মেইন ম্যেনু

ঈদের পরই চার্জশিট, সাংসদপুত্র রনিই খুনি

রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডে মদ্যপ অবস্থায় গুলি করে দুই শ্রমজীবীর হত্যাকারী হিসেবে মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনিকে চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেভাবে চার্জশিটও (অভিযোগপত্র) তৈরি করা হয়েছে। ঈদের পরে যেকোন দিন আদালতে জমা দেয়া হবে অভিযোগপত্র।

গুলি চালানোর সময় বখতিয়ারের যে প্রাডো গাড়িতে ছিলেন সেই গাড়ির চালক ইমরান ফকিরসহ তিনজনকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয়েছে। ইমরান ফকির ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হওয়ায় তাকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে।

ঢাকার সিএমএম আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া ইমরানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে সাক্ষীর জবানবন্দি হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) দীপক কুমার দাস আদালতে আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।

আপাত সূত্রবিহীন এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া রনিকে (৪২) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দফায় মোট ১১ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। প্রতিবার রিমান্ড আবেদন ও মঞ্জুরের পরই জিজ্ঞাসাবাদ এড়ানোর কৌশল হিসেবে অসুস্থতার ভান করেছিলেন রনি। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গুলি করার কথা জানালেও আদালতে স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি তিনি।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, মাত্র তিনমাসেই আলোচিত এই মামলার তদন্ত কাজ শেষ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে গত ১ মে আদালতে দেয়া গাড়িচালক ইমরান ফকিরের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে ২টার দিকে রনিকে নিয়ে চলা প্রাডো গাড়িটি নিউ ইস্কাটন রোডে যানজটে আটকা পড়ে। এসময় চালকের পাশে থাকা নেশাগ্রস্ত বখতিয়ার বিরক্ত হয়ে হঠাৎ করে তার লাইসেন্স করা পিস্তল থেকে চার/পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।

ওইসময় রনির বন্ধু মো. কামাল ওরফে টাইগার কামাল ও আবাসন ব্যবসায়ী কামাল মাহমুদ গাড়ির পেছনের আসনে বসা ছিলেন। তারাও ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে নিজস্ব পিস্তল দিয়ে রনির এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এছাড়া রনির আরেক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলমও রনির গুলি করার বিষয়টি আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন, রনির গাড়ি চালক ও তিন বন্ধুর আদালতে দেয়া জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হয়েছেন যে, বখতিয়ার আলম রনির এলোপাতাড়ি গুলিতেই দৈনিক জনকন্ঠের সিএনজিচালক ইয়াকুব আলী (৪০) ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম (২৫) গুরুতর আহত হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

১৫ এপ্রিল বিকেলে রিকশাচালক হাকিম মারা যান। এরপর ওই দিনই রাতে রিকশাচালক হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম রমনা থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেন, গাড়ির জানালা দিয়ে একজন লোক এলোপাতাড়ি চার-পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুড়েছেন।

এরপর গত ২৩ এপ্রিল রাতে মারা যান সিএনজিচালক ইয়াকুব। রনির ছোড়া গুলি ইয়াকুবের বুকে বিদ্ধ হয় এবং হাকিমের শরীরের পেছনের অংশে ঢুকে নাভির নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

গত ২৪ মে রমনা থানা পুলিশের কাছ থেকে জোড়া খুনের এই মামলার তদন্তভার মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা হয়। আপাত সূত্রবিহীন এ মামলাটির তদন্তে নেমে একপর্যায়ে ডিবি জনকণ্ঠ ভবনে স্থাপিত ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ হওয়া ফুটেজ হাতে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। ওইখানে মিলে যায় ওই জোড়া খুনের সূত্র। ডিবি দেখতে পায় ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে ওই সড়কে দুবার কালো রঙের একটি প্রাডো গাড়ির (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৬২৩৯) বেপরোয়া চলাচল।

এরপর ডিবি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নথিপত্র ঘেটে নিশ্চিত হয় যে, কালো রঙের ওই গাড়িটি সাংসদ পিনু খানের। এরপর আধুনিক তদন্ত কৌশল, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি নিশ্চিত হয় যে নিউ ইস্কাটনে ঘটনার আগে ও পরে বখতিয়ার এবং ইমরান অবস্থান করছিলেন। রনি ওই সময়ে তার মায়ের ওই গাড়িটি ব্যবহার করছিলেন।

এরপর প্রথমে তদন্তকারী কর্মকর্তা রনির গাড়িচালক ইমরানকে সনাক্ত করেন এবং ৩১ মে ইমরানকে আটক করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে ধানমন্ডির বাসা থেকে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই দিনই রনির লাইসেন্স করা পিস্তলটি জব্দ করা হয়। ৪ জুন ডিবি ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পিস্তলটি সিআইডির আগ্নেয়াস্ত্র পরীক্ষা শাখায় পাঠায়। এই পরীক্ষার প্রতিবেদনে ডিবি নিশ্চিত হয়, ওই পিস্তল থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে এবং নিহত ইয়াকুবের শরীরে পাওয়া গুলি ও ওই পিস্তলের গুলির ধরন একই।

১৪ জুন রনির ওইদিনে ব্যবহৃত প্রাডো গাড়িটি জব্দ করা হয়। ৫ জুলাই তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে রনির পিস্তলের লাইসেন্স বাতিলের আবেদন করেন।