মেইন ম্যেনু

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোপা চ্যাম্পিয়ন চিলি

টাইব্রেকারের চতুর্থ শটটিতে স্রেফ আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরোকে বোকা বানালেন আলেক্সিজ সানচেজ। আলতো টোকায় বল জড়িয়ে দিলেন জালে। সঙ্গে সঙ্গে সার্জি খুলে দৌড়। যেন বিশ্বজয়ের আনন্দে তখন কাঁপছে পুরো সান্তিয়াগো। খেলার পুরো ১২০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনাকে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে নিল স্বাগতিক চিলি।

আরও একটি ফাইনাল হতাশার হয়ে থাকল গ্রহের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির কাছে। গত ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হারতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। ওই ম্যাচে গোলের দেখা পাননি মেসি। এমনকি নিজেও খুব ভালো খেলা উপহার দিতে পারেননি তিনি।

এক বছর পরও একই আক্ষেপ। লাতিনের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে চিলিকে যেখানে বলে-কয়ে হারায় আর্জেন্টিনা, সেখানে গোল তো দুরে থাক, দু’একবারই দেখা গিয়েছিল মেসিকে। বরং মাঝ মাঠ থেকেও অনেক নীচে নেমে এসে খেলার কারণে যেন মেসিকে চেনাই যাচ্ছিল না। যদিও কয়েকটি গোলের সুযোগ তিনি তৈরী করেছিলেন। তবে পুরো খেলা দেখে মনে হয়েছে, মেসি যেন একজন জাভি কিংবা একজন ইনিয়েস্তাকে খুব মিস করছিলেন। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার নামন ভাগ্যের খেলায় শিরোপা অধরাই থেকে গেলো মেসির কাছে।

চিলিসান্তিয়াগোর এস্টাডিও ন্যাসিওনেল ডি চিলি। প্রায় ৫০ হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতা। পুরোটাই যেন পরিণত হয়েছিল লাল সমুদ্রে। সেই সমুদ্রের মাঝে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মত দেখাচ্ছিল আকাশী-সাদা জার্সি পরিহিত আর্জেন্টিনা সমর্থকদের। ভিন্ন কোন দেশে যে মেসিদের খেলতে নামতে হয়েছে সেটা স্টেডিয়ামের লাল সমূদ্র দেখলেই বোঝা যায়। খেলার শুরু থেকে আলেক্সিজ সানচেজদের পায়ে বল পড়লেই গগনবিদারি চিৎকারে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে যেন গোটা সান্তিয়াগো শহর।

কোপা আমেরিকার ফাইনালে মুখোমুখি প্রতিবেশি চির বৈরী দুই দেশ। রাজনীতি-অর্থনিত সর্বদিকেই আর্জেন্টিনার সঙ্গে শীতল সম্পর্ক চিলির। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিশ্বসেরা ফুটবলার মেসিরা মুখোমুখি হলো স্বাগতিক চিলির। কিন্তু শিরোপা নির্ধারনী এ লড়াইয়ের প্রথমার্ধ থাকলো গোলশূন্য সমতায়।
বরং, বলা যায় কোনমতে গোল হজম করা থেকে বেঁচে আছে মেসির আর্জেন্টিনা। স্বাগতিক দর্শকদের সামনে উজ্জীবিত চিলি যেন আরও দুর্দর্শ হয়ে উঠেছে আজকের ফাইনালে। প্রথম থেকেই প্রভাব বিস্তার করে খেলতে শুরু করে চিলিয়ানরা। পরিসংখ্যানেই বলে দেয় সানচেজরা কতটুকু এগিয়ে মেসিদের চেয়ে। বল পজেশনের পরিমান আর্জেন্টিনার ৪২, আর ৫৮ ভাগ চিলির। ১২০ মিনিটের খেলা শেষে যেটা দাঁড়াল চিলির ৫৭ ভাগ আর আর্জেন্টিনার ৪৩ ভাগে।

উল্টো ম্যাচের ২৫তম মিনিটে একটি কাউন্টার অ্যাটাক করতে গিয়ে লম্বা এক দৌড়ে ফিটনেসই হারিয়ে ফেলেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। সুতরাং, তাকে তুলে নিতেই বাধ্য হন কোচ মার্টিনো। পরিবর্তে মাঠে নামেন এজেকুয়েল লাভেজ্জি।

