মেইন ম্যেনু

ইতিকাফের ফজিলত, উদ্দেশ্য ও উপকারিতা

বিশেষ নিয়তে, বিশেষ অবস্থায় আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ একটি মহান ইবাদত, মদিনায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছরই ইতিকাফ পালন করেছেন। দাওয়াত, তরবিয়ত, শিক্ষা ও জিহাদে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও রমজানে তিনি ইতিকাফ ছাড়েননি। ইতিকাফ ইমানি তরবিয়তের একটি পাঠশালা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিদায়াতি আলোর একটি প্রতীক। ইতিকাফরত অবস্থায় বান্দা নিজেকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য দুনিয়ার অন্য সব বিষয় থেকে আলাদা করে নেয়। ঐকান্তিকভাবে মশগুল হয়ে পড়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিরন্তর সাধনায়। ইতিকাফ ইমান বৃদ্ধির একটি মুখ্য সুযোগ। সবার উচিত এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ইমানি চেতনাকে প্রাণিত করে তোলা এবং উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা।

আল কোরআনুল কারিমে বিভিন্নভাবে ইতিকাফ সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর কথা উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে : ‘এবং আমি ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)

অসংখ্য হাদিসে ইতিকাফ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তার মধ্য থেকে ফজিলত সম্পর্কিত কিছু হাদিস এখানে উল্লেখ করা হলো : হজরত আয়েশা (রা.) বলেন : ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এরপর তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি : ১৮৬৮; মুসলিম : ২০০৬)

আবু হুরাইরা (রা) বলেন : ‘রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি পরলোকগত হন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান।’ (বুখারি : ১৯০৩)

রাসুল (সা.) বলেন : ‘আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম। এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে, সে যেন ইতিকাফে বসে।’ (মুসলিম : ১৯৯৪)

ইতিকাফের উপকারিতা : ইতিকাফকারী এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষায় থাকে, আর এ অপেক্ষার অনেক ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় ফেরেশতারা তোমাদের একজনের জন্য দোয়া করতে থাকেন যতক্ষণ সে কথা না বলে, নামাজের স্থানে অবস্থান করে। তারা বলতে থাকে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন, যতক্ষণ তোমাদের কেউ নামাজের স্থানে থাকবে এবং নামাজ তাকে আটকে রাখবে, তার পরিবারের কাছে যেতে নামাজ ছাড়া আর কিছু বিরত রাখবে না, ফেরেশতারা তার জন্য এভাবে দোয়া করতে থাকবে।’ (মুসলিম : ৬০১১)

ইতিকাফকারী কদরের রাতের তালাশে থাকে যে এ রাতটি অনির্দিষ্টভাবে রমজানের যেকোনো রাত হতে পারে। এই রহস্যের কারণে আল্লাহ তাআলা সেটিকে বান্দাদের থেকে গোপন রেখেছেন, যেন তারা মাসজুড়ে তাকে তালাশ করতে থাকে। তা ছাড়া ইতিকাফের ফলে আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং আল্লাহর জন্য মস্তক অবনত করার প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে। কেননা ইবাদতের বিবিধ প্রতিফলন ঘটে ইতিকাফ অবস্থায়। ইতিকাফ অবস্থায় একজন মানুষ নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর ইবাদতের সীমানায় বেঁধে নেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে।

মসজিদে ইতিকাফের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে নিজেকে আবদ্ধ করে নেওয়ার কারণে মুসলমানের অন্তরের কঠোরতা দূরীভূত হয়, কেননা কঠোরতা সৃষ্টি হয় দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও পার্থিবতায় নিজেকে আরোপিত করে রাখার কারণে। মসজিদে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখার কারণে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় ছেদ পড়ে এবং আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়।

মসজিদে ইতিকাফ করার কারণে ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকে, ফলে ইতিকাফকারী ব্যক্তির আত্মা নিম্নাবস্থার নাগপাশ কাটিয়ে ফেরেশতাদের স্তরের দিকে ধাবিত হয়। ফেরেশতাদের পর্যায় থেকেও বরং ঊর্ধ্বে ওঠার প্রয়াস পায়। কেননা ফেরেশতাদের প্রবৃত্তি নেই বিধায় প্রবৃত্তির ফাঁদে তারা পড়ে না। আর মানুষের প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও সব কিছু থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর জন্য একাগ্রচিত্ত হয়ে যায়। এ ছাড়া ইতিকাফের মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি আসে। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঐকান্তিকভাবে তাওবা করার সুযোগ লাভ হয়। তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়া যায়। সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়। এ জন্য যারা ইতিকাফে বসবেন, তাদের করণীয় হলো :

আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা : আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হওয়া এবং আল্লাহকেন্দ্রিক ব্যতিব্যস্ততা যখন অন্তর সংশোধিত ও ইমানি দৃঢ়তা অর্জনের পথ, কেয়ামতের দিন তার মুক্তিও বরং এ পথেই। তাহলে ইতিকাফ হলো এমন একটি ইবাদত, যার মাধ্যমে বান্দা সমস্ত সৃষ্টি জীব থেকে আলাদা হয়ে যথাসম্ভব প্রভুর সান্নিধ্যে চলে আসে।

পাশবিক প্রবণতা ও অহেতুক কাজ থেকে দূরে থাকা : রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের বাঁচিয়ে রাখেন অতিরিক্ত পানাহার ও যৌনাচারসহ পশু প্রবৃত্তির বিবিধ প্রয়োগ থেকে, অনুরূপভাবে তিনি ইতিকাফের বিধানের মাধ্যমে তাদের বাঁচিয়ে রাখেন অহেতুক কথাবার্তা, মন্দ সংস্পর্শ ও অধিক ঘুম থেকে।

ইতিকাফের মাধ্যমে এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ অর্থে আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে যায়। নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়া ইত্যাদির চর্চার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের অফুরান সুযোগের আবহে সে নিজেকে পেয়ে যায়।

শবেকদর তালাশ করা : ইতিকাফের মাধ্যমে শবেকদর খোঁজ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আবু সায়ীদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস সে কথারই প্রমাণ বহন করে, তিনি বলেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘আমি প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছি এই (কদর) রজনী খোঁজ করার উদ্দেশ্যে। অতঃপর ইতিকাফ করেছি মাঝের দশকে। অতঃপর মাঝ দশক পেরিয়ে এলাম। তারপর আমাকে বলা হলো, (কদর) তো শেষ দশকে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ তাকওয়া অর্জন করতে চায় সে যেন ইতিকাফ করে।’ (মুসলিম : ১১৬৭)

মসজিদে অবস্থানের অভ্যাস গড়ে তোলা : ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দার অন্তর মসজিদের সঙ্গে জুড়ে যায়, মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। হাদিস অনুযায়ী যে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর নিজের ছায়ার নিচে স্থান দান করবেন তাদের মধ্যে একজন হলেন ওই ব্যক্তি মসজিদের সঙ্গে যার হৃদয় ছিল বাঁধা : ‘এবং ওই ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে বাঁধা।’ (বুখারি : ৬২০)

দুনিয়া ত্যাগ ও বিলাসিতা থেকে দূরে থাকা : ইতিকাফকারী যেসব বিষয়ের সঙ্গে জীবনযাপন করত, সেসব থেকে সরে এসে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ করে ফেলে। ইতিকাফ অবস্থায় দুনিয়া ও দুনিয়ার স্বাদ থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ঠিক ওই আরোহীর মতো যে কোনো গাছের ছায়ার নিচে বসল, অতঃপর সেখান থেকে উঠে চলে গেল।

ইচ্ছাশক্তি প্রবল করা এবং প্রবৃত্তিকে খারাপ অভ্যাস ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা : কেননা ইতিকাফ দ্বারা খারাপ অভ্যাস থেকে বিরত থাকার প্রবণতা গড়ে ওঠে। ইতিকাফ তার জন্য সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় নিজেকে ধৈর্যের গুণে গুণান্বিত করতে ও নিজের ইচ্ছাশক্তিকে শাণিত করতে। ইতিকাফ থেকে একজন মানুষ সম্পূর্ণ নতুন মানুষ হয়ে বের হয়ে আসার সুযোগ পায়। যা পরকালে উপকারে আসবে না তা থেকে বিরত থাকার ফুরসত মেলে।

ইতিকাফের শর্তাবলি

ইতিকাফের অনেক শর্ত রয়েছে । শর্তগুলো নিম্নরূপ :

ইতিকাফের রুকন হলো অবস্থান করা। হানাফি মাজহাব মতে ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত। মুসলমান হওয়া শর্ত। কেননা কাফেরের ইবাদত গ্রহণযোগ্য হয় না। ইতিকাফকারীকে বোধশক্তিসম্পন্ন হতে হবে, কেননা নির্বোধ ব্যক্তির কাজের কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, আর উদ্দেশ্য ছাড়া কাজ শুদ্ধ হতে পারে না। ভালোমন্দ পার্থক্য করার জ্ঞান থাকতে হবে, কেননা কম বয়সী, যে ভালোমন্দের পার্থক্য করতে পারে না, তার নিয়তও শুদ্ধ হয় না। ইতিকাফের নিয়ত করতে হবে, কেননা মসজিদে অবস্থান হয়তো ইতিকাফের নিয়তে হবে অথবা অন্য কোনো নিয়তে। আর এ দুটির মধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়তের প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘প্রত্যেক কাজের নির্ভরতা নিয়তের ওপর, যে যা নিয়ত করবে সে কেবল তাই পাবে।’ (বুখারি : ১)

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ঢাকা