মেইন ম্যেনু

আইন ও আচরণবিধির অভাব

উচ্চ আদালত ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি

বিচারপতি নিয়োগে আইন ও আচরণবিধির অভাবে উচ্চ আদালত ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হচ্ছে। আইন না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ নিয়োগ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আচরণবিধির অভাবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করাবস্থায় আইনজীবী হিসেবে আদালতে দাঁড়াচ্ছেন। অবসরের পর রায় লেখার সুযোগ পাচ্ছেন। নিয়োগ পাচ্ছেন সরকারি বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বিচারালয়ের ভাবমূর্তি।

এ পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে বিচারপতি নিয়োগে নীতিমালা এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিচার বিভাগ একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এই অঙ্গন ঘিরে কোনো ধরনের বিতর্ক কাম্য নয়। সম্প্রতি অবসরের পর রায় লেখা, আদালত চত্বরে একজন সাবেক বিচারপতির প্রেস কনফারেন্স ও একজন সাবেক বিচারপতির সরকারি সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকাবস্থায় যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দাঁড়ানোর ঘটনায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এজন্য উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াকেও দায়ী করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, সংবিধানেও বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে একটি আইন তৈরির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তা উপেক্ষিত। সংবিধানের নির্দেশিত পথ অনুসরণ না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, প্রধান বিচারপতি সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমার মনে হয় বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি প্রাকটিস ডাইরেকশন দিতে পারেন, রুলস ফ্রেম করতে পারেন অথবা কোড অব কনডাক্ট তৈরি করতে পারেন। এই উদ্যোগ প্রধান বিচারপতিকেই নিতে হবে। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার জন্য তিনি প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধও জানান। শিগগিরই তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলাপ করবেন বলেও উল্লেখ করেন।

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের আচরণ কী হবে, তারা কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না সে ব্যাপারে একটি আচরণবিধি জরুরি বলে মনে করেন খোদ আইনমন্ত্রীও। তিনি বলেন, ‘অতীতে এমন সমস্যা ছিল না। কারণ সে সময় মামলার চাপ ছিল না। ফলে অবসরের পরে হয়তো রায় দিতে হতো না। দ্বিতীয়ত, অবসরের পরই হাইকোর্টের বিচারপতিরা প্রাকটিসে আসতেন না। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, বিচারপতিদের কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। তারা নিজেদের বিবেক দ্বারা চালিত। যেহেতু তারা বিচার করেন, রায়টাও তারা সময়মতো দেবেন এবং অবসরের পরের দিনেই কোর্টে চলে আসেন না। সে কারণে এতদিন এগুলোর (কোড অব কনডাক্ট) দরকার ছিল না।’

আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এখন যেটা দেখা যায়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবসর নেয়ার পরদিন উনি (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল) আইনজীবী হিসেবে আদালতে চলে আসলেন। এটা অনৈতিক। সরকারের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি একজন সাধারণ আসামির পক্ষে নয়, একজন যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গেলেন। এটা দায়িত্বজ্ঞানহীন। আরেকজন বিচারক অবসরের পর ৭০-৮০টি রায় লেখেননি। এগুলো জনগণকে বিচলিত করে এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমাকেও বিচলিত করে। আইনজীবী হিসেবেও আমাকে দুশ্চিন্তিত করে।

এই কোড অব কনডাক্ট কি শুধু অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের ক্ষেত্রে হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের জন্য আলাদা আইন করা যায় না। বিচারপতিদের জন্য আচরণবিধি করতে হবে। সেখানেই উল্লেখ থাকবে, অবসর নেয়ার কতদিন পর প্রাকটিস করতে পারবেন বা তার কী করা উচিত, কী করা উচিত হবে না এগুলো আচরণবিধিতে স্পষ্ট করতে হবে। ২০০২ সালের একটি আচরণবিধি আছে উল্লেখ করা হলে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কেউ মানেও না, এটা কেউ ধরেও না। আমি এই কোড অব কনডাক্টটা পড়েছি। আমাদেরকে সামনের দিকে এগোতে হবে। এখন নতুন করে কোড অব কনডাক্ট করতে হবে, আর সেই উদ্যোগ নিতে হবে প্রধান বিচারপতিকে।

এদিকে শুধু আচরণবিধি দিয়ে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, এতদিন তো নীতিমালা বা আচরণবিধি ছিল না। কিন্তু তারপরও এমন ঘটনা ঘটেনি। এখন আচরণবিধি করলেও ফাঁকফোকর খোঁজা হবে। এ জন্য নিয়োগের আগেই দেখতে হবে, যে বিচারপতি হবেন, তার ব্যাকগ্রাউন্ড কী, আচার-আচরণ, মেধা, সততা, দক্ষতা-যোগ্যতা কী। শুধু আচরণবিধি করা হলেই এগুলোর সমাধান হবে না।

