মেইন ম্যেনু

আবারও পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট

সময়ের স্রোতে, নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট বর্তমানে এক অনন্য উচ্চতায় রয়েছে। বাংলাদেশ বলতেই মানুষ এখন মাশরাফি-সাকিবের দেশ হিসেবে চিনে, বাংলাদেশ এখন বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন এক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার বিদেশী টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছেন, পারফর্ম করেছেন। এই বাংলাদেশ দল একের পর এক ক্রিকেট পরাশক্তিকে হারিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ে উপরে উঠে এসেছে।

কিন্তু সব কিছুর পরও আবারও এই ক্রিকেটে পিছিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ, এই কথা শুনেই অনেকেই অবাক হতে পারে কিন্তু এটিই সত্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট বিগত কয়েক বছরে বেশ উন্নতি করেছে, দলগত ভাবে এবং এককভাবেও ক্রিকেটে বাংলাদেশ নতুন যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু এই উন্নতি কতদিন টেকসই হবে তা এখন বড় প্রশ্ন।

আমরা যদি ২০১০ এবং ২০১২ সালে ফিরে যাই তাহলে এই উত্তরটা আমাদের কাছে অনেক বেশী পরিষ্কার হবে। ২০১০ সালে অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ দল নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ তে হারিয়েছিল, এরকম পারফর্মেন্সের ওপর ভিত্তি করেই অনেকেই বলেছিল বাংলাদেশ বিশ্বকাপে বেশ ভাল পারফর্ম করবে কিন্তু তার উল্টোটি হয়েছে। বাংলাদেশ সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ রান এবং দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৪ রানে অলআউট হয়ে লজ্জার হার বরন করে নিয়েছিল বাংলাদেশ।

অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের সাথে সিরিজের পর বাংলাদেশ বিশ্বকাপের আগে আর কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি, অপরদিকে তখন ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেও বিরতিতে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা, তারা বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি ক্যাম্পে ছিল কিন্তু পরিশেষে এসব কাজে দেয়নি। ভালো পারফর্মেন্স বজায় রাখতে হলে ম্যাচ খেলতে হয়, যেটি বাংলাদেশ সেবার করেনি। আর ম্যাচের বাইরেই ছিল বলে নিজের মাটিতে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় বাংলাদেশ।

এখন যদি আসা যায়, ২০১২ সালের ঘটনায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশ দলের পারফর্মেন্স গ্রাফ উপরের দিকে উঠেছে। সেবার প্রথমবারের মতন বিপিএল অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে, আর দেশের ক্রিকেটাররা বেশ ভালো একটি সুযোগ পেয়েছিল নিজেদের ঝালাই করে নেওয়ার। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিনে বিপিএল শেষ হয় আর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুরু হয় এশিয়া কাপ। আর সেই এশিয়া কাপে ভারত, শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতন ফাইনালে উঠে পাকিস্তানের কাছে অল্পের জন্য হেরে যায় বাংলাদেশ।

ম্যাচের মধ্যে ছিল বলে বাংলাদেশ দল বছরের শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও সিরিজ জিতেছিল। সেবার বাংলাদেশে এশিয়া কাপের পরেই দক্ষিন আফ্রিকা এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি২০ ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল, এরপর আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসের সাথে টি২০ খেলেছে, অংশ নিয়েছে টি২০ বিশ্বকাপে। বলতে গেলে পুরো বছর ধরেই ম্যাচের মধ্যেই ছিল বাংলাদেশ আর এই কারনেই ভালো পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিল বাংলাদেশ।

গত বছরও বাংলাদেশ ম্যাচের মধ্যেই ছিল আর যে কারনে বিশ্বকাপে, এবং বিশ্বকাপ পরবর্তী সিরিজগুলোতে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিল এই দল। এমনকি গত বছরের বিপিএল, আন্তর্জাতিক টি২০ ম্যাচ এবং এই বছরের শুরুতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের ফলে এশিয়া কাপে ভালো ফল উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপে নানা বিতর্কে জর্জরিত হয়েও এই দলটি ভালো পারফর্ম করেছে, কিন্তু এখন কথা হল এই ভালো পারফর্মেন্সের ধারা কি বজায় থাকবে?

ভারতে টি২০ বিশ্বকাপের পর লম্বা একটি বিরতি পেয়েছে বাংলাদেশ, এরই মধ্যে ডিপিএল শুরু হয়ে গেছে কিন্তু মাঝে কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ নেই বাংলাদেশের। আগস্টে ভারত সফর থাকলেও তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত তারিখ কিংবা কি ধরনের ম্যাচ বাংলাদেশ খেলবে এসব নিয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। অপরদিকে অক্টোবরে বাংলাদেশ ইংল্যান্ড দলের আসার কথা রয়েছে, এরপরই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ।

