মেইন ম্যেনু

আমেরিকা কি এবার পিছু হাঁটা শুরু করেছে?

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার পর থেকেই আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ যেন হঠাৎ করে মাথাচাড়া দিয়েছে৷ সম্প্রতি সেখানকার ভার্জিনিয়া প্রদেশের অ্যাশবার্নে একটি রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি লিখে রেখে এসেছেন যে, তাঁরা কৃষ্ণাঙ্গদের কোনও বখশিস দিতে চান না৷

তাঁদের খাদ্য পরিবেশন করেছিলেন কেলি কার্টার নামের এক কৃষ্ণাঙ্গিনী৷ কেলির পরিবেশিত খাবার ভরপেট খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ওই শ্বেতাঙ্গ দম্পতি ন্যাপকিনে তাঁর জন্য এহেন মধুর বার্তা দিয়েই চলে গিয়েছেন।

রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের বিভিন্ন দিক আছে৷ একদিকে তাঁর জিত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির খাতিরে ভারতের পক্ষে একটা সুবিধাজনক পরিমণ্ডল তৈরি করেছে। চিন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধ চালাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ভারতের কাছে অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক৷ কিন্তু

অন্যদিকে, আমেরিকায় যাদের ভিতরে এখনও উগ্র বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব রয়েছে তারা ভাবছে, এই মওকায় কৃষ্ণাঙ্গদের একটু কড়কে দেওয়া যাক৷ ভাবতেও আশ্চর্য লাগে, আমেরিকার মাটিতে এই উগ্র বর্ণবিদ্বেষের যাঁরা প্রবক্তা তাঁরা বহুকাল আগেই মরে ভূত হয়ে গিয়েছেন৷ কিন্তু অত্যাধুনিক মার্কিন সভ্যতাতেও তাঁদের ভূত এখনও সেখানকার বহু লোকের ঘাড়ে চেপে বসে আছে।

হালে আমেরিকায় বহু মুসলিম পুরুষ-রমণীও আক্রান্ত হচ্ছেন৷ কিন্তু সেটা না হয় মেনে নেওয়া গেল ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মঘাতী বিমান হামলার পরবর্তী ফল৷ তায় আবার ইদানীং খোদ আমেরিকাতেই ইসলামিক স্টেটের একাধিক অনুগামীর দেখা মিলেছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিরীহ দম্পতি সেজে সেদেশে ঢুকে বহু মানুষের প্রাণও হরণ করেছে৷

সুতরাং, মুসলমানদের উপর চড়াও হওয়ার ঘটনা কিংবা মুসলিম ভেবে শিখদের আক্রমণ করার ঘটনা আমেরিকায় এই মুহূর্তে আশ্চর্য কিছু ঠেকছে না৷ যেটা

ভেবে অনেক বেশি আশ্চর্য লাগছে সেটা এই, একবিংশ শতকের প্রায় দুই দশক হতে চলল এখনও সেদেশে কৃষ্ণাঙ্গদের উপর এত বিদ্বেষ যাদের মনে রয়েছে তারা ঠিক কোন গোত্রে পড়ে৷

বেশ কিছু দিন আগে আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে কৃষ্ণাঙ্গ প্রফেসরদের ছবিতে কে বা কারা আলকাতরা লেপে দিয়েছিল৷ তখনও কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফাইনাল রাউন্ড শুরু হয়নি৷ তবে তলে তলে সেদেশে যে ফের নতুন করে একটা বর্ণবিদ্বেষী জিগির শুরু হয়েছে সেটা তখনই বেশ ভালোমতোই বোঝা গিয়েছিল৷ কারণ, তারও আগে ওবামা জমানাতেই নিরীহ একাধিক কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিককে বিনা প্ররোচনায় প্রায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি করে মেরেছিল শ্বেতাঙ্গ পুলিশ৷ নিহতদের একজন ছিলেন প্রতিবন্ধী৷ হুইল চেয়ারে বসে পার্কে রোদ পোহাচ্ছিলেন।

ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধ থেকে আমেরিকায় একেবারে তাত্ত্বিকভাবে বর্ণবিদ্বেষের প্রচার শুরু হয়েছিল৷ যার মূল কথা ছিল অ্যাংলো-স্যাক্সনরাই শ্রেষ্ঠ মানবজাতি৷ তখন এমন অনেক বিজ্ঞানী থেকে আরম্ভ করে নৃতাত্ত্বিক, সমাজতত্ত্ববিদ সেখানে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন যাঁদের বর্ণবিদ্বেষের তত্ত্ব অনেকটা টিকি রাখার বৈজ্ঞানিক উপযোগিতার পর্যায়েই গণ্য হতে পারে৷ লুইসিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে শারীরতত্ত্বের অধ্যাপক ছিলেন জোসিয়া সি নট৷

তিনি বলেছিলেন, মানুষের পূর্বপুরুষ বানর বটে, তবে কৃষ্ণাঙ্গদের উদ্ভব ঘটেছে এক শ্রেণির নিচুজাতির বানর থেকে৷ এ রকমই আর একজন ‘বৈজ্ঞানিক’ ছিলেন স্যামুয়েল ই কার্টরাইট৷ তাঁর থিসিস ছিল, কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের থেকে কম অক্সিজেনে বাঁচে! ভন এভরি দেখিয়েছিলেন খুলির গঠনই কৃষ্ণাঙ্গদের পিছিয়ে পড়ার আসল কারণ৷

নাথানিয়েল এস শেলার বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কৃষ্ণাঙ্গদের মানসিক বিকাশ শ্বেতাঙ্গদের মতো নয়৷ আর বি বিনের অভিমত ছিল, কৃষ্ণাঙ্গদের মস্তিষ্ক ককেশিয়ানদের থেকে ছোট৷ উইলিয়াম ম্যাকগি বললেন, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষাঙ্গদের পূর্বপুরুষ কখনই এক হতে পারে না৷ প্রায় একই কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলেছিলেন ড্যানিয়েল জি ব্রিটন, ফ্রানজ বোয়াজ৷ মোদ্দা কথা, কৃষ্ণাঙ্গরা কোনও দিক থেকেই শ্বেতাঙ্গদের সমতুল্য নয়।

ধরে নেওয়া গেল, ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ কিংবা বিংশ শতকের শুরুতে না হয় এসব কথায় কান দেওয়ার মতো বিস্তর লোক আমেরিকায় ছিল৷ কিন্তু এখনও সেই একই চিত্র! যেখানে ইতালীয় বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী ডিএনএ পরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে যে, মানবসভ্যতার আদি মাতা ছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গিনী এবং মানব সভ্যতার জন্ম হয়েছিল আফ্রিকার বুকে, তার পরেও আমেরিকার মতো সভ্যতার শিখরে পৌঁছানো একটি দেশে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই ধরনের বিষ কী করে রয়ে যায়?

ঊনবিংশ শতকেরই শেষ ধাপে আমেরিকায় অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজনীতির অন্যমত প্রবক্তা ছিলেন উইলিয়াম বার্জেস৷ যাঁর ভক্তকুলের মধ্যে থিওডোর রুজভেল্টের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টও ছিলেন৷ সেই উইলিয়াম বার্জেসের একটি মন্তব্য হল: “The claim that there is nothing in the color of the skin from the point of view of political ethics is a great sophism. The black skin means membership in a race which has never of itself succeeded in subjecting passion to reason, has never therefore created any civilization of any kind.” (রাজনীতির ন্যায়-নৈতিকতার প্রশ্নে গাত্রবর্ণ কখনই বিচার্য হতে পারে না, এটা কিন্তু একেবারে নিরালম্ব যোগীদের মতো কথা৷ কালো চামড়া মানে সেই জাতিরই অংশ যারা কখনও আবেগের উপরে যুক্তিকে স্থান দিতে জানে না, তাই কোনও ধরনের সভ্যতাও তারা গড়ে তুলতে পারেনি৷)

উইলিয়াম বার্জেসদের আমলে বোধহয় কৃষ্ণ আফ্রিকার বেনিন, আইভরি কোস্ট কিংবা মোজাম্বিক ও জিম্বাবোয়ের মহান প্রাচীন সভ্যতাগুলির কথা জানাজানি হয়নি৷ কিন্তু আজকের আমেরিকারও সেদিনকার অজ্ঞান দুগ্ধপোষ্য অবস্থা কী করে থাকে, সেটাই তাজ্জব ব্যাপার।-কলকাতা২৪