তিনি আরও বলেন, বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতি যদি শক্ত থাকেন, তাহলে কোয়ালিটির কম্প্রোমাইজ হবে না। আর ওদিক থেকে পাঁচজনের নাম এলো, আমার দু’জন থাকল- প্রধান বিচারপতি যদি এটা করেন তাহলে তো কম্প্রোমাইজ হয়ে গেল। প্রধান বিচারপতির ভূমিকা শক্ত থাকতে হবে। প্রধান বিচারপতির পরামর্শটা যদি কার্যকর হয় তাহলে সাংবিধানের মধ্যে থেকেই বিচারপতি নিয়োগের বিতর্ক এড়ানো সম্ভব বলে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, অবসরের পরে বিচারপতিরা আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করছেন, বড় বড় পদে চাকরিতে বসছেন এগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে আইনজীবী সমিতির ভাবনাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গত ১৭ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা একটি বাণী দেন। সেখানে অবসরের পর রায় লেখাকে তিনি অসাংবিধানিক হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনার ঝড় ওঠে। অবসরে যাওয়ার পর ১৬১টি রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের কাছে। এ বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে একাধিক চিঠি চালাচালি করেছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মানিক। আদালত চত্বরে বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির বিপক্ষে প্রেস কনফারেন্সও করেন। এ ধরনের প্রেস কনফারেন্সের ঘটনা উপমহাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে দাবি করেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা।

এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী এক আলোচনা সভায় বলেন, যেহেতু অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, সেহেতু এ ব্যাপারে এখন একটি রুল তৈরি করা উচিত। এ বক্তব্যের পরের দিনই হাইকোর্ট বিভাগের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর পক্ষে আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনার জন্য দাঁড়ান। বাড়ি, গাড়ি, গানম্যানসহ সরকারি সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকাবস্থায় এই বিচারপতির ভূমিকা নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তাই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের জন্য একটি আচরণবিধি তৈরির পক্ষে মত দেন আইনজ্ঞরা।

জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘হাইকোর্ট থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিসে কোনো বাধা নেই। তবে আমি মনে করি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা বহাল রয়েছে আবার কোর্টে মামলা পরিচালনা করছেন, এটা সঠিক নয়। এ ছাড়া অবসরের পর বিচারপতিরা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন। এটাও খারাপ নজির। কারণ, ভবিষ্যতে যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন, সেজন্য বিচারপতির দায়িত্ব পালনকালে সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখান। এগুলোও এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। এ জন্য একটি আচরণবিধি দরকার। অবসরের পর কতদিন পর্যন্ত তারা প্র্যাকটিস করতে পারবেন না, কী কী করতে পারবেন- সেসব বিষয় ওই আচরণবিধিতে উল্লেখ থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, সংবিধানের আলোকে নীতিমালা করা হলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে না। উচ্চ আদালতকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে অবিলম্বে বিচারপতি নিয়োগে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, এর আগে এরকম একটি নীতিমালা হয়েছিল, সেটা খারিজ করে দেয়া হয়েছে। এখন নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আইন করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতে কীভাবে বিচারক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তা জনগণের জানার অধিকার আছে। সংবিধান জনগণকে সে অধিকার দিয়েছে। সেজন্য একটি নীতিমালা করা উচিত। এটা সবার দীর্ঘদিনের দাবি। কিন্তু সরকার কথা শুনছে না।

সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে বিচার বিভাগের (অধস্তন আদালতের) স্বাধীনতা নিয়েও। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে পৃথক ঘোষণা করা হলেও পুরোপুরি স্বাধীন হয়নি। এ জন্য বাহাত্তরের সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের হুবহু প্রতিস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। পাশাপাশি একটি পৃথক সচিবালয় করাও জরুরি বলে মনে করেন তারা।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুদৃঢ় করার ব্যাপারে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচার বিভাগ কাগজে-কলমে পৃথক হলেও বাস্তবে স্বাধীন হয়নি। এখনও বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি, শৃংখলা বিধান আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে। এটা থেকে বের হতে হবে। এ জন্য পৃথক সচিবালয় জরুরি।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করতে হলে বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি সবকিছুই সুপ্রিমকোর্টের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটাতে হবে। তিনি বলেন, আইন না থাকায় বিচারপতি নিয়োগ রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। গত ১৫ বছরে বেশিরভাগ নিয়োগই হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। তিনি বলেন, নির্বাচিত পদ ছাড়া সব নিয়োগের জন্যই আইন থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের সাংবিধানিক পদে নিয়োগের কোনো আইন নেই। যুগান্তর