এর মধ্যে মেসির একটি দুর্দান্ত ফ্রি কিক থেকে ভেসে আসা বলে দুর্দান্ত হেড করেছিলেন আর্জেন্টিনার একজন। কিন্তু গোলরক্ষক ক্লদিও ব্রাভো সেটা ফিরিয়ে দেন। প্রথমার্ধের একেবারে শেষ দিকে লাভেজ্জির একটি শটও দারুন দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ব্রাভো।

আর্জেন্টিনাও গোল হজম করা থেকে বেঁচে যান বেশ কয়েকবার। সানচেজ, ভারগাস আর জর্জ ভালদিবিয়া বেশ কয়েকবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরী করে আর্জেন্টিনার জন্য।

দ্বিতীয়ার্ধেও অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। আগুয়েরোকে তুলে হিগুয়াইনকে নামিয়েও লাভ হলো না। বরং, চিলির নিয়মিত চাপের মুখে থাকতে হয়েছে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে। মেসিকে খেলতে হয়েছে অনেক নীচে নেমে এসে। দু’একটি বল বানিয়ে দিলেও সেগুলো ফিনিশিং দেওয়ার মত কাজ করতে পারেননি অন্যরা। বরং, মেসিকে যেন পুরো প্যাকেটবন্দী করে রেখেছিল চিলি।

তবে ৮২ মিনিটে দুর্দান্ত এক সুযোগ পেয়েছিলেন আলেক্সিজ সানচেজ। গোলরক্ষককে একা পেয়েও বাম পায়ের শটটি মেরে দেন বাইরে। শেষ বাঁশি বাজার আগে দারুন সুযোগ নষ্ট করলেন হিগুয়াইন। মেসির কাছ থেকে লাভেজ্জি। কোনাকুনি ক্রস করলেন তিনি। হিগুয়াইন দৌড়ে এসে শট নিলেও সেটি চলে যায় জাল ঘেঁষে বাইরে।

নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা গোলশূন্য ড্র থাকার পর গড়ালো অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। উল্লেখ্য, টুর্নামেন্টের নক আউটে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের নিয়ম না থাকলেও ফাইনালে রাখা হয়েছে এ ব্যবস্থা।

অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও কোন গোল হলো না। এ অংশে সবচেয়ে ভালো সুযোগটি পেয়েছিলেন সাচেজ। ১০৫ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে মাঝ মাঠ থেকে একাই বল নিয়ে আসেন। হ্যাভিয়ের মাচেরানো চলে আসায় শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন সানচেজ। একেবারে শেষ মিনিটে পর পর দুবার হিগুয়াইন এবং লাভেজ্জি গোলের সুযোগ নষ্ট করেন।

১২০ মিনিটের খেলায়ও কেউ কাউকে গোল দিতে পারলো না। সুতরাং, চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে খেলাটি গড়াল টাইব্রেকারে। প্রথম শট নেন চিলির ম্যাতিয়াস ফার্নান্দেজ। এ শটে গোল। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম শট নেন লিওনেল মেসি। তার শট ঝাঁপিয়ে পড়েও রক্ষা করতে পারলেন না ব্রাভো। ১-১।

দ্বিতীয় শট নিতে আসেন আরতুরো ভিদাল। তার শট হাতে লাগালেও ফেরাতে পারলেন না সার্জিও রোমেরো। আর্জেন্টিনার হয়ে দ্বিতীয় শট নিতে আসেন গঞ্জালো হিগুয়াইন। কিন্তু বারের অনেক ওপর দিয়ে মেরে দেন তিনি। ২-১।

চিলির তৃতীয় শট নেন চার্লস আরাঙ্গুইজ। এটাও গোল। আর্জেন্টিনার তৃতীয় শট নেন এভার বানেগা। কিন্তু ক্লদিও ব্রাভো ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে দেন তাকে। ৩-১। চিলির হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসেন আলেক্সিজ সানচেজ। এই শটে গোল হলেই জয়। সার্জিও রোমেরোকে পুরোপুরি বোকা বানালেন সানচেজ। আলতো টোকায় বল জড়িয়ে দিলেন জালে।

সাথে সাথেই উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো সান্তিয়াগো, পুরো চিলি। ৯৯ বছরের কোপার ইতিহাসে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ ঘোচানোর উল্লাস। এই প্রথম বড় কোন শিরোপা ঘরে তুলল আলেক্সিজ সানচেজরা। আর আরও একটি ফাইনালে উঠে শিরোপা বঞ্চিত থাকতে হলো মেসিদের।