মেইন ম্যেনু

‘ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যায়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রভাষক সামশাদ নওরীণ।অসম্ভব মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন মানুষ তিনি। পড়াশোনা ছাড়া থাকতে ভালো লাগে না তার। কিছু না কিছুর মধ্যে ডুবে থাকতে পছন্দ করেন – কখনো আঁকাআকি, কখনো বই, কখনো নতুন নতুন ভাষা, আবার কখনো বা ফটোগ্রাফির মধ্যে। পড়াশোনা আর মেধার চর্চা আজ তাঁকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। সামশাদ নওরীণ তার স্বপ্ন সত্যি করার গল্প শুনিয়েছেন। এর খানিকটা তুলে ধরা হল পাঠকদের জন্য।

রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় জন্ম সামশাদ নওরীণের। বাবা চাকরি করতেন এজিবিতে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট। বাড্ডা আলাতুন্নেসা হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক করেন বেগম বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ থেকে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশুনা করায় বাবা-মা সবসময় চাইতেন মেয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু বাবা-মায়ের আশায় ছাই দিয়ে মেয়ে তখন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। যে সময় সবাই মেডিকেল বা বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন দেখে সেই সময়ে সামশাদ নওরীণের অজানা কারণে শিক্ষক হওয়ার হিসেব কষতে থাকেন। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ভর্তি পরীক্ষা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ভালো স্কোরও করেন । অন্যান্য বিষয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও নওরীণ নিজের ভাল লাগার জায়গা থেকে জিয়োগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টে ভর্তি হন। অনার্সে প্রথম বিভাগে ৪র্থ হন, মাস্টার্সে ১ম বিভাগে তৃতীয় ।

এর মধ্যে এক ফাঁকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইন্সটিটিউটে এক বছর স্প্যানিশ ভাষা শিখেন। ইংরেজিটাও ঝালাই করে নেন সেখান থেকেই। অন্যদিকে এনআইআইটিতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংটাও শিখে ফেলেন। অনার্স থার্ড ইয়ারে থাকার সময়েই ফ্রেঞ্চ শেখার জন্য আলিয়াসঁ ফ্রঁসেস তিন বছর মেয়াদী কোর্সে ভর্তি হন। মাস্টার্স শেষ করার পর এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকে কিছুদিন ফ্যাসিলেটর হিসেবে কাজ করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরেও জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে ছয় মাস কাজ করেন। এরপর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিন বছর।

মেধার লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের সাথেও লড়াই করেছেন সেই সময়টায়। ঢাকায় বড় হওয়া সামশাদ নওরীণ কখনো বাড়ির বাইরে গিয়ে, সবাইকে ছেড়ে থাকেননি। কিন্তু শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীর সুবাদে নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করেই সিলেটে যান। সিলেটে তার খুব বেগ পেতে হয়। সিলেট একটু রক্ষণশীল অঞ্চল হওয়ায় একা একজন মেয়েকে কেউই বাসা ভাড়া দিতে চায়নি। নওরীণ তখন পড়ে যান ভারী বিপদে। সিলেটের সেই অভিজ্ঞতা সামশাদ নওরীণকে শিখিয়েছে অনেক কিছু, জানার খাতাটাও ভারী করেছে ।

সিলেটে থাকাকালে সামশাদ নওরীণের আর্টিকেল লেখার কাজ চলতে থাকে। এরই মধ্যে আমেরিকা সরকারের ফুলব্রাইট স্কলারশিপ হয়ে যায় তাঁর। সেই সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে তিনি শিক্ষক হিসেবে আবেদন করেন এবং চাকুরীটা হয়েও যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেই স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান আমেরিকায় এমএস করতে।

আমেরিকায় এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের ওপর সিরাকিউসের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক কলেজ অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ফরেস্ট্রি থেকে সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটা জয়েন্ট প্রোগ্রামে মাস্টার্স করেন। পাশাপাশি সিরাকিউস ইউনিভার্সিটির মার্টিন হুইটম্যান স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট থেকে সাসটেইনেবল এন্টারপ্রেনরশিপের ওপর দেড় বছরের একটি অ্যাডভান্সড ডিপ্লোমাও করেন।

কথায় কথায় জানা গেল, অনেকে আগে থেকেই পরিবেশ সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে তার জানার আগ্রহ ছিল। জিওগ্রাফির প্রতি ভালো লাগাটা শুরু হয় কিভাবে? জানতে চাইলে তিনি জানালেন,‘ছোটবেলা থেকেই কালার ভাল্লাগতো। কার্টুন দেখতে এবং আঁকতে পছন্দ করতেম। আমার বড় বোন এনজিওতে চাকরি করায় ও আমার জন্য বাসায় ইউনাইটেড ন্যাশনের অনেক ম্যাগাজিন আনতো। আমি ওইগুলো পড়তাম, দেখতাম। আমার খুব ভাল্লাগতো দেখতে, অনেক রঙের বাচ্চাদের ছবি। একেক দেশের মানুষ একেক রকম, একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একেক রকম। এগুলো খুব এনজয় করতাম। মুলত তখন থেকেই আমার জিওগ্রাফি ভালো লাগতে শুরু করে।’

ভালো লাগার কথায় যখন চলেই এসেছি তখন সামশাদ নওরীণের আরেকটি ভালো লাগার ঘটনা জানানো যাক। তাঁর ভাষায় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা। তিনি জানান,‘আমরা ২০ জনের একটা দল ছিলাম। আমেরিকান কালচার এবং আমেরিকান ফুড হ্যাবিট নিয়ে আমাদের ট্রেনিংটা ছিল। টানা দেড় মাস দেশের খাবার খেতে দেয়নি, আমেরিকান খাবার যেমন ম্যাসড পটেটো, স্টেক, সালাদ, ফলমূল খেয়ে থাকতে হয়েছে। ওটা আসলেই আমার জন্য হার্ড সময় ছিল। ওদের বিভিন্ন যাদুঘর ঘুরে দেখতে হয়েছে, কিভাবে আমেরিকানরা গেস্টদের হোস্টিং করে, ট্রেনের টিকেট কীভাবে বুক করতে হয়, ওখানে কিভাবে সবার সাথে যোগাযোগ করে এগুলো শেখানো হয়েছে। ওই সময়টা একদিক দিয়ে অনেক অ্যাডভেঞ্চারাস ছিল, কঠিন ছিল, অন্যদিক থেকে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি’।

তিনি আরো জানালেন,‘প্রথমে আমি কানসাসে ছিলাম,ওখানকার আবহাওয়া আমাদের আবহাওয়ার প্রায় কাছাকাছি। তাই খুব একটা সমস্যা হয়নি। তবে পরে আমি সিরাকিউসে থাকতে শুরু করি । সিরাকিউস ওয়াজ টু কোল্ড। খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রথম সেমিস্টার একটু খারাপ হয় তবে পরে ঠিক হয়ে যায়। কারণ সিলেটের একটা এক্সপেরিয়েন্স তো ছিলই। আসলেই সিলেটে থাকার অভিজ্ঞতাটা আমাকে অনেকখানি হেল্প করেছে। আমি মনে করি, প্রত্যেকটা মেয়েরই আসলে বাইরে বের হয়ে একা একা কাজ করা উচিত, নিজের সবকিছুই নিজের ফিক্স করা উচিত, তাহলে অনেক কিছুই শেখা যায়।’

সব সাফল্যের গল্পে কিছু উৎসাহ দেয়ার মানুষ থাকে, কিছু তীব্র পরিশ্রমের অধ্যায় থাকে, থাকে ভালো লাগার জায়গা আর কৃতজ্ঞতা ভরা কিছু মানুষের নাম। সামশাদ নওরীণ তাঁর উৎসাহের জায়গা আর কৃতজ্ঞতার কথা জানালেন এভাবেই,‘আমার বড় ভাই আমাকে সব সময় মোটিভেট করে, ইন্সপেয়ার করে। আমার স্কলারশিপ, জিওগ্রাফি নিয়ে পড়া -সব কিছুতেই আমার ভাই আমাকে অসম্ভব হেল্প করেছে। আর এখন আমার হাজবেন্ড আমাকে খুবই ইন্সপেয়ার করে। আর বাবা-মা তো আছেনই ছোট্টবেলা থেকে।’

তিনি বলেন,‘নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা,আর যেকোনো পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার ইচ্ছাই সাফল্যের প্রধান শর্ত। আসলে ইচ্ছাশক্তি মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে।’

সামশাদ নওরীণের এখনও আঁকাআ কি ঘোরাঘুরি ভালো লাগে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে ফটোগ্রাফি করতে। এত কিছুর মাঝেও ছাত্রদের নিয়ে ভাবতে ভোলেন না তিনি। ভবিষ্যতে অনেক কিছু শেখাতে চান ছাত্রদেরকে যাতে তারা দেশ তথা সারা পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু করতে পারে এইরকমই আশা এবং প্রত্যাশা এই তরুণ প্রভাষকের।বিবার্তা