মেইন ম্যেনু

আমাকে নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল : টিউলিপ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি এবং বঙ্গবন্ধুর নাতনি টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় লেবার পার্টির এমপি। ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশেও একজন মুসলিম হওয়ার কারণে পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচনের পথে তাকে সইতে হয়েছে অনেক বাধা। পদে পদে হেয় করা হয়েছে। এমনকি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য নিজের নাম পরিবর্তনের উপদেশও দেয়া হয় তাকে। বিরোধী পক্ষ নির্বাচনী প্রচারণায় টিউলিপের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কথা বলতে ছাড়েনি।

লন্ডনের চলমান মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির মুসলিম প্রার্থী সাদিক খান ও কনজারভেটিভ পার্টির জ্যাক গোল্ডস্মিথের লড়াই সেই তিক্ত স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছে টিউলিপকে। একজন মুসলিম বলে সাদিক খান যাতে মেয়র নির্বাচিত হতে না পারেন, তার জন্য বিরোধী পক্ষ সব ধরনের নোংরা রাজনীতি করেছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ধর্ম নিয়ে আক্রমণ করেছে সবচেয়ে বেশি। এমনকি সাদিক খানকে জঙ্গি বলতেও দ্বিধা করেনি বিরোধী শিবির।

আজ লন্ডনে মেয়র নির্বাচনের ভোট নেয়া হচ্ছে। তার প্রাক্কালে ব্রিটিশ অনলাইন ‘ইনডিপেনডেন্ট’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে নিজের সেই সংগ্রাম আর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন টিউলিপ।

নিবন্ধটির হুবহু বাংলা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

“এটি প্রায় নয়, তবে আমি মাঝেমধ্যেই কনজারভেটিভ পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান ব্যারোনেস ওয়ার্সির সঙ্গে একমত হই। তবে সম্প্রতি লন্ডনের মেয়র নির্বাচন নিয়ে তার করা একটি মন্তব্য আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করেছে। তিনি বলেছেন, লন্ডনের মেয়র নির্বাচনের জন্য সাদিক খান যদি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য মুসলিম না হন, তাহলে কোন মুসলিম?’

“ব্যারোনেস ওয়ার্সির সঙ্গে আমার বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। প্রথমত আমরা দুজনই জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু নারী, যারা মুসলিম পরিবার থেকে বিশ্বরাজনীতিতে উঠে এসেছি। সন্দেহাতীতভাবে বলতে পারি, তিনিও অনেক ‘ইসলামফোবিয়া’র শিকার হয়েছেন, যা যেকোনো মুসলিম রাজনীতিবিদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

“গত বছর আমি হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে ব্রিটিশ সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। এই হ্যাম্পস্টেড শহরেই আমার শৈশব কেটেছে। ইহুদিদের প্রাণকেন্দ্র এই শহরে কখনোই নিজেকে একজন বহিরাগত বলে মনে হয়নি। অসংখ্য সিডার ডিনার (মিশরের কাছ থেকে ইসরায়েলিদের স্বাধীনতা অর্জন উপলক্ষে বিশেষ একটি আনুষ্ঠানিকতা, যা মূলত ইহুদিরা পালন করে।) অংশ নিয়েছি এবং আমাদের বাড়িতেও ক্রিসমাস ট্রি ছিল। ব্রিটেনে বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত ছিল আমার পরিবার। একই ভাবে আমাদের প্রতিবেশীরাও ঈদে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসত। আমরা সবাই লন্ডনের নাগরিক, এই সূত্রে একসঙ্গে বাঁধা ছিলাম। এসব আনুষ্ঠানিকতা আমরা ধর্মীয় চেতনা থেকে যতটা না পালন করেছি, তার চেয়ে বেশি করেছি একাগ্রতার স্পৃহা নিয়ে।

“কৈশোরেই আমি লেবার পার্টিতে যোগ দিই। যখন এমপি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উদ্যোগী হলাম, তখন প্রথমবার শুনি যে আমার ধর্ম নাকি এ ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। স্থানীয় সদস্যদের মধ্যে নেতিবাচকতা ছিল না, কিন্তু বহিরাগত অনেকেই আমাকে হুঁশিয়ার করে যে, আমার নামের শেষের অংশের জন্য নাকি আমি কখনোই মনোনয়ন পাব না।

“আমাকে এও বলা হলো, ‘টিউলিপ সিদ্দিক’ নামে কোনো ব্যক্তিকে এমপি হিসেবে ব্রিটিশ জনগণ ভোট দেবে না। কেউ কেউ তো আরও কৌশল করে বলল, ‘একটা কাজ করতে পারেন। আপনি ‘সিদ্দিক’ নামটি বাদ দিয়ে আপনার স্বামীর নাম যুক্ত করতে পারেন, যা আপনাকে নির্বাচনে সাহায্য করবে।’

