মেইন ম্যেনু

ইনিই এক হাতে ধরেন লাঙল, চালান চার চাকাও!

কুস্তি লড়তে গিয়ে শেষে কিনা ডান হাতটাই হারাতে হয়! তবুও অদম্য, থেমে থাকেননি তিনি। মায়ের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে বাঁ-হাতেই লাঙল তুলে নেন। আজ সেই মধুকর অন্না চিদরে ১৫০ একর জমির মালিক। এক হাতেই খেতে ট্রাক্টর চালান। বাইকও তাই। বাদ যায় না চার চাকাও।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মধুকরের অজানা জীবন কাহিনী।

মহারাষ্ট্রে অতিসম্প্রতি কত চাষি আত্মহত্যা করেছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান হাতের কাছে না থাকলেও, সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। চাষিদের এই মৃত্যুমিছিল ব্যথিত করে তাকেও। কারণ তিনি নিজেও তো মহারাষ্ট্রেরই একজন চাষি। লাতুরের অখ্যাত দাভানহিপারগা গ্রামে তার বাড়ি। সেখানেই চাষবাস তার।

অন্নার আর্জি, মহারাষ্ট্রের কোনো চাষি আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে যেন অন্তত একটিবার তার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সবরকমভাবে সহযোগিতা করতে চান। খুলে দিতে চান সমস্যার জট।

তার কথায়, জীবনের সত্যিকারের আনন্দ লড়াইয়ে, কান্নাকাটিতে নয়। কেঁদে কিছু হয় না- এটাই তার চলার পথের মন্ত্র। এর জোরেই এগিয়েছেন এতখানি পথে।

চাষবাস তার রক্তে। আক্ষরিক অর্থেই চাষার ব্যাটা। মধুকর অন্নার বাবা চন্দ্রকান্তের ছিল ৪০ একর চাষযোগ্য জমি। সাত সদস্যের সংসার হেসেখেলে চলে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু এক এক বছর অনাবৃষ্টি কেড়ে নিত মুখের হাসি। ভাঁজ পড়ত চন্দ্রকান্তের রোদেপোড়া কপালে।

মধুকরকে সঙ্গে নিয়েই খেতে চাষ করতে যেতেন চন্দ্রকান্ত। কখনো তিনি না নিয়ে গেলে, দিদিদের সঙ্গে রাস্তায় বেরোত ভাই। সাধারণত মধুকরকে ঘরে একা রেখে কেউ যেতেন না। বা, একা মধুকরকেও কখনো রাস্তায় বেরোনোর অনুমতি

দেয়া হত না। দুটো কারণ ছিল। কোনো এক জ্যোতিষী জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনায় জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে মধুকরের। দ্বিতীয় কারণটি, মধুকর যে হেতু একটাই ছেলে, বাবা চাইতেন নিজে হাতে ধরে চাষবাস শেখাবেন।

মধুকর যখন ক্লাস সেভেনে, এক শিক্ষক কোনো কারণে খুব মারধর করেন। বাড়ি ফিরে ছেলে কান্নাকিটা করায়, মা আর স্কুলে পাঠাননি। তারপর থেকে খেলাধুলো আর চাষবাস, এটাই ছিল রোজের রুটিন। কুস্তির নেশা তখন থেকেই।

অচিরেই গ্রামের সেরা কুস্তিগীর হয়ে ওঠেন। এই কুস্তি লড়তে গিয়েই আকস্মিক দুর্ঘটনা। ডান হাতে চোট লাগে। গ্রামের ডাক্তার হাতটি কষে বেঁধে দেন। তাতেই বিপত্তি। রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে হাত পচতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচার করে ডান হাতটি বাদ দিতে হয় তার।

অন্নার কথায়, আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ডাক্তারকে কিছুতেই মা অস্ত্রোপচার করতে দেবেন না। আমার ডান হাত শরীর থেকে বাদ দিতে হবে, এটা মা বিশ্বাসই করে উঠতে পারছিলেন না। মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই তার অপারেশন হয়। ১৫ দিন কিচ্ছুটি খাননি মা।

বাবাও ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সাহস করে মায়ের মুখোমুখি হতে পারছিলেন না। আবার মায়ের যন্ত্রণা, তাকে আরো বেশি ব্যথিত করছিলেন। ঠিক করলেন যেভাবেই হোক মায়ের সামনে দাঁড়াবেন। দাঁড়ালেনও তিনি। ছেলেকে দেখে চোখের জল বাঁধ মানছে না মায়ের। ছেলেকে বললেন, তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন ছেলে নিজের চার চাকার গাড়ি চালাবে। অনেক বড় হবে। তা তো আর সম্ভব নয়।

মাকে সেদিনই কথা দিয়েছিলেন মধুকর। একদিন নিজের রোজগারে গাড়ি কিনবেন। সেই গাড়ি নিজেই চালাবেন। তারপরই তিনি মায়ের ছেলে বলে পরিচয় দেবেন। তার আগে নয়। তা যে নেহাত কথার কথা যে ছিল না, আজকের সম্পন্ন মধুকরকে দেখলেই বোঝা যায়।

ঘাম ঝরানো পরিশ্রম শুরু হলো। খেতে যেতেন ভোর ৫টায়। ফিরতেন রাত ৮টায়। মধুকরকে দেখে সেসময় অন্যরা হাসিঠাট্টা করত। সেটা ১৯৭২ সাল। শুরুতে বাবার ৪ একর জমিতে চাষ করেছিলেন। ধীরে ধীরে চাষের ক্ষেত্র বাড়িয়েছেন। জমিতে হাল দিতে কিনে ফেলেন ছটা বলদও। তারপর ক্রমে ট্রাক্টর। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। লাভের অঙ্কে ধীরে ধীরে চাষের জমিও বাড়াতে থাকেন। আজ তার ১৫০ একর জমি।

এর মধ্যেই ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন মধুকর। স্ত্রীও স্বামীকে সাথ দিতে থাকেন। যারা মধুকরকে একহাতে চাষ করতে দেখে একদিন হাসামশকরা করতেন, একটা সময় তারাও তারিফ না করে পারেননি।

মধুকর জানালেন, তার জমিতে ১৫জন মহিলা কাজ করেন। তারা কখনোই অন্যের জমিতে কাজ করেন না। তাই সারা বছরই, হাতে কাজ না থাকলেও বেতন দেন। কএনা মাস বাদ যায় না। এর মধ্যেই তার এক শ্রমিককে ৪ একর, অন্যজনকে ৬ একর জমি দান করেছেন।

মায়ের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা কক্ষনোই ভুলে যাননি। মাকে খুশি করতে ১৯৯০ সালে নিজের চার চাকার একটি গাড়ি কিনে ফেলেন। সেই গাড়ি নিজেই আজ এক হাতে চালাতে পেরে গর্বিত মহারাষ্ট্রের এই সম্পন্ন চাষি। তার কথায়, মাকে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছি, এটাই বড় কথা।

কিনেছেন একটি বুলেটও। এই ছিয়াত্তর বছর বয়সেও সেটি চালান নিজেই। অন্না বলেন, আসলে কী জানেন, আমি বুলেট চালাতে ভীষণ ভালোবাসি। নিজেকে ইয়াং লাগে।

তার তিন ছেলেও আজ বাবার মতোই চাষবাস করছেন। এক নাতি ডাক্তার। একজন শিক্ষক। আর এক নাতি পুনায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। আজ পেছনে ফিরে খুশিই হন তিনি। কোনো খেদ নেই। নেই কোনো আফসোস।