মেইন ম্যেনু

আবারও ভারি বর্ষণের আঘাতে কাঁদছে মানুষ

কক্সবাজারে আবারো ভারি বর্ষণে ডুবেছে নিচু এলাকা। অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে জীবনযাপন। জেলায় মঙ্গলবার ভয়াবহ বৃষ্টিপাতে ৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজার শহরের নদী ও ছরা লাগোয়া

সবারই মুখে মুখে একটিই কথা ‘জীবনেও দেখিনি এত বৃষ্টি’। জেলার যে স্তানে পূর্বে পানি উঠেনি গতকাল মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে ডুবেছে সেসব জায়গাগুলো। সব চাইতে দক্ষিণ রুমালিয়ারছড়া এলাকায় গলা পর্যন্ত পানিতে চলাচল করেছে স্থানীয়রা।

গতকাল অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে সদরের ঝিলংজায় পাহাড় ধসে ফারজানা রশিদ (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে।

শহরের চালবাজার এলাকা থেকে পানিতে ভেসে যাওয়া অজ্ঞাত এক বৃদ্ধ পাগলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলায় প্রবল ঝড়বাতাসের কবলে পড়ে নোঙর করা ফিশিং ট্রলার দূর্ঘটনায় কবলে পড়ে মো.নেছার (১৮) নামে জলে নিহত হয়েছে।

এছাড়া পানিতে সড়ক ডুবে থাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

এদিকে, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে একটি মাছধরার ট্রলার ডুবে দুই জেলের খোঁজ মিলছে না। ওই ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও দুইজনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ দুই জেলে হলেন নুরুল আলম ও শান মিয়া। এই দুই জেলের সাথে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের আবদুস শুক্কুরের মালিকানাধীন ট্রলারটিরও খোঁজ মিলছে না।

জেলার স্তানীয় জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানাগেছে, গতকাল ফজরের সময় আচমকা বৃষ্টিতে জেলার রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও, উখিয়া, টেকনাফ মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার উপক্রম হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃষ্টিতে সৃষ্ট ঢলে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

কক্সবাজার সদর উপজেলা চেয়ারম্যান জিএম রহীমুল্লাহ জানান, একটানা প্রবল বৃষ্টিতে সদর উপজেলার ঈদগাঁও, ঝিংলজা, চৌফলদন্ডী, লিংকরোড়, খরুলিয়া, উপজেলা গেইটসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে লিংরোড মুহুরী পাড়ায় এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে। সদর উপজেলা গেইট এলাকায় প্রধান সড়ক পানিতে ডুবে থাকায় দূরপাল্লার- যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে ১১ পর্যন্ত।

একই ভাবে কক্সবাজার শহরও তলিয়ে গেছে পানিতে। প্রবল বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে শহরের রুমালির ছড়ায় শতশত দোকানপাট বাড়িঘর এক কোমর পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে সকাল থেকে লোক আটকে পড়ে।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র সরওয়ার কামাল জানান, প্রবল বৃষ্টির পানিতে কক্সবাজার শহরের বাজার ঘাটা, পিটিস্কুল বাজার, উত্তর রুমালিয়ারছড়া, পেশকার পাড়া, টেকপাড়া, গোলদিঘীর পাড়, গোদারপাড়াসহ আরো কয়েকটি এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া পানিতে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাড়িঘর ও ফ্লাটবাড়ির নিচতলায় পর্যন্ত ডুবে যায়। উত্তর রুমালিয়ার ছড়া ইটখোলা রোড , হাশেমিয়া মাদ্রাসার সামনের এলাকা , আলিরজাহাল ও ঝিলংজার শতশত বাড়িঘর বর্তমানে কোমর পরিমাণ পানিতে ডুবে থাকে দীর্ঘক্ষণ।

এদিকে পানিতে ডুবে থাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। রাত সাড়ে ১১ টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এছাড়া পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকার অনেক অভ্যন্তরীণ সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

অন্যদিকে পূর্ণিমার জোয়ারেও প্লাবিত হয়েছে উপকূলের অনেক এলাকা। জোয়ারের পানিতে কুতুবদিয়া, পেকুয়ার, মহেশখালীর মাতারবাড়ি, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায়।

রামু:
টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীসহ বিভিন্ন খালে অস্বাভাবিক ভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকা আবারো প্লাবিত হয়েছে। ফলে বন্যার পানিতে ফকিরা বাজার, চেরংঘাটা ষ্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে এই অঞ্চলের ৩ হাজার হেক্টর আমন ধান ও একশ হেক্টর শাক সবজি, বেগুন, মুলা ক্ষেত। সাম্প্রতিক বন্যায় ভেঙ্গে যাওয়া হাইটুপী জাদি পাড়া সড়কসহ বিভিন্ন রাস্তা, বেড়ি বাঁধের ভাঙন মেরামত না করায় মুলত এসব ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যার কারনে বেড়েছে পানি বন্দি থাকা মানুষের দূর্ভোগ।

জানা গেছে টানা বৃষ্টির কারণে বাঁকখালী নদীসহ বিভিন্ন খালে উজান থেকে ঢল নেমে আসায় ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল, চাকমারকুল, জোয়ারিয়ানালা, কাউয়ারখোপ, গর্জনিয়া, ঈদগড়ের অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় রামু ফকিরা বাজারে বেচাবিক্রি বন্ধ রয়েছে।

রামু উপজেলা উপ সহকারি কৃষি অফিসার আনোয়ার হোসেন জানান, টানা বৃষ্টিতে নদীর পানি ঢুকে ৭টি ইউনিয়নের তিন হাজার হেক্টর তিন হাজার হেক্টর আমন এবং একশ হেক্টর শাক সবজিসহ বিভিন্ন জাতের ক্ষেত ডুবে গেছে।