“আমার বিরোধীরা তো নির্বাচনী প্রচারণায় এই সুযোগ লুফে নিল। কিলবার্ন মসজিদের বাইরে প্রচারণা চালাতে গিয়ে আমার বিরোধী প্রার্থী তো জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে জানাল যে, আমার স্বামী একজন ইহুদি। অন্যদের সতর্ক করে কর্কষ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ইহুদিদের বলছি, তিনি একজন মুসলিম ছিলেন। আসলে তার নামের প্রথম অংশ দিয়ে তিনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ভোট হাতিয়ে নিতে চাচ্ছেন।’ কারও কারও কাছে আমি বিষাক্ত ছিলাম, কারণ আমি মুসলিম। আবার কারও কারও কাছে আমি দোষী, কারণ আমি যথেষ্ট মুসলিম নই।

“লেবার পার্টির জন্য কঠিন সময় হলেও আমি কিন্তু নির্বাচনে প্রচুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয় পাই। এবং অবশ্যই আমি আমার নাম পরিবর্তন করিনি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কুসংস্কার ও ধর্মীয় বিশ^াস পুঁজি করে চালানো প্রচারণা সত্ত্বেও হ্যাম্পস্টন অ্যান্ড কিলবার্নের জনগণ লেবার পার্টির এমপি হিসেবে টিউলিপ সিদ্দিককে ভোট দিয়ে জয়ী করেছে।

“চলতি সপ্তাহেও আমি আশা করব লন্ডন আবারও এ ধরনের নমনীয়তা দেখাবে। সম্প্রতি ধর্মের কারণে সাদিক খানকে ব্যক্তিগতভাবে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে একজন সহযোগী ও মুসলিম হিসেবে যা দেখা সত্যিই খুব কঠিন।

“যখন সাদিকের মাথার সব চুল কালো ছিল, তখন থেকে তিনি আমার পরিচিত। আমি সব সময় তাকে দেখেছি এমন একজন হিসেবে, যিনি সংকল্পে পৌঁছানোর জন্য নিজস্ব উপায়ে কাজ করেন, যিনি ন্যায়বিচারের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করেন।

“সংরক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) দলের নির্বাচনী প্রচারণায় বহুপ্রচলিত বর্ণবাদ দীর্ঘদিন ধরে লালিত। আমি এখানে ব্যক্তির ধর্মকে দ্বিতীয় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে দিব না।

“জ্যাক গোল্ডস্মিথের নির্বাচনী প্রচারণার নোংরামি আমাকে তাড়িত করে। আমি মনে করি তিনি যথেষ্ট ভদ্র। এটি বোঝা খুব সহজ যে, তার আশপাশের লোকজন সস্তা সমর্থন পেতে তার গায়ে কালিমা ছিঁটাচ্ছে। তবে অন্যরা কেন এটি বিশ^াস করবে?

“কিন্তু এই অজুহাত আমার জন্য যথেষ্ট নয়।

“একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যদি আপনি মনে করেন যে প্রচারণা অশালীন পথে এগুচ্ছে, তবে অবশ্যই আওয়াজ দিতে হবে। এর কারণ হচ্ছে যদি কোনো কোনো সমর্থক অনুপযুক্ত কিছু বলে থাকে এবং সেটি যদি প্রচারণার কেন্দ্র থেকে বারবার বেরিয়ে আসতে থাকে, তাহলে অন্যদের মধ্যে ভুল বার্তা যায়, যা প্রচারণাকে অন্যদিকে ধাবিত করে।

“৭/৭ হত্যাকা-ের সবচেয়ে ভয়াবহ ছবির সঙ্গে আপনার মতামত জুড়ে দিয়ে আপনার সম্মানকে আরও খর্ব করা হয়েছে। আমি কিন্তু তখনো চুপ থাকিনি। ডেইলি মেইল পত্রিকায় জ্যাক গোল্ডস্মিথের একটি লেখা তাকে আমার কাছে আরও নত করেছে। একজন মুসলিম হিসেবে বিশেষ করে একজন লন্ডনবাসী হিসেবে তার কলামে আমি সত্যিই অবাক হয়েছি।

“আমি জানি, নির্বাচনে জয়লাভের জন্য প্রচ-ভাবে লড়তে হয়। কিন্তু জ্যাক গোল্ডস্মিথের নির্বাচনী প্রচারণা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার উদ্দেশ্যই হলো মানবতাকে ছাপিয়ে যাওয়া। সে ক্ষেত্রে জয়ের জন্য মানুষের ব্যক্তিগত বিশ^াসেও আঘাত করা হচ্ছে।

“লন্ডনের মতো বড় শহরের নেতৃত্ব দিতে তিনি (গোল্ডস্মিথ) যোগ্য নন। আমি আশা করব, এই শহরের শালীন মনের মানুষেরা সেটা অনুধাবন করবেন।”