মেইন ম্যেনু

আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তা

আলোর ওপর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের প্রভাব

নিউটনীয় বলবিজ্ঞানে মহাকর্ষ বল যে আলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এ কথা বলা হয়নি। শুধু নিউটন কেন, তার পরবর্তী যুগেও কেউ কল্পনা করেনি মহাকর্ষ বল আলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু আইনস্টাইন হিসেব করে দেখলেন মহাকর্ষ ক্ষেত্রের দ্বারা আলো প্রভাবিত হয়। আইনস্টাইন বললেন, আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের মান মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে। যে মহাকর্ষ ক্ষেত্র যত শক্তিশালী সেখানে আলোর কম্পাঙ্ক কমে যায়। যেখানে মহাকর্ষক্ষেত্র কম শক্তিশালী সেখানে আলোর কম্পাঙ্ক তুলনামূলক বেশি।

ধরা যাক একটা পরমাণু একটা আলোর উৎস। পরমাণুটি যদি পৃথিবীতে থাকে তা হলে সেটার কম্পাঙ্ক ধরা যাক বেগুনি আলোর কম্পাঙ্কের কাছাকাছি। কিন্তু পরমাণুটি যদি সূর্য পৃষ্ঠে থাকে তাহলে তার কম্পাঙ্ক বেগুনি আলোর কম্পাঙ্কের চেয়ে অনেক কম হবে। অর্থাৎ কম্পাঙ্ক লাল আলোর কাছাকাছি হবে।

এখানে বলে রাখা ভালো, সূর্যের সাদা আলো রঙধনুর সাতরঙের মিশ্রণ। বেগুনি, নীল, আসমানী, সবুজ হলুদ, কমলা, লাল। এদেরকে এক কথায় বলা হয় বেনীআসহকলা।

বেণীআসহকলার এই সমন্বয়টা কিন্তু এলোমেলো নয়। কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে। যেমন বেগুনি আলোর কম্পাঙ্ক সবচেয়ে বেশি। তারচেয়ে কম নীল আলোর। এর পরের স্থানটা আসমানীর, তারপর সবুজ, হলুদ, কমলা এবং সবশেষে লাল। আমরা এখানে নীল ও লাল আলোর তরঙ্গ নিয়ে কাজ করবো। কারণ বেগুণী আলোর বর্ণালী অত স্পষ্ট নয়। সে তুলনায় নীল আলোর বর্ণালী অনেক স্পষ্ট। তাই নীল আলো নিয়ে কাজ করতে অনেক সুবিধা।

এখন আরেকটা বিষয় জানা জরুরি, যে আলোর কম্পাঙ্ক যত বেশি সেই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত কম। সেই হিসাবে বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে ছোট। এখন কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যটাই বা কী? আমরা আগেই জেনেছি আলো তরঙ্গকারে চলে। আর তরঙ্গ মানেই ঢেউ।

প্রত্যেক তরঙ্গের শীর্ষ ও পাদ বিন্দু থাকে। একটা শীর্ষ বিন্দু থেকে আরেকটা শীর্ষ বিন্দু পর্যন্ত তরঙ্গ অর্ধ চক্র পূর্ণ করে। অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রি পথ পাড়ি দেয়। দুটো অর্ধচক্র সম্পন্ন হলে আলো একটা পূর্ণ চক্র পাড়ি দেয়। এক সেকেন্ডে আলো যে কয়কটি পূর্ণ চক্র সম্পূর্ণ করে তাকে কম্পাঙ্ক বলে।

আলো যখন সরলরৈখিক পথ পাড়ি দেয় সেটাকে ওই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ বলে। তরঙ্গের একটা শীর্ষ বিন্দু থেকে আরেকটা শীর্ষ বিন্দু পর্যন্ত সরল রেখাকেও তরঙ্গদৈর্ঘ্য বলে। একটা পাদ বিন্দু থেকে আরেকটা পাদ বিন্দু পর্যন্ত দূরত্বকেও তরঙ্গদৈর্ঘ্য বলে।

নীল আলোর একটা পূর্ণ চক্র অনেকটা বেশ লম্বাটে। তাই এর একটা তরঙ্গ শীর্ষ থেকে আরেকটা তরঙ্গ শীর্ষ পর্যন্ত রৈখিক দৈর্ঘ্যও কম। অন্যদিকে লাল আলোর তরঙ্গের ক্ষেত্রে একটা শীর্ষ থেকে আরেকটা শীর্ষ বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব নীল আলোর তুলনায় অনেক বেশি। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য শুধু নীল রঙের আলোর চেয়ে বেশি নয়, যেকোনও দৃশ্যমান আলোর চেয়ে বেশি।

এখন নীল ও লালের আলোকে বেণীআসহকলার দুটি প্রান্তীক তরঙ্গ ধরে নিই। বেগুনিকে বাদ দেওয়া হলো, কেন তা আগেই ব্যাখ্যা করেছি। তাই দুটোকেই আমাদের তুল্য আলোক তরঙ্গ ধরতে পারি। এখন আমরা যাব ডপলার এফেক্টে। ডপলার এফেক্টের উদাহরণেও আমরা ট্রেন স্টেশনকে ব্যবহার করতে পারি। তবে এখানে আলোক তরঙ্গের বদলে শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করা হবে।

ধরো তুমি স্টেশনে বসে আছো। দূর থেকে একটা ট্রেন হুইসেল বাজাতে বাজাতে স্টেশনের দিকে আসছে। তুমি শুনবে, ক্রমে ট্রেনের হুইসেলের শব্দ তীক্ষ্ম থেকে তীক্ষ্মতর হচ্ছে। এক সময় ট্রেন স্টেশনে দাঁড়াবে। ধরা যাক, স্টেশনে দাঁড়ানে অবস্থাই ট্রেন হুইসেল বাজালো। তখন তুমি হইসেলের শব্দ আগের মতো তীক্ষ্ম শুনবে না। সবাভাবিক হুইসেলই শুনেবে। ট্রেনের যাত্রীরা যেমন শোনে আর কি।

যখন ট্রেন স্টেশন ছেড়ে দূরে যেতে থাকবে তখন ট্রেনের হুইসেলের শব্দের তীক্ষ্ম তত কমবে। হুইসেলের স্বরও তখন বেশ মোটা হয়ে যাবে। ট্রেনের ভেতর যেসব যাত্রী থাকে তারা সবসময় একই রকম শব্দ শুনতে পায়। এটা কেন হয়? এটা হয় ডপলার এফেক্টের কারণে।

অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ক্রিশ্চিয়ান ডপলার ১৮৪২ ডপলার এফেক্ট নিয়ে সর্বপ্রথম আলোচন করেন।

আপেক্ষিক গতির কারণে শব্দের কম্পাঙ্কের এই পরিবর্তন ঘটে। আইনস্টাইন হিসাব করে দেখলেন মহাকর্ষ ক্ষেত্র দিয়ে চলার সময় আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্কের এমন তারতম্য ঘটে। আলোর ক্ষেত্রেও ডপলার এফেক্ট কাজ করে। আলোর উৎস যখন নিকটবর্তী হয় তখন আলোর কম্পাঙ্ক তীক্ষ্ম আর কম্পাঙ্কের বিচ্যূতি ঘটে নীলের দিকে। আর উৎস যখন দূরে সরে যায়, তখন আলোর কম্পাঙ্ক লালের দিকে বিচ্যূত হয়। আইনস্টাইন লক্ষ করে দেখলেন, যেখানে মহাকর্ষ ক্ষেত্র নেই সেখানে আলোর কম্পাঙ্ক একরকম, যেখানে শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্র আছে সেখানে আলোর কম্পাঙ্ক আগের তুলনায় কম। অর্থাৎ শূন্যস্থান অপেক্ষা মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ভেতর আলোর কম্পাঙ্ক কম হয় এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়।

এখন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে সর্বোচ্চ কত বেশি এবং কমে সর্বনিম্ন কত হতে পারে? যেহেতু লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি তাই এটাকে একটা সীমারেখা ধরা হয়। আবার নীল আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। তাই এটাকে আরেকটা সীমারেখা ধরা হয়। এখন কথা হচ্ছে, মহাকর্ষ ক্ষেত্র যত শক্তিশালী অর্থাৎ হচ্ছে, অর্থাৎ মহাকর্ষীয় বিভব যেখানে সবচেয়ে বেশি সেখানকার আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে লালের দিকে চলে যাবে। যেমন সবুজ আলোর অবস্থান সাতটি আলোর ঠিক মাঝখানে।

ধরা যাক, একটা সবুজ আলোক রশ্মিকে শক্তিশালী একটা মহাকর্ষ ক্ষেত্রে নেওয়া হলো। এর ফলে ধরা যাক, সবুজ আলোটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে হলুদ আলোর সমান হলো। তবুও কিন্তু একে আমরা লালের দিকে বিচ্যুতি বলব।

এখানে সবুজ আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে হলুদের সমান হয়ে গেছে। কিন্তু লাল আলোকে আমরা গন্তব্য বিন্দু ধরেছি। তাই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হলুদের দিকে যাওয়া মানেই বিচ্যুতি লালের দিকে হলো।

এখন আলোটা শক্তিশালী মহাকর্ষীয় বিভব থেকে সরিয়ে তুলনামূলক কম শক্তিশালী মহাকর্ষীয় বিভবে নেওয়া হলো। ফলে আলোর কম্পাঙ্ক গেল বেড়ে। কমল তরঙ্গ দৈর্ঘ্য। সবুজ আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমে পরিণত হলো আসমানতে।

সবজু আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমে আসমানীতে পরিণত হলো, তারমানে সে বেগুনী আলোর দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল। এজন্য একে বেগুনি বিচ্যুতি বলে। আইনস্টাইন শুধু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। কিন্তু তিনি এ ও বলেছিলেন, মহাকর্ষীয় বিভবের তারতম্যের কারণে আলোর লাল ও বেগুনি বিচ্যুতির এই ভবিষৎদ্বানী যদি প্রমাণিত না হয় তাহলে ‘সাধারণ আপেক্ষিক’ তত্ত্ব ভুল বলে ধরে নিতে হবে। আর যদি প্রমাণিত হয় তবে, এই তথ্য থেকে নক্ষত্র সহ মহাকাশে গ্রহ নক্ষত্রের ভর সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

১৯২৪ জ্যোতিবিজ্ঞানী অ্যাডামসন আইনস্টাইনের এই ভবিষৎদ্বাণী প্রমাণ করেন। মহাকাশে লুব্ধক নামে একটা তারা আছে। এর সাথে আছে আরেকটি জমজ তারা। সেই তারায় আলোক তরঙ্গের লাল বিচ্যুতির বিষয়টির পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন তিনি।

এখন আরেকটা কথা বলা জরুরি। মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যর যে বিচ্যুতি এটাও কিন্তু ট্রেনের মতো। ট্রেনের যাত্রীরা যেমন শব্দের তীক্ষ্মতার পরিবর্তন সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না, তেমনি পৃথিবীতে বসে আমরা পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কারণে আলোক তরঙ্গের যে বিচ্যুতি ঘটে তা বুঝতে পারব না। বুঝতে পারব অন্য কোন মহাকর্ষ ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটলে। আর এই ঘটনার জন্য কিন্তু নিউটনীয় মহাকর্ষ বল দায়ী নয়। বরং স্থান কালের বক্রতার কারণেই এই ব্যাপারটি ঘটছে।