমন চেহারার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আছে। রাত তিনটায় ঢাকা মেডিকেল মর্গে আফসানার লাশ শনাক্ত করা হয় ।

তিনি আরো বলেন, “যারা লাশ দেখেছে, প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা মেয়েটিকে ধর্ষণের পর রশির মতো কোন কিছু দিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণে একাধিক ব্যাক্তি জড়িতও থাকতে পারে বলে কেউ কেউ ধারণা করছেন”।

এই প্রসঙ্গে আল হেলাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত শনিবার বিকেলে দুইজন যুবক সিএনজি নিয়ে হাসপাতালের সামনে আসে। এসময় তারা জরুরী বিভাগে রোগী ভর্তির জন্য স্ট্রেচার নিয়ে আসতে বলে। হাসপাতালের লোকজন রোগীকে স্ট্রেচারে তুলে ভিতরে নেয়ার সময় যুবকেরা সিএনজির ভাড়া পরিশোধ করে ভেতরে আসছে বলে পরে আর কেউ আসেনি।

সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, রোগীর হাসপাতালে আসার আগেই মৃত্যু হয়েছিল। এ সময় মেয়েটির মৃতদেহের গলার নিচের দিকে গভীর দাগ দেখা যায়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাফরুল থানাকে জানায়।

এদিকে রবিবার আফসানার ময়না তদন্ত শেষে গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁয়ের রুহিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার সকালে গ্রামেই দাফন করা হয় ।

এই ব্যাপারে কাফরুল থানা থেকে জানানো হয়েছে, “এখনো ময়না তদন্তের রিপোর্ট জানা যায়নি। আগামী দু তিন দিনের মধ্যে ময়না তদন্তের রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এরপর আইনগত ব্যবস্থা নেবে পুলিশ”।

আফাসানা হত্যাকান্ডে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে চলছে তোলপাড় । প্রকৃত খুনিদের দ্রুত শাস্তির দাবী জানিয়ে হাজারো অনলাইন একটিভিস্ট লিখছেন। এই হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে কবি, গল্পকার ও সাংবাদিক মুজতবা আহমেদ মুরশেদ তার ফেসবুক আইডিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠিতে লিখেছেন,

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
পুরুষতান্ত্রিক সমাজে, পুরুষের ঘৃণ্যলালসায় ঝড়ে গেলাে আপনার আরেকটি বোন।
তেজগাঁও কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান রবিনই আফসানা হত্যাকাণ্ডের মুল হোতা, অভিযোগ করেছে আফসানার স্বজন ও কাছের বন্ধুরা ।
কিন্তু মোবাইল ফােনে অপরাধীরা এখন প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে হতভাগ্য আফসানার ভাই-মাকে।
স্থাপত্য বিদ্যার ছাত্রী, ২৪ বছরের হতভাগ্য মেয়েটির নাম আফসানা ফেরদৌস। সে আমার ফুপাতো বোনের নাতনি। সে সুবাদে আমারো নাতনি। আফসানা মিরপুরের সাইক ইন্সিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট এন্ড টেকনোলজির স্থাপত্য বিদ্যার শেষ বর্ষের ছাত্রী ছিলো। রাজনীতি সচেতন মেয়েটি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলো।
গত শনিবার, ১৩ আগস্ট ২০১৬, রাতে অপরিচিত মোবাইল থেকে অফসানার মায়ের কাছে জানানো হয়, আফসানার লাশ বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশ রাখা আছে।
এদিন রাত ৯টার দিকে সৌরভ পরিচয় দিয়ে একটি মোবাইল ফোন (০১৬২২৪০৬৭১৩) থেকে কল করে আফসানার মা সৈয়দা ইয়াসমিনের কাছে জানানো হয়, আফসানা মারা গেছে। তার লাশ ধানমণ্ডির বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। আপনারা এসে লাশ নিয়ে যান, বলেই ফোনটি কেটে দিয়ে বন্ধ করে দেয়। সৈয়দা ইয়াসমিন ঘটনাটা আত্মীয়স্বজনদের জানালে, আফসানার মামা হাসানুজ্জামানসহ অন্যরা বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এলেও লাশ পায়নি আফসানার।
তারা সেখানে থাকা অবস্থায় অন্য একটি অপরিচিত মোবাইল নম্বর (০১৬৭৭২৫২৫৯৭) থেকে বাবু নামে একজন জানান, আফসানার লাশ মিরপুরের আল-হেলাল হাসপাতালে। সবাই আল-হেলাল হাসপাতালে ছুটে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, অজ্ঞাত এক তরুণীর লাশ এসেছিল। পরে কাফরুল থানা পুলিশ লাশটি নিয়ে গেছে। কাফরুল থানা পুলিশকে আফসানার ছবি দেখালে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা জানান, এমন চেহারার একটি মেয়ের লাশ আল-হেলাল হাসপাতাল থেকে উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অবশেষে রোববার ভোররাত তিনটার দিকে তারা ঢামেক মর্গের হিমঘরে খুঁজে পাওয়া গেছে আফসানার নিথর দেহ,- আপনার আরেকটি হতভাগ্য বোনের মৃতদেহ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জার্মান এবং জাপান দূতাবাসে রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারে আপনার সাথে আমার একাধীকবার দেখা হয়েছে,- আপনার কাছে সেই পরিচিত মুখটি হয়েও সুষ্ঠু বিচার চাইছি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার পিতা এডভোকেট মোহম্মদ আজিজুর রহমান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে আপনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠি এবং ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে উনি ৭ নং সেক্টর এবং ৬ নং সেক্টর (অর্ধেক) এর লেফটানান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় সিভিল এফেয়ার্স এডভাইজার ছিলেন। যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, সে স্বপ্ন যেনো ভুলুণ্ঠিত না হয়, আপনার সে সংগ্রামেরই আমরা সাথী ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো মমতাময়ী বোন এবং মা । আপনি তো জনহীতৈষী প্রধানমন্ত্রী । অাপনি এ ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিচার করবেন বলে আমরা সকলেই তাকিয়ে রইলাম।