মেইন ম্যেনু

একটি ঝরে যাওয়া গোলাপের গল্প

–মা, ও মা, আমার পড়াশুনা শেষ হলে চাকরি করে তোমার সকল কষ্ট দূর করব মা। দেখে নিও, আমি অনেক টাকা কামাবো।

-ধুর পাগলি, তোর কামাইয়ের আশায় আছি নাকি? তোকে ভালো একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলেই আমি খুশি।

-এতো সহজে আমি বিয়ের পিড়িতে বসবো না মা, আগে আমার মায়ের সকল শখ পূরণ করব, যে শখগুলো তুমি বাবা মারা যাবার পর পূরণ করতে পারনি। আমার মনে আছে মা, বাবা মারা যাবার পর থেকে এই পর্যন্ত তুমি কিভাবে মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করে আমাকে লেখাপড়া করাচ্ছ।

মার চোখ থেকে বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঝরতে লাগলো, বুকে জড়িয়ে নিয়ে খানিকটা গর্ববোধ করতে ভুল হল না তার।

মনের আনন্দে ছাঁদে গান গাইছে লতা। আজ তার অনার্সের রেজাল্ট বের হয়েছে, ভালো রেজাল্ট হওয়াতেই এই গান গাওয়া। এখন শুধু একটি চাকরি। ব্যস! লতার আর কিছুই চাই না।

পার্কে বসে বসে সার্টিফিকেটটা বার বার দেখছে লতা। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে দিতে আজ ও ক্লান্ত, জুতার ফিতেটা ছিড়ে গেছে। পার্টসটা খুলে শুধু বাসের ভাড়াটা চোখে পরল ওর। কয়েক মাসের মধ্যে বহু জায়গাতেই ইন্টারভিউ দিয়েছে লতা। কয়েকটাতে সুযোগো হয়েছিলো, তবে তার জন্যে তাকে দিতে হবে লাখ খানেক টাকা।

লতা ভালো করেই জানে এটা ওর পক্ষে সম্ভভ নয়। আরও কয়েকটাতে সম্ভাবনা হয়েছিলো, তবে তার জন্যে লতাকে যেতে হবে আবাসিক হোটেলের কোন এক অনাবাসিক কামরায়। লতার পক্ষে এটাও সম্ভব নয়। তাহলে কিভাবে লতা তার বিধবা মায়ের কষ্ট দূর করবে? তাহলে এতো ভালো রেজাল্ট করে কি লাভ হল? এসব চিন্তা আজ লতাকে গ্রাস করে ফেলেছে। এরকমই কি হওয়ার কথা ছিল?

আজ অনেক দিন পর লতার মুখে খানিকটা হাঁসি দেখতে পাচ্ছে তার মা। ৮ হাজার টাকা বেতনের ছোট্ট একটা চাকরি, তার পরেও লতা আজ পরিতৃপ্ত। নিজের যোগ্যতায় অর্জন করা কোন কিছুই কম নয়। মেয়ের এই সন্তুষ্টের হাঁসি দেখে মাও আজ পরিতুষ্ট।

প্রথম মাসের বেতন পেয়েছে লতা। মায়ের জন্যে ১টা শাড়ি কিনেছে ও। ভাবছে এই শাড়িটা দেখলে ওর মা কত খুশিই না হবে, ভাবছে এবার আর বাড়ি ভাড়ার জন্যে বাড়িওয়ালা চাঁচা বকাবকি করতে পারবে না। মাকে নিয়ে বাহিরে ঘুরতে যাবে বলে কাল ছুটিও নিয়েছে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অনেক কিছুরই পরিকল্পনা করছিল ও। হটাত করে একটা মাইক্রবাস ওর সামনে এসে দাঁড়াল। জোর করে টেনে ওকে গাড়িতে ওঠাল ৪-৫ টা যুবক। আশেপাশে বহু সিনেমার দর্শক তখন দাঁড়িয়ে ছিল। তারা বাসস্ট্যান্ডকে বলাকা সিনেমা স্ট্যান্ড ভেবে সেই দৃশ্য উপভোগ করল। অতঃপর…।

অতপর, আরও একটি মেয়ের সম্ভ্রম বিসর্জন, আরও একটি পরিবারের স্বপ্নের বিসর্জন।

লতার মা আবারো বাসায় বাসায় কাজ করছে। তবে লতা বারণ করতে পারছে না। কারণ মৃত মানুষ জীবিত মানুষের সাথে কথা বলতে পারে না।

শাড়িটা রাস্তায় পরে আছে নিশ্চুপ হয়ে। যদি হাত-পা থাকত তাহলে নিশ্চয়ই লতাকে বাঁচানোর চেষ্টা করত, যদি কথা বলতে পারত তাহলে নিশ্চয়ই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিত। তবে ভালোই হয়েছে শাড়িটার কোন অঙ্গ-প্রতঙ্গ নেই।

কারণ, সময়মত যেসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ কাজে না দেয় সেইসব অঙ্গ-প্রতঙ্গ থাকার চাইতে না থাকাই শ্রেয়।