অর্থাৎ ভারত সফর না হলে মাঝখানে বেশ লম্বা একটা বিরতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ দল, আর এতে পারফর্মেন্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাও বেশ কঠিন একটা ব্যপার হবে। অন্যদিকে দেশের বাইরে সিরিজ ঘিরে দল নিয়ে এখনও কোন পরিকল্পনা করেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সেখানে কি ধরনের উইকেটে খেলা হবে এবং কোন ধরনের দল নিয়ে বাংলাদেশ মাঠে নামবে এসব নিয়ে এখন চিন্তা না করলে পরে বেশ গড়মিল হয়ে যেতে পারে।

দেশের মাটিতে বাংলাদেশ ভালো পারফর্ম করেছে, কিন্তু দেশের বাইরে এরকম বড় দলের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে যাওয়ার আগে দলের কি ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া দরকার সেদিকে মাথা ব্যাথা নেই বোর্ডের। অপরদিকে দেশের বাইরে প্রস্তুতি সিরিজ খেলার ব্যপারেও কোন মন্তব্য করেনি বিসিবি। সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে এই দুই সফরেই পিছিয়ে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ দল এখনও টেস্ট ক্রিকেটে পিছিয়ে রয়েছে। আর তাই টেস্ট ক্রিকেটের ওপর জোরটা একটু বেশী দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ দল শেষ টেস্ট খেলেছে দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে এরপর টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে তারা। অস্ট্রেলিয়া দলের আসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা এই সফর বাতিল করে, পরবর্তীতে বাংলাদেশে টেস্ট খেলতে আসা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি অস্ট্রেলিয়া। বিসিবিও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে, টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির জন্য সেরকম কোন উদ্যোগ নিতে পারেনি বোর্ড। টেস্ট ম্যাচে ভালো করতে হলে বাংলাদেশকে আরও ম্যাচ খেলতে হবে, কিন্তু বাংলাদেশ বছরে মাত্র তিন থেকে চারটি টেস্ট খেলার সুযোগ পায়, গত বছর বেশ কয়েকটি টেস্ট ম্যাচ বৃষ্টির কারনে পরিত্যাক্তও হয়েছে।

এদিকে ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়েও নানা টালবাহান রয়েছে বিসিবির মধ্যে, এবারের ডিপিএলে একাংশে ক্যামেরার ব্যবহার করতে দেয়নি বোর্ড। এর ফলে পারফর্মেন্স মনিটর করাটা অনেক কষ্টসাধ্য কাজ হয়ে পড়েছে। অন্যান্য দেশে ঘরোয়া খেলা সরাসরি সম্প্রচার করারও ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এমন কোন উদ্যোগ নেয়নি, বরং মাঠে ক্যামেরার ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে তারা। এতে ক্রিকেটারদের পারফর্মেন্সের ওপর ভালোভাবে নজরদারি করা যাবেনা এখন।

অপরদিকে দেশের বোলাররা এখন এক অজানা আশঙ্কায় ভুগছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এর কারন। বিশ্বকাপে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের দুই বোলার আরাফাত সানি এবং তাসকিন আহমেদ নিষিদ্ধ হয়েছেন, যুব দলের ক্রিকেটার সঞ্জিতকেও নিষিদ্ধ করেছে আইসিসি। তাদের বোলিং অ্যাকশানে ত্রুটি রয়েছে বলে জানিয়েছে আইসিসি। এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছে এমন অনেক বোলারের বোলিং অ্যাকশানে সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশের বেশ কয়েকজন আম্পায়ার।

কিন্তু তাদের এই অ্যাকশান ঠিক করতে সেরকম কোন উদ্যোগ নিচ্ছেনা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কিংবা ক্লাব গুলো। এদের মধ্যে থেকে যখন কেউ জাতীয় দলে সুযোগ পাবে তখন আবারও তাদের অ্যাকশান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে। তাদের নিয়ে যদি এখনই কোন কাজ না করা হয় তবে ভবিষ্যতে এই বোলিং ডিপার্টমেন্টে বেশ পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ দল।

এদিকে স্পিন নির্ভর দল থেকে বাংলাদেশ এখন পেস নির্ভর দলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মানসম্পন্ন স্পিনার তৈরি করতে পারছেনা বাংলাদেশ, একটি দলে ফাস্ট বোলারের যেমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে স্পিনারের প্রয়োজনীয়তাও ঠিক সেরকম, কিন্তু বাংলাদেশ এখন মানসম্পন্ন স্পিনার তৈরির দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে। অপরদিকে ফাস্ট বোলারদের এখনও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রন করতে পারেনা বাংলাদেশ, তাইতো এখনও ইনজুরির কবলে পড়ে মাঠের বাইরে থাকতে হয় মাঠ কাঁপানো পেসারদের।

বাংলাদেশ টীম ম্যানেজমেন্ট এবং বোর্ডের এইসব ব্যর্থতা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আবারও পিছিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ দল সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, দল এখন ভালো করছে। কিন্তু অতীতের ভালো পারফর্মেন্সের কথা ভেবে ভবিষ্যৎ পারফর্মেন্সের কথা ভুলে গেলে চলবেনা।