মেইন ম্যেনু

আমাদের জাদুকর সৈয়দ শামসুল হক

মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না।

আজকের খ্যাতকীর্তি সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় কিঞ্চিদধিক ষাট তো হবেই। বাঙালি ঘরের রেওয়াজ অনুযায়ী যে বয়সে বাড়ন্ত ছেলেরা বিশ্বকে পরখ করার জন্যই হয়তো অদম্য কৌতূহলে বাড়ি পালায়, কচি মুখের আদলে কোমলতা হারিয়ে একটা শ্যামল কাঠিন্য দেখা দিতে শুরু করে, গলায় আসে স্বর বিভঙ্গ ঠিক সেই সময় আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা।

আমার মাথাভর্তি তখন কেবল সাহিত্যের বই। আব্বা-আম্মার সূত্রে পাঠ-অপাঠ্য যা কিছু ছাপার হরফে চোখের সামনে পড়ছে তাই গলাধঃকরণ করছি।

ঠিক সে সময় ফজলে লোহানী সম্পাদিত অগত্যা অসাধারণ সংখ্যা হাতে আসে। প্রথম চোখ বুলোনো থেকে বারবার ফিরে ফিরে পড়তে প্রায় লেখাই কণ্ঠস্থ হয়ে যায়। লেখকদের তালিকায় নামে-বেনামে কত না জনের ব্যাপারে ঔৎসুক্য বেড়ে যায়। বলতে গেলে আনিস চৌধুরী, মাহবুব জামাল জাহেদী, শামসুর রাহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, জয়নুল আবেদিনদের রোমান্টিক ধাঁচের লেখাগুলোর রীতিমতো প্রেমে পড়ে যাই। সেই কৌতূহল থেকেই সরাসরি ঢাকায় এসে ১০৫ তাঁতীবাজার পৌঁছে যাই ফুলবাড়িয়া স্টেশনে নেমে আলুবাজার, উর্দু রোড, ইংলিশ রোড পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত তাঁতীবাজারে।

সৌভাগ্যবশত সেই প্রথম দিনই মূল কাণ্ডারি ফজলে লোহানীর দেখা পেয়ে যাই। তিনি নিজে থাকতেন সদ্য নির্মিত আজিমপুর কলোনিতে তার একমাত্র বোন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হুসান বানু খানমের ফ্ল্যাটে। মহাঅনিশ্চয়তার সে রাতে লোহানী ভাইয়ের সদাশয়তায় ওই তাঁতীবাজারেই এক ঘিঞ্জি প্রকোষ্ঠে টেবিলের ওপর আমার রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে সুলতান মিয়া নামে আমাদেরই এলাকার একজনের সঙ্গে পরিচিত হই। যিনি ছিলেন অগত্যা পরিবারের কম্বাউন্ড হ্যান্ড। সে অনেক কাহিনি। সে প্রথম রাত্রির অভিজ্ঞতা বিষয় অন্য জায়গায় লিখেছি বলে আর পুনরুক্তি করলাম না।

সে দিন কিংবা পরের দিনও হতে পারে অগত্যার লেখক শামসুল শায়েরের সঙ্গে পরিচিত হলাম।

সে বয়সেই এতটা পেকে গিয়েছিলাম যে শুধু স্মোকার বললে কম বলা হবে যাকে বলে চেনস্মোকার বা তারও অধিক কিছু। আজ মনে হয়, সেসব সোনালি দিনে সিগারেটের স্বাদও ছিল সোনালি। বুকভরে সুখটান খেয়ে যে পরিতৃপ্তি পাওয়া যেত আজ তার সেসব কোথায়!

আজ সুদীর্ঘ এতকাল পরেও মনে আছে সে দিনকার সেই কৃশকায় কিন্তু উজ্জ্বলতম প্রতিশ্রুতি যা শামসুল শায়েরই পরবর্তীকালে খোলস পাল্টে হয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক। আমরা তখন সবাই সোনালি রঙের প্যাকেট মোড়া গোল্ড ফ্লেক-ব্র্যান্ডের একনিষ্ঠ সেবক ছিলাম। হক ভাই আমাকে শুধু সিগারেটই খাওয়াননি, অনুজপ্রতিম স্নেহের ঋণে আবদ্ধ করে আমাকে ধন্য করেছেন। যার রেশ আজ এতকাল পরেও আমাকে ঘিরে রয়েছে। মনে পড়ে সে যাত্রায় দেশে ফিরে যাওয়ার পর হক ভাইয়ের প্রীতিসিক্ত স্নেহের এক চিঠি পেয়ে কী যে অপার আনন্দে ভেসেছিলাম তা আর বলার মতো নয়।

যে মানুষটি এক বছরে একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি বই তাও আবার গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ আমাদের জ্ঞাতব্য বিশেষ করে যারা বাংলা ভাষার চর্চা করেন তাদের জন্য জ্ঞানকোষের শামিল- লেখালেখিতে অক্লান্ত, তিনি যে সব ধরনের বিশেষণের অতীত, তা কি তার বলার অপেক্ষা রাখে। এ ছাড়াও যার হাতে শিশুতোষ রসগোল্লাও সব বয়সের রসনাতে স্বাদ-গন্ধে-বর্ণে সমান টইটম্বুর আজ তার অনধিক পঞ্চাশ বছরের সাহিত্যজীবনের গোলাজাত ফসল কতটা স্বর্ণপ্রসূ তা অনুমানেরও অতীত।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বা ফকির বিদ্রোহের পটভূমিতে নূরলদীনের সারাজীবন-এর মতো কালজয়ী নাটক যাব হাত দিয়ে বেরোয় তিনি যে কত বড়মাপের লেখক এবং নাট্যকার তা বোধকরি বিশদ করাটা বাহুল্যেরই শামিল। আর যদি বলা হয় একেবারে শুরুর দিকে লেখক জীবনে বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালার প্রতিটি পঙ্ক্তির প্রতিটি সুনির্বাচিত শব্দচয়ন ছন্দের প্রবহমানতা, স্মরণযোগ্য কাব্যে রূপান্তরিত করতে পারেন তাকে কী বলবেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা ছোট অবয়বে প্রায় মহাকাব্যিক বিস্তার সৈয়দ শামসুল হককে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে তার আর কোনো সীমা সরহদ্দ জানা নেই।

সৈয়দ শামসুল হক হচ্ছেন আমাদের জানা মতে সম্পূর্ণ আপনগড়া এক মানুষ। যা শুধু অমানুষিক খাটুনি আর খাটুনি সম্ভব; যা আজকের দিনে অতিশয় বিরল। নিজেকে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন কঠোর শ্রম আর নিষ্ঠা দিয়ে। এমনকি এ ধরনের কঠিন কাজ করতে গিয়ে তিনি দৈহিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার জীবনে ‘রক্তগোলাপ’ নামের একটি অবিস্মরণীয় ছোটগল্পের সূত্রে দৈব আশীর্বাদের মতো আসে যশোরের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিদূষী, বিদ্রোহ সঞ্চারি রূপসী আনোয়ারা সৈয়দ হক। নিজে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তো বটেই এমনকি লেখালেখিতেও দারুণ সাহসী আর স্পষ্টবাদী। আসলে বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় ‘দু’জনে দু’জনার’।

প্রতিভাসম্পন্ন লেখকরা চিরকাল আমাদের চলতি হিসেবের বাইরের লোই হয়ে থাকেন। আমাদের শুধু দেখতে হবে তার সৃষ্টির, নির্মাণের সুদৃঢ় ভিত্তি। বাংলা ছোটগল্পের ক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হক অবশ্যই বেশক’টি অবিস্মরণীয় গল্পের স্রষ্টা। আর উপন্যাসে তো তিনি জলেশ্বরীকে উপজীব্য করে জাদুবাস্তবতার একটি আবহ তৈরি করতে সচেষ্ট রয়েছেন। কবিতায় তো তিনি স্বরাট এবং একচ্ছত্র, নাটকে বিশেষ করে আগেই বলা হয়েছে স্বাধীনতা উত্তরকালে তার জুড়ি এখনো তেমনভাবে দৃষ্ট হয়নি।

তো হ্যাঁ, এখনো তিনি কি লেখনীতে কি জীবনাচরণে কতটা সপ্রতিভ, সাবলীল আর সৃষ্টিশীল তার অজস্র লেখাই তার প্রমাণ। গল্প, উপন্যাস ছাড়াও সাহিত্যবিষয়ক বিচিত্র লেখালেখি যেমন মার্জিনে মন্তব্য, হৃৎকলমের টানে বা কথা সামান্যই তো সৈয়দ হক ভাষা, আমাদের সবার প্রিয় বাংলা ভাষা নিয়ে অনায়াসে যেসব জ্ঞানগর্ভ অথচ সাধারণ লেখা লিখছেন সেগুলো যে কত মূল্যবান, মনোযোগ সহকারে না পড়লে বোঝা যাবে না।

আমরা তো বলি তিনি শটিত এবং কুৎসিত রাজনীতিক বিষয় নিয়ে অযথা মাথা না ঘামিয়ে সাহিত্যের নানা অজানা তথ্য নিয়ে লেখালেখি করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ এবং সেই সঙ্গে আমাদেরও কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করুন। অন্য যে কোনো দেশ হলে এই মাপের একজন লেখককে নিয়ে কতই না মাতামাতি হতো, অথচ আমরা কূপমণ্ডুকরা অন্যেও প্রশংসা এতই ব্যয়কুণ্ঠ যে তা আর বলার মতো নয়। আমরা শুধু একতরফা নিতেই জানি দিতে জানি না কিছুই। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে কোনো লেখকের কাছেই অনুকরণীয় হতে পারে। অবসর সময়ে যখন করোটি অন্য কিছু নিতে চায় তখন বিশ্বেও অনেক বড় বড় কবির কবিতা সৈয়দ হক অক্লান্তভাবে রূপান্তর করে চলেন। সত্তরের দশকে তার পরানের গহীন ভিতর উভয় বাংলার সাহিত্য মহলেই সবিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

আসলে সৈয়দ হক তাঁর সুদীর্ঘ সাহিত্যজীবনকে যে ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগিয়েছেন তার সমসাময়িকদের মধ্যে তা বিবল, পরবর্তী প্রজন্মের কথা না হয় ছেড়েই দেয়া গেল।খবর বাংলা ট্রিবিউনের।