এদিকে রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজ খবর নেন।

ঈদগাঁও
কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও এলাকা এবার পঞ্চমবারের মত বন্যার পানিতে ডুবলো। এতে করে দূর্ভোগ আর দূর্গতিতে পড়েছে বৃহত্তর এলাকার লোকজন। আবার গ্রামাঞ্চলের বহু বাড়ীঘর প্লাবিত হয়ে পড়ায় অনেক পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। বলতে গেলে গ্রামাঞ্চলের লোকজন অসহায় হয়ে পড়েছে। যদ্দুর দেখা যায়, ততদুর পানি আর পানি ছাড়া কিছুই নেই। টানা ৪দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত আর ভারী বর্ষণ ফের পঞ্চমবারের মত ঈদগাঁওবাসীকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বন্যা। অন্যদিকে বিশাল এলাকার সড়ক-উপসড়কে ক্ষতবিক্ষত চিহ্ন স্মৃতি সরূপ রয়ে গেছে। জানা যায়, গেল বন্যার বেশ কিছুদিন পার হতে না হতে ফের বন্যার সম্মুখীন হয়েছে ঈদগাঁও বাজারের অলিগলিসহ বৃহত্তর এলাকার লোকজন। গত ৩/৪ দিন পূর্বে থেকে প্রচন্ড বৃষ্টিপাতে বৃহত্তর ঈদগাঁও তথা জালালাবাদ, ইসলামাবাদ, পোকখালী, চৌফলদন্ডী, ইসলামপুরসহ ঈদগাঁও ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের বাড়িঘরে এবং বাজার এলাকা পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

চকরিয়া
চকরিয়ায় টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢল নেমেছে। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার ফের উপজেলায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে উপজেলার প্রায় নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পঞ্চম বারের বন্যার মুখোমুখি হবে এ অঞ্চলের মানুষ।

জানা যায়, ভারী বর্ষণে মাতামুহুরী নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ার ফলে পৌরসভার বিভিন্ন জনপদের নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়েছ। পৌরশহর রক্ষাবাঁধ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বরইতলী ইউপির ডেইঙ্গাকাটা, রসুলাবাদ, গোবিন্দপুর, শান্তিবাজার এলাকার বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে গেছে পানিতে। পানি উন্নয়ন বোর্ড পূর্বের বন্যায় ভেঙ্গে যাওয়া বেড়িবাঁধ সমুহ মেরামতে কোন ধরণের উদ্যোগ না নেয়ায় মুলত নদীর তীরবর্তী এলাকার লোকজনকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বারবার।

উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম, হারবাং ইউপি চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন আহমদ বাবর, লক্ষ্যারচর ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মানিক, কৈয়ারবিল ইউপি চেয়ারম্যান শরীফ উদ্দিন চৌধুরী, চিরিংগা ইউপি চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, পুর্ববড় ভেওলা ইউপি চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল, পশ্চিম বড় ভেওলা ইউপি চেয়ারম্যান মো.সাহাব উদ্দিন ও ঢেমুশিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রোস্তম আলী জানিয়েছেন, সোমবার ও মঙ্গলবারের টানা ভারী বর্ষণে মাতামুহুরী নদীতে ফের পাহাড়ি ঢল নেমেছে। ফলে নদীর পানি বেড়ে গিয়ে বর্তমানে তাদের ইউনিয়নের প্রায় নিমাঞ্চল কয়েক ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। তাঁরা বলেন, রাতে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে মাতামুহুরী নদীতে পানি প্রবাহ বাড়বে। এতে করে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহতা রূপ নেবে।

বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান বদিউল আলম বলেন, মঙ্গলবার পাহাড়ি ঢলের কারনে মাতামুহুরী নদীতে ব্যাপক আকারে বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। নদীর দুই তীর উপচে ঢলের পানি ঢুকে পড়েছে বিএমচর ইউনিয়নের প্রায় নিচু এলাকায়। আগের কয়েকদফা বন্যার কারনে ইউনিয়নের একাধিক পয়েন্টে পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এসব ক্ষতিগ্রস্থ অংশ দিয়ে নদীর পানি ঢুকে কৃষকের বীজতলা ও খেতের অবশিষ্ট ফসল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
কোণাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার বলেন, ভারী বর্ষণে মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি বেড়ে যাওয়ার কারনে তার ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্থ বেড়িবাঁধ হয়ে লোকালয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর পানি। এ অবস্থার কারনে ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকার বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে।

পেকুয়া
পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতির ৪ দফায় ফের তিন ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে।
টানা বৃষ্টি ও পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে পেকুয়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

পেকুয়া সূত্র জানাগেছে, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের সিরাদিয়া এলাকায় পাউবোর ৪ টি বেড়িবাঁধ ভাঙ্গা থাকায় ফের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ইউনিয়নের প্রায় ২০ টি গ্রামের অর্ধলক্ষ লোক পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। পেকুয়া সদর ইউয়িনের সিরাদিয়া, বিলহাচুড়া, নন্দীরপাড়া, বলিরপাড়া, বাজারপাড়া, পূর্বমেহেরনামা, মিয়াপাড়া, সরকারীঘোনা, হরিণাফাড়ি, গোঁয়াখালী, উত্তর মেহেরনামা, মইয়াদিয়া, জালিয়াখালী, সাবেকগুলদি, মৌলভীপাড়া, সুতাবেপারী পাড়া, মাতবরপাড়া, মোরারপাড়া, বাইম্যাখালী, সিকদারপাড়া সহ ২০ টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক লোকজন পানিবন্ধী হয়ে পড়েছে। এ সব এলাকার রাস্তাঘাট ও যাবতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্টান, পুকুর, বসতবাড়ি পানির নীচে তলিয়ে গেছে।