মেইন ম্যেনু

আমার বাবা একটা শয়তান, আমি ঘৃণা করি ওঁকে, কিন্তু আমিও কি…

উত্তরাধিকার সূত্রেই কী পারিবিরক অশান্তি চলতে থাকে? নিজের মায়ের উপর বাবার নির্মম অত্যাচারের সাক্ষী ছোট্ট একটি ছেলে নিজে আজ একজন বাবা? কিন্তু, তাঁর সন্তানের চোখেমুখে কিসের আতঙ্ক? এক বাবার অসহায় স্বীকারোক্তি…

‘‘অধিকাংশ ছেলেই চায় বড় হয়ে তাঁর বাবার মতো হতে। বাবার চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিভিন্ন ভাল দিক নিজের মধ্যে আনতে। কিন্তু আমি কোনওদিন সেরকম চাইনি। কারণ আমার বাবা আমার কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন। বাবা প্রতিদিন মায়ের উপরে যে নির্মম অত্যাচার চালাতেন, তাতে সেটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। মনেপ্রাণে চাইতাম, আমি যেন আমার বাবার মতো না হই। আজ আমি নিজে একজন বাবা। দুর্ভাগ্য, পাঁচ বছরের ছেলে সোনুর চোখেও আজ আমায় নিয়ে সেই রকম আতঙ্ক দেখতে পেলাম। আমার চোখাচোখি না হওয়ার জন্যে বালিশে মুখ গুঁজে রইল সে। বুঝতে পারলাম, এত চেষ্টা করেও বাবার চরিত্রের সেই খারাপ দিকগুলো আমার মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে।

আমার গোটা ছেলেবেলাটাই মায়ের উপরে বাবার অত্যাচার আর মারধরের স্মৃতিতে ঠাসা। বাবা বরাবরই রগচটা ছিল। চাকরি চলে যাওয়ার পরে বাবার তাণ্ডব আরও বেড়ে যায়। মা স্থানীয় ব্যাঙ্কে ক্যাশিয়ারের চাকরি করতেন। আর সন্ধেবেলা বাবার মারধর, অত্যাচার সহ্য করতেন। সন্দেহ, নিরাপত্তাহীনতা-সহ মানুষ থেকে শয়তানে পরিণত হওয়ার জন্য যা যা কারণ প্রয়োজন, বাবা সেই সব কারণ খুঁজে বের করতেন। বাবা তলপেটে এক-একটা লাথি মারতেন, আর যন্ত্রণায় মায়ের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসত। শারীরিক যন্ত্রণার থেকেও গর্ভস্থ সন্তানকে হারানোর ভয় বেশি করে ফুটে উঠত মায়ের চোখেমুখে। রাতে মাঝেমধ্যেই আতঙ্কে আমার ঘুম ভেঙে যেত। ভয় লাগত, আবার হয়তো মায়ের উপরে বাবা অত্যাচার শুরু করেছেন। ডালে সামান্য নুন কম-বেশি হওয়ার জন্যে বাবা যখন মায়ের হাতে জ্বলন্ত কয়লার ছেঁকা দিত, তখন মায়ের গর্ভেই মৃত্যু হওয়া আমার ভাই বা বোনের উপরে আমার খুব হিংসা হত। কারণ, ওঁদের মতো পৃথিবীতে আসার আগে আমারও মৃত্যু হলে নিজের মায়ের এই যন্ত্রণা অসহায়ের মতো আমায় সহ্য করতে হত না। আমার পৃথিবার আলো দেখার পিছনে ওই নোংরা মানুষটার অবদান আছে, এটা ভেবেই আমার শরীরটা ঘিন ঘিন করত। যেদিন আমার বাবার মৃত্যু হল, সেদিনও আমার মায়ের বুকফাটা কান্নাকে আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। কারণ, আমার স্থির বিশ্বাস ছিল, বাবার অমানুষিক অত্যাচার থেকে নিস্তার পেয়ে মায়ের চোখ থেকে আনন্দাশ্রু বেরিয়ে আসছে। আমি অবশ্য হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। ওই নোংরা মানুষটা তো কোনওদিন ফিরে আসবে না।

যদিও আমার ধারণা ভুল ছিল। আমার অবেচতন মনেই আমার বাবার চরিত্রের নোংরা দিকগুলো আমার ব্যক্তিত্বের উপরে চেপে বসেছিল।

পৃথিবীর যে কোনও স্বামী হয়তো হেনার মতো স্ত্রী পেলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করবেন। আমিও জানি, হেনা কোনও ভুল করেনি। কাজের প্রচণ্ড চাপের জন্যই অফিসে অতিরিক্ত তিন ঘণ্টা থাকতে হয় ওঁকে। অফিসের সহকর্মী রোশনের সঙ্গে ওঁর সম্পর্কটুকু পুরোটাই পেশাগত প্রয়োজনে। তবু রোশনকে আমি হিংসা করি। কারণ আমার রোশনকে দেখতে ভাল, শিক্ষাগত যোগ্যতাও বেশি। আর এই সন্দেহ, হীনমন্যতা থেকেই আজ আমি হেনার গায়ে হাত তুললাম। মুহূর্তের জন্য মেজাজ হারিয়ে আমার বাবার মতো সেই কাজটাই করলাম, যেটা আমি আজীবন ঘৃণা করে এসেছি। শেষ ১২ বছর আমার মা শান্তির জীবন কাটাচ্ছেন। এটা ভেবে যে, বাবাকে নিয়ে সেই আতঙ্কের মুখোমুখি তাঁকে আর কোনওদিন হতে হবে না। কিন্তু মা-ও বোধহয় আমার মধ্যে বাবার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। হেনাকে আমার মা নিজের মেয়ের মতো ভালবাসেন। মা যদি জানতেন তাঁর মতো হেনাকেও স্বামীর হাতে নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হবে, তখন মায়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে? মা, হেনা, সোনু কি আমায় ক্ষমা করবে? ওঁরা যদি ক্ষমা করেও, আমি কি নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারব?’’
এবেলা