মেইন ম্যেনু

এই অস্থিরতায় নজরুলকেই প্রয়োজন ছিল

লিমন আহমেদ : চলে এল আরেকটি নজরুলজয়ন্তী। আমাদের জাতীয় কবি, চির যৌবনের কবি, প্রেম এবং দ্রোহ যার লেখনীতে মিলেছে এক সুরে, সেই প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজ ১১৭তম জন্মবার্ষিকী। কবির জন্মবার্ষিকীতে রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি…

বাংলা সাহিত্য-সংগীত তথা সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি নজরুল। প্রেমের কবি, সাম্যের কবি ও বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুলের লেখনী ধুমকেতুর মত আঘাত হেনে আমাদের জাগিয়ে তুলেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, গায়ক, অভিনেতা, সাংবাদিক, ছড়াকার, গল্পকার।

তার জীবনের পরতে পরতে সংগ্রাম আর ভালবাসার অপূর্ব গল্প। তিনি আমাদের বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধুমকেতু হয়ে জন্মেছিলেন। তবে, তার সৃষ্টিকর্মরা যুগ যুগ ধরে চির অম্লান হয়ে থাকবে আমাদের ভাবনা-চেতনায়।

জন্ম ও কর্ম জীবন
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ২৪শে মে ১৮৯৯ সালে কাজী নজরুলের জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ ও মাতার নাম জাহেদা খাতুন। নজরুলের ছেলেবেলার ডাকনাম ছিল দুখু। নজরুলের যখন নয় বছর বয়স তখন তার পিতা মারা যান।

আর্থিক কারণেই লেখাপড়ার সুযোগ না পেয়ে বাড়ির পাশেই অবস্থিত এক মাজারে খাদেম ও মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন কিছুদিন। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের মন ছিল গানবাজনার দিকে। তাই লেটোর দল নামে পরিচিত এক যাত্রা দলে মাত্র ১২ বছর বয়সে যোগ দেন। সেখানে কবি হাসির নাটক ও গান রচনা করে খুব সুনাম অর্জন করেন। এভাবেই শুরু হয়েছিল কাজী নজরুলের সাহিত্যজীবন।

লেটোর দলে শিশু নজরুলের কৌতুক-রচনা-
রবনা কৈলাসপুর, আই এম ক্যালকাটা গোইং
যত সব ইংলিস ফেসেন, আহা মরি কি লাইটনিং।
ইংলিস ফেসেন সবি তার, মরি কি সুন্দর বাহার।
দেখলে বন্ধু দেয় চেয়ার, কাম অন ডিয়ার গুড মনিং।

শিক্ষা ও বিপ্লবী
ছোটবেলা থেকে নজরুল ভরঘুরে ছিলেন। এজন্য কোনো স্কুলেই দীর্ঘসময় নিয়ে লেখাপড়া করেননি। চার-পাঁচটা স্কুলের নাম আমরা জানতে পারি। দশম শ্রেণিতেই কবির স্কুলজীবন শেষ হয়। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, বৃটিশ সরকার বাঙ্গালিদের নিয়ে ব্যাংগল রেজিমেন্ট নামে একটা সেনাদল গঠন করলে ১৯১৭ সালে কাজী নজরুল সেখানে যোগ দেন।

সেখানে থাকা অবস্থায় রাশিয়ার বিপ্লব ও লেনিনের লালফৌজের সমর্থনে অনেক কবিতা লিখেছিলেন কিন্তু বিধিনিষেধ থাকায় খবরের কাগজে ছাপানো সম্ভব হয়নি। কবি নজরুল দুই বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন।

১৯২০ সালে কলিকাতা থেকে নবযুগ নামে একটি পত্রিকা বের হলে কবি নজরুল সেখানে সহকারী সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকার অফিসেই থাকার জায়গা হয়েছিল।

১৯২১ সালে মোজাফফর আহমদের সাথে কমউনিস্ট পার্টি গঠনের কাজে সাহায্য করেছেন।

সংসারী কবি
১৯২১ সালের জুন মাসে নার্গিস খাতুনের সাথে বিবাহ ঠিক হয় কিন্তু কাবিন নামায় ঘরজামাইয়ের কথা থাকায় নজরুল রাগ ও অপমানে বিয়ের আসর থেকে রাতেই কুমিল্লায় চলে আসেন। এই শহরে ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের পরিবারের সাথে নজরুলের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। সেই পরিবারে বিরজাদেবীকে তিনি মা ডাকতেন। সেই পরিবারের মেয়ে আশালতা বা প্রমীলাকে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কাজী নজরুল বিয়ে করেন।

কাজী নজরুলের চার ছেলে ছিল প্রথম ছেলে কৃষ্ণ মুহম্মদ খুব ছোট বয়সেই মারা যায়। দ্বিতীয় ছেলে অরিন্দম বুলবুল মাত্র চার বছর বয়সে বসন্ত রোগে মারা যায়। এরপর আরও দুই ছেলে যাদের নাম কাজী সব্যসাচী (১৯২৯-৭৯) ও কাজী অনুরুদ্ধ (১৯৩২-৭৪) খুব অল্প বয়সেই মারা যায়।

কবির স্ত্রী প্রমীলা ৫৪ বছর বয়সে (১৯৬২) মারা যান। পশ্চীমবাংলার বর্ধমান জেলায় কবির নিজের গ্রাম চুরুলিয়ায় প্রমীলার সমাধি আছে।

হিন্দু না মুসলিম!
কাজী নজরুলের সাহিত্য জীবন খুব লম্বা ছিল না, তবুও প্রায় তিন হাজার গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তার সাহিত্য সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বদলছে। তার জীবদ্দশায় তাকে অসংখ্যবার মুখোমুখি হতে হয়েছে ‘হিন্দু না মুসলিম’-এই প্রশ্নটির।

কবির ইসলামী গান-কবিতা-গজল যেমন রয়েছে তেমনি হিন্দুদের জন্যও রয়েছে গান-কবিতা। এমনকী হিন্দু শ্যামা সংগীতও নজরুলের রচনা করা। তাই তার ধর্ম নিয়ে সমাজে ছিল নানা কানাঘূষা। তার উপর কবি বিয়েও করেছিলেন হিন্দুর ঘরে।

তবে সব প্রশ্নের জবাব কবি দিয়েছেন নিজের মুখেই। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী – ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]

এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল। ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে এই কথা কতটুকু অসাম্প্রদায়িকতার উদাহরণ হতে পারে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

আজ বাংলাদেশে কিছু ধর্মান্ধ মুসলমান কবি নজরুলকে মুসলমানের কবি দাবি করে তাকে একঘরে করে রাখার ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে। সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠায় দেশের ধর্মভীরু মুসলমানদের উস্কানি দিতে তারা ব্যবহার করছে কবির নাম ও সাহিত্য। এর থেকে আমাদের অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে।

রবীন্দ্র-নজরুল বাক বিতন্ডা
জ্ঞানপাপীর জন্ম মানব সমাজে সকল যুগেই হয়েছে। আমাদের এই কলি যুগেও আছে। যারা সব কিছুতেই নাক গলান অহেতুক, বাম হাত ঢুকান নিজের পকেট আর ইজ্জতের পাল্লা ভারী করতে। সেইসব জ্ঞানপাপীদের জ্ঞান অপচর্চার বিরাট এক মাধ্যম ‘রবি ঠাকুর বড় না কবি নজরুল বড়’-এই শীর্ষক বৈঠক। কিন্তু আদৌ এর কোন যৌক্তিকতা নেই।

বাংলা সাহিত্যের এই দুই প্রবাদ পুরুষ প্রত্যেকেই নিজ নিজ সময় ও স্থানে যুগের সেরা হিসেবেই জন্মেছেন এবং জীবন ও কর্মকে বিকশিত করেছেন। তাদের একে অপরের প্রতি ছিল শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর সম্মান। কেবল আমরা মুর্খরাই তাদের নিয়ে টানাটানি করে তাদের ছোট করছি, অপমানিত করছি।

১৯২২ সালে ধুমকেতু নামে একটা পত্রিকায় ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল লিখেছিলেন। এই অপরাধে ১৩ মাস জেলে থাকতে হয়েছিল। জেলে থাকা অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ বসন্ত নামে একটা নাটক নজরুলের নামে নিবেদন করেন। নজরুল যখন কারাবন্দী হয়ে অনশনে গেলেন, ভারতরবি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অনুরোধ করলেন অনশন ভাঙ্গতে।

আবার যেদিন রবীন্দ্রনাথ মারা যান সেদিন নজরুল লিখলেন- ‘বিশ্বের কবি, ভারতের রবি, শ্যামলবাংলার হৃদয়ের ছবি, তুমি চলে গেলে, তোমাকে নিয়ে কত গর্ব করেছি, ভগবান তোমাকে পাঠিয়েছিল আবার ফিরিয়ে নিল কেন? বিদায়ের সময় তোমার পায়ে আমার চুম্বন নিয়ে যাও। কথা দাও, যেখানেই থাক এই হতভাগ্য বাঙ্গালি জাতিকে মনে রাখিবে।’

তারপর আর কোনো তর্ক থাকে না, থাকতে পারে না।

নজরুল যুগের সমাপ্তি
১৯৪২ সালের ৯ই জুলাই সন্ধ্যায় কলিকাতা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান চলার সময় কাজী নজরুলের স্ট্রোক (মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ) হয়, কথা বলার শক্তি হারান। বিদেশে ডাক্তার দেখানো হলেও তেমন উন্নতি হয়নি। এইভাবে তিনি প্রায় ৩৪ বছর বেচেঁ ছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শেষ চার বছর ঢাকায় কাটান। নজরুলপ্রিয় ছিলেন একাত্তরে স্বাধীন হওয়া নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি জানতেন তার মতই বাংলার জনগণ প্রাণ দিয়ে ভালবাসে কবিকে।

সেই ভালবাসার তাগিদ থেকেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে ঘোষণা করা হয় জাতীয় কবি হিসেবে।

১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট ঢাকায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি লিখেছিলেন-‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই, যেন গোরে হতে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’

কবির ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাকে সমাধিস্থ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।

শেষকথা
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ধূমকেতুর মতো। স্রোতের প্রতিকূলে কখনও বা অনুকূলে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে, মৃত্যুঞ্জয়ী শপথে নজরুল সৃষ্টি করেছেন একের পর এক কবিতা, গান। মূলত এখনকার সময়টা ছিল একদিকে জাতের বৈষম্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার।

নজরুল এক অস্থির সময়ে বাঙালি মানসের প্রচণ্ড ক্ষোভের নাম। জন্ম তার দু:খ দারিদ্রে, অনাথ এতিম অবস্থায়। সেই শিশুকাল থেকেই তাকে ঘিরে ধরেছিলো দারিদ্রের অভিশাপ । দুবেলার দু মুঠো অন্ন জোগাড় করেছেন নিজের অর্জনে, যখন তার থাকার কথা খেলার মাঠে, শিশুদের পাঠশালায় স্লেট চক হাতে ।

তাই সব সময়ই দেখা যেত তার কাব্যে পরাজিতের জন্য, দূর্বলের জন্য, সর্বোপরি মানুষের জন্য সুতীব্র ভালবাসার কথা। নজরুল হয়ে উঠলেন গনমানুষের কণ্ঠস্বর। তার কবিতা গানে কিংবা যে কোন লেখায় প্রকাশ পেল সাম্যের কথা, অসাম্প্রদায়িক এবং বৈষম্যহীন এক সমাজের কথা। তাই তার ভরাট কণ্ঠে শোনা যায় সাম্যের অমর বাণী –

গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

আজকে চারপাশে এত যুদ্ধ, এত ধ্বংস, এত অস্থিরতা আর প্রজন্মের অবক্ষয় দেখে কেবলই মনে হয়; খুব প্রয়োজন ছিলো কবিকে। এক হাতে বাঁশি নিয়ে যিনি অন্য হাতে তরুণদের নির্দেশ দিতে পারতেন সব অনিয়মের বিরুদ্ধে বিপ্লবের। জয়তু নজরুল।। জয়তু মানুষ-মানবতার।।

সূত্রঃ পুড়িব একাকী (মোস্তফা জামান আব্বাসী), নজরুল রচনাবলী, ইন্টারনেট।