মেইন ম্যেনু

এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পানির নিচে অর্ধেক ঢাকা

মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টি। বেলা ২টার দিকে শুরু। থামল ৩টার দিকে। এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক তলিয়ে গেল পানির নিচে। ভাঙা-চোরা, গর্ত, খানা-খন্দে ভরা সেই রাস্তা অসহনীয় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো রাজধানীবাসীর জন্য।

বৃষ্টির সময় ছিলাম অ্যালিফ্যান্ট রোড, বাটা সিগন্যালে। গতকালও বৃষ্টি হয়েছিল। একই রাস্তায় রিকশা নিয়ে পার হয়েছিলাম। বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট অসহনীয় জ্যাম ঠেলে পার হতে পারলেও রাস্তায় পানি জমতে দেখিনি। শুধু কারওয়ানবাজার এবং বিজিএমইএ ভবনের মাঝের রাস্তায় কিছুটা জায়গায় পানি জমতে দেখেছি।

কিন্তু আজ এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে বাটা সিগন্যাল থেকে হাতিরপুল বাজার পর্যন্ত পুরোটা হাঁটুপানির নিচে। সেই পানিতে আটকে আছে হাজারও গাড়ির মিছিল। গাড়ি ঘুরিয়ে শাহবাগের দিকে রওনা দিলাম। যথারীতি এদিকেও পানি। কাঁটাবন পার হয়ে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত আসার পর বাংলামটরের দিকে গলা পর্যন্ত জ্যাম। শাহবাগ থেকে বাংলামটরের দিকে যাওয়ার চিন্তা করাটাই তখন যেন অপরাধের পর্যায়ে পড়বে।

রামপুরা ব্রিজের দিকে দ্রুত আসার জন্য ড্রাইভার সোজা গাড়ি চালিয়ে দিল। জিজ্ঞাসা করলাম কোন রুটে যাবেন? বলল, কাকরাইল-বেইলি রোড হয়ে মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে সাতরাস্তায় নামবে, এরপর হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা ব্রিজ।

কাকরাইল পর্যন্ত আসার পর ভুল ভাঙল। রাস্তা তো নয় যেন একটি নদী। রাস্তার ওপর পানি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বিশাল বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে ফুটপাতের ওপর। রমনা পার্কের ভেতরের রাস্তায়ও ঢুকছে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের পানি। কাকরাইল মসজিদ পার হয়ে এসে দেখা গেল বেইলি রোডের দিকেও জ্যাম। অগত্যা ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে দিল সোজা নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে। ফকিরাপুল, আরামবাগের পাশ দিয়ে গিয়ে রাজারবাগের রাস্তা ধরবে। এরপর খিলগাঁও ফ্লাই ওভারের ওপর দিয়ে রামপুরা।

চিন্তা করতে কতই না সহজ! কিন্তু কাকরাইল-রাজমণি ঈসা খাঁ মোড় পার হতেই যেন নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল। এখানে তো ফুটপাতও দেখা যাচ্ছে না। তলিয়ে গেছে। পানি হাঁটু নয়, কোমর সমান। অনেকগুলো দোকানেও পানি ঢুকতে দেখা গেল। একটু এগিয়ে যেতে দেখলাম, পানির প্রবাহ যেন আরও বাড়ছে।

বিএনপি অফিসের সামনে দিয়ে কচ্ছপ গতিতে এগোতে দেখলাম, অনেকগুলো গাড়ি বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পানির মধ্যে। বেশ কিছু সিএনজি, মোটরসাইকেল, মাইক্রো কিংবা প্রাইভেটকারের সাইলেন্সার কিংবা ভেতরে অন্য কোনো যন্ত্রাংশে পানি প্রবেশ করায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং কোমর সমান পানিতে বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ফকিরাপুল থেকে নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত গত এক বছর রাস্তার দুই পাশে স্যুয়ারেজ লাইনের কাজ করতে দেখা গেছে। বিশাল মোটা কংক্রিটের পাইপ বসানো হয়েছে। কোথাও বা ঢালাই দিয়ে ড্রেনের লাইন তৈরি করা হচ্ছে; কিন্তু রাস্তার দু’ধারে এই দুটি স্যুয়ারেজ লাইনই যেন এখন এ এলাