মেইন ম্যেনু

ইটভাটায় অবাধে ব্যবহার হচ্ছে জমির উর্বর মাটি : হুমকির মুখে কৃষি সেক্টর

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর থেকেঃ দিনাজপুরে ৪ ফসলী জমি এবং বনাঞ্চলে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠেছে ইট ভাটা। বনাঞ্চল এবং ফসলি জমি ধ্বংস করে ইটভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর ও সারযুক্ত উপরিভাগের মাটি। এতে করে এ জেলার জমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। জমি হারিয়ে ফেলছে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা। এমনিতেই বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হওয়ায় দিনে দিনে কমে যাচ্ছে আবাদী জমি। অপর দিকে ইট ভাটায় জ্বলছে বনাঞ্চলের কাঠ। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে,তেমনি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কৃষি সেক্টর। আবাদী জমির উর্বর মাটি কেটে নেয়া হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশংকাই করছেন পরিবেশ ও কৃষিবিদরা।

দিনাজপুরে আবাদি জমির মাঝে গড়ে উঠেছে ছোট বড় প্রায় ১৬৩টি ইটভাটা। আর এসব ইটভাটায় ইট তৈরীর জন্য কাটা হচ্ছে জমির উপরিভাগের মাটি। শ্রমিকেরা এসব মাটি কেটে ট্রাক্টরে করে পার্শ্ববর্তী ইট ভাটায় নিয়ে যাচ্ছে। যেগুলো মাটি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরী করা হচেছ ইট। আর জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ফলে জমির উপরিভাগে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চির মধ্যে থাকা জমির খাদ্যকণা ও জৈব উপাদান নষ্ট হচ্ছে। ফলে ওইসব জমিতে যে ফসল আবাদ হয় তার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এছাড়াও জমির উপরিভাগ কাটার ফলে জমি নিচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওইসব জমিতে ধান রোপন করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

জমির মাটি কাটলে আবাদ একটু কমে যাওযার কথা স্বীকার করে জমির মালিকরা জানান, সার দিলে ৪/৪ বছরের মধ্যেই তা বছরের মধ্যেই তা ঠিক হয়ে যায়। ট্রাক্টর মালিকরা জানায়, জমির মালিকরা মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা বিঘা হিসেবে ভাটার নিকট জমির মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। ইট ভাটার সাথে সংশি¬ষ্ঠরা বলছেন, ইটভাটায় ব্যবহৃত মাটিগুলো তারা ট্রাক্টর (ট্রলি)’র মালিকদের নিকটথেকে ৩ থেকে ৪’শ টাকা ট্রলি দরে ক্রয় করেন। তারা জমির মালিকের নিকট থেকে ক্রয় করেন। তারা কিভাবে ও কত মূল্যে তা ক্রয় করেন তা তাদের জানা নেই।

জমির মালিকরা বলছেন, এভাবে জমির উপরিভাগ কাটা হলে কি ক্ষতি হয় তা তারা তেমন জানেন না। তবে কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে-এমন কথা স্বীকার করে তারা বলেন, অনিচ্ছা সত্বেও বাধ্য হয়ে তারা জমির মাটি বিক্রি করছেন। কারন, পাশ্ববর্তী জমি কেটে ফেললে জমিতে পানি ধরের রাখার স্বার্থেই তাদের জমি কেটে সমান করতে হচ্ছে। বেসরকারী এক হিসেব অনুযায়ী গড়ে প্রতিটি ইটভাটা এক মৌসুমে ৩০ লাখ ইট উৎপাদন করে থাকে। গড়ে ১ ফুট গভীরতায় মাটি কাটা হলে একটি ভাটার জন্য বছরে মাটির প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ১২ একর জমির। সেই হিসেবে অনুযায়ী দিনাজপুরে ১৬৩টি ইটভাটার কাজে ব্যবহারের জন্য বছরে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার একর জমির মাটি কাটা হচ্ছে। এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কৃষি সেক্টর। এমনটাই মন্তব্য করেছেন,দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা।

দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃক্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. শাহাদাৎ হোসেন খান বলেছেন, মাটির উপরিভাগে যে গুরুত্বপূর্ণ জৈব পদার্থ থাকে তা নীচের মাটিতে থাকে না। জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ফেলা হলে আগামী ২০ বছরেও সেই জমির প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থের ঘাটতি পুরন হবে না। এ জন্য আবাদী জমির মাটি ব্যবহার না করে ইটভাটায় পতিত জমি কিংবা পুকুর কেটে মাটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এমনিতেই দিনে দিনে আবাদী জমির পরিমান কমে যাচ্ছে। তার উপর এভাবে ফসলি জমির মাটির উপরি অংশ কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জমির ফলন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকাংশে কমে যাবে। এক পর্যায়ে এসব জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। এতে হুমকীর মুখে পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। তাই আবাদী জমি রক্ষা করতে কৃষকদেরকে পরামর্শ দিয়ে সচেতন করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।