মেইন ম্যেনু

মন্তব্য প্রতিবেদন......

ইসি গঠনে সার্চ কমিটি : পক্ষ-নিরপেক্ষ নিয়ে ফের তর্কাতর্কি, কে নিরপেক্ষ?

আরিফ মাহমুদ : প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব-নিকেষ একেক জনের কাছে একেক রকম। প্রত্যাশাকে প্রাপ্তিতে রূপ দিতে আর প্রাপ্তিকে প্রত্যাশার বাস্তবায়নে পরিণত করতে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির জন্য সকলের নৈতিক মানসিকতা অপরিহার্য্য।

কে কে নিরপেক্ষ? আমরা কতজন নিরপেক্ষ? প্রশ্নটা সহজ হলেও হয়তো উত্তরটা বেশ কঠিন। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে হয়তো বললে ভুল হবে না যে, কাউকে ভোট দিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে আমরা তো একটি পক্ষকে সমর্থন করলাম। ফলে নিরপেক্ষ থাকলাম কোথায়? অর্থাৎ কোন না কোন ভাবেই আমরা দৃশ্যত-অদৃশ্যত নিরপেক্ষতা হারাচ্ছি।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ পরিপূর্ণভাবে শেষ হচ্ছে আগামি ১৪ ফেব্রুয়ারী। নতুন ইসি গঠনের লক্ষ্যে ৬সদস্যের নয়া সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে ২৫জানুয়ারী। এ কমিটি গঠন হতে না হতেই ‘যথারীতি’ আলোচনা-সমালোচনা-তর্কাতর্কি শুরু হয়েছে প্রধান দলগুলোর মধ্যে। অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলছে ‘ওই কমিটি আ.লীগের পছন্দের কমিটি। কারণ সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, চবি’র সহ-উপাচার্য এগুলো সরকারের নিয়োগ।’ তাদের ভাষায়- ‘এখনই বোঝা যাচ্ছে, বাছাঁই কমিটি কী ধরনের ইসি গঠন করবে।’ আর সরকারদলীয় আ.লীগ নেতৃবৃন্দ বলছে, ‘এ সার্চ কমিটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন প্রশ্ন নেই।’ তারা আরো বলেছেন, ‘সার্চ কমিটি কিংবা ইসি গঠন রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার, তার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন তারা।’

এ তো সার্চ কমিটি নিয়ে তর্কাতর্কি। এখনো বাকি ইসি গঠন। স্পষ্টই বলা যেতে পারে সেখানেও তর্কাতর্কি হবে সেটা নিশ্চিত। কেননা সরকারে ক্ষমতাসীন আ.লীগ। আর সরকারি প্রক্রিয়ায় যাদেরকেই কমিশনে নিয়োগ দেয়া হবে সেটাই সরকারের বাইরে থাকা বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর পছন্দের হবে না সেটা যে কেউ বোঝে। ফলে এ তর্কাতর্কির শেষ নেই। দলগুলোর নেতৃত্বের তর্কাতর্কির যেখানে শেষ নেই সেখানে আপত:দৃষ্টিতে এর স্থায়ী সমাধানও যেন অনেকটা অলীক।

তাহলে এর সমাধান কীভাবে? প্রথমেই বলেছি হয়তো কেউ-ই আমরা নিরপেক্ষ নয়। তবে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। এখানে এককথায় শক্তিশালী বলতে আসলে কী বোঝাচ্ছে? প্রধান নির্বাচন কমিশনসহ অন্য কমিশনাররা ব্যক্তিগত ভাবে নিরপেক্ষ কিংবা শক্তিশালী হলেই চলবে না, সারা দেশের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ ও ব্যক্তি মানসিকতায় শক্তিশালী হতে হবে। পাশাপাশি যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হলো- নির্বাচনকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট অন্য প্রশাসন-দপ্তর গুলোর স্বকীয়তা বজায় রাখা। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হবে তখনই ‘যখন আইন-শৃংখলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইসির অধীনে থেকে তাৎক্ষনিক নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে।’ শুধু কাগজে কলমে দায়সারাভাবে ইসির অধীনে থাকলো, কিন্তু যা তাই- এমন হলে কখনই ইসি শক্তিশালী হবে না। সাধারণ দৃষ্টিতে অনেকের অভিমত- আইন-শৃংখলা বাহিনী পরিপূর্ণরূপে ইসির অধিনে থেকে নির্দেশ পালনে তাৎক্ষনিক ‘অবশ্যই বাধ্য’ এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও ‘ম্যাজিস্ট্রিসি ক্ষমতা’ প্রদান হয়তো ইসিকে শক্তিশালী করতে পারে। তা না হলে যখন যে দল ক্ষমতায় থাকবে আর যারা ক্ষমতার বাইরে থাকবে তাদের মধ্যে ‘ইসি ও নির্বাচন’ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়তো শেষ-ই হবে না।

এখানে ‘নির্বাচনকালীন’, ‘সহায়ক’, ‘তত্বাবধায়ক’ কিংবা অন্য যেকোন নামের ‘সরকার’ এর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটাকে মূখ্য হিসেবে না দেখ গৌণে পরিণত করতে হবে। কারণ শুধু জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির কর্মকান্ড শেষ নয়। ইসিকে বাস্তবিক অর্থে পরিপূর্ণরূপে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনসহ সকল নির্বাচনেই নিরপেক্ষতা ও শক্তিশালীতা প্রদর্শন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সকল নির্বাচনের সময় ‘নির্বাচনকালীন’, ‘সহায়ক’, ‘তত্বাবধায়ক’ কিংবা অন্য যেকোন নামের ‘সরকার’ থাকা কতটুকু বাঞ্চনীয়? প্রায় প্রতি বছরে কোন না কোন সময়ে সাধারণত কোন না কোন নির্বাচন করতে হয় ইসিকে। তাহলে কী প্রতিটি নির্বাচনের সময়ে এ জাতীয় সরকার পরিবর্তন হবে?

ধরা যাক, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলো কিন্তু একই ইসির অধীনে স্থানীয় নির্বাচনে কারচুপি হলো কিংবা বিপরীত ভাবে স্থানীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলো কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি হলো সেক্ষেত্রে দায় ইসির না তৎকালীন সরকারের? সুতরাং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে শুধুমাত্র ইসিকে যেকোন ভাবে শক্তিশালী করাই মূখ্য।

জনগণের জন্য রাজনীতি। জনগণকে নিয়ে দেশের জন্য রাজনীতি। আর এখন ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি অনেকটা লক্ষণীয়। যেটা সাধারণ মানুষের কাম্য নয়। আগে নিজেদের মানসিকতা সত্য, সঠিক ও ন্যায়ের পক্ষে নিয়ে নিজেদের নৈতিকতাকে শক্তিশালী করতে হবে। সাধারণ মানুষের মনের ভাষা বুঝে রাজনীতি করলে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিংবা ক্ষমতায় থাকার জন্য তর্কাতর্কি করতে হবে না। স্থায়ী সমাধানও হয়তো স্থায়ী হবে।

লেখক : আরিফ মাহমুদ
সম্পাদক, আওয়ার নিউজ বিডি ডটকম