মেইন ম্যেনু

আবর্জনাকে স্বর্ণ বানালেন মোস্তফা

মোস্তফা হেমদান কিছুদিন আগেই আর্বজনার ব্যবসা করতেন। কিন্তু আজ সেই আবর্জনাই তাকে স্বর্ণের সন্ধান দিয়েছে। কিন্তু তার এই সফলতা মাত্র একদিনে আসেনি। অনেক পরিশ্রম আর ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে মোস্তফাকে, আর সেই প্রতিবন্ধকতার বিনিময়েই আজ বিশ্বের প্রায় সবগুলো বড় গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে নানান প্রতিবেদন। শুধু প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় আজ মোস্তফার জীবন-জীবিকা। তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে আজ বিশ্বের অগুনতি বেকার যুবক যুবতী। কিন্তু কিভাবে আবর্জনাকে স্বর্ণে রূপান্তরিত করলেন উদ্যমী মোস্তফা?

২৫ বছর বয়সী মোস্তফা হলেন মিসরীয় কোম্পানি ‘রিসাইকেলোবেকিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা। মধ্যপ্রাচ্যে ইলেকট্রনিক আবর্জনা নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তার প্রতিষ্ঠানই প্রথম এবং অগ্রগণ্য। কায়রোর উত্তরের তানতা নামক এলাকায় নিজ বাড়ির পাশেই তিনি আজ থেকে পাঁচ বছর আগে ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছিলেন তিনি। কপাল ভালো ছিল তার এই কারণে যে, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে রাজধানী কায়রোর দূরত্ব ছিল মাত্র ৯০ কিলোমিটার।

প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র মোস্তফা তার ১৯জন সহপাঠীকে নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক উদ্যোক্তাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি প্রতিযোগিতায়। মিসরে এই প্রতিযোগিতাটিকে বলা হয় ইনজাজ। এই ইনজাজে বিজয়ী প্রাথী বা ওই দলকে নগদ দশ হাজার ডলার দেয়া হয়, যাতে উদ্যোক্তারা ওই অর্থ দিয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। ওই প্রতিযোগিতা থেকেই মূলত মোস্তফা নিজের একটা আলাদা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা ভাবতে শুরু করেন। আর টেলিভিশনের কোনো একটা অনুষ্ঠান দেখে তার মধ্যে অনুপ্রেরণাতো আসেই সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যান পরিকল্পনা।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন মোস্তফা, ‘ইলেকট্রনিক পণ্য পুর্ণব্যবহার বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি দেখছিলাম এবং বুঝতে পারছিলাম মাদারবোর্ড গুলো থেকে প্রাপ্ত ধাতু যেমন স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা এবং প্লাটিনাম অনেক কাজে আসতে পারে। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যবসা খুবই জমজমাট। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের কেউই এই ব্যবসা করছে না।’ সেদিনের ওই চিন্তা থেকেই মূলত রিসাইকেলোবেকিয়ার জন্ম এবং এর কার্যক্রম শুরু। আর মোস্তফাও তার পরিকল্পনা জমা দিয়ে জিতে নিলেন ইনজাজের দশ হাজার ডলার।

আরবি শব্দ ‘রোবা বেকিয়া’ থেকেই মূলত মোস্তফা তার কোম্পানির নাম দিয়ছিলেন। আরবিতে এই দুইটি শব্দের অর্থ হলো ‘পুরাতন বস্তু’ এবং মিসরের রাস্তায় হরহামেশাই এই শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। কাধে বস্তা নিয়ে একদল মানুষ বাড়ি বাড়ি রোবা বেকিয়া বলে চিৎকার করে আবর্জনা সংগ্রহ করে। অথচ রাস্তা থেকে নেয়া শব্দ দিয়ে তৈরি করা প্রতিষ্ঠানে এখন ২০ জন মানুষ কাজ করে এবং তাদের রয়েছে চারটি গুদামঘর। শুধু তাই নয়, প্রতিবছর তারা দুই দশমিক চার মিলিয়ন ডলারের ইলেকট্রিক আবর্জনা বিক্রি করে। যদিও আরব বসন্ত চলাকালীন সময় থেকে মোস্তফার ব্যবসা কিছুটা মন্দা যাচ্ছে। কারণ রাজনৈতিক কারণে প্রায়শই পণ্য শিপমেন্ট করতে সমস্যা হয় মোস্তফার।

২০১১ সালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু করার পর তাকে অনেকটা দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রথম অর্ডারের জন্য। অর্ডারের আশায় তিনি সর্বপ্রথম আলীবাবাডটকম নামক ওয়েবসাইটে তার কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপন দেন। ওই বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরেই হংকংয়ের একটি প্রতিষ্ঠান তাকে দশ টন হার্ডডিস্ক পাঠাতে বলে। ‘ওই মুহূর্তে আমি জানতামই না কোথা হতে আমি ওই পরিমান হার্ডডিস্ক সংগ্রহ করবো। কিন্তু আমি তাদের অর্ডার গ্রহন করেছিলাম।’ এরপর সেই জিনিস খুঁজে তিনি চলে গেলেন কায়রোতে যেখানে ১৭ মিলিয়ন মানুষ প্রতিদিন ১৫ হাজার টন আবর্জনা তৈরি করে।

মিসরের পুরো আবর্জনা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থাটি চলে জাব্বালিন নামের একটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের তত্বাবধানে। তাদের পরিচালিত দল বস্তায় করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করে আনে। এবং সেই আবর্জনা থেকে প্রাপ্ত প্লাস্টিক, কাগজ এবং লোহা তারা কাজে লাগায়। যদিও জাব্বালিন পুরনো কম্পিউটার বা প্রিন্টারের মতো কোনো ইলেকট্রিক আবর্জনা সংগ্রহ করে না। আর তাই রিসাইকেলোবেকিয়া ওই কোম্পানি থেকে এধরণের পণ্য সংগ্রহ করে নয়। এমনি এক অবস্থায় তিনি বুঝতে পারেন যে হংকংয়ের অর্ডার সম্পূর্ণ করতে তার দরকার পনেরো হাজার ডলার। সেসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছ থেকে চল্লিশ শতাংশ সূদে ওই অর্থ সংগ্রহ করেন এবং চার মাস পর তিনি হংকংয়ে হার্ডডিস্ক শিপমেন্ট করেন।

এরপর আর মোস্তফাকে পেছনে ফিরে তাকাতে না হলেও ব্যবসায়িক নানান সমস্যার ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। আর যতই তিনি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন ততই আরও পারদর্শী হয়ে উঠেছেন ব্যবসায়। অংশীদারিত্বের ঝামেলা থেকে শুরু করে ব্যবসার পরিসর বাড়ানো এবং নতুন নতুন কর্মীদের কাজে লাগানো, সব বিষয়ই মোস্তফাকে একা হাতে করতে হয় এখনও। একারণেই আজ মিসরের চলমান ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রিসাইকেলোবেকিয়া একটি অন্যতম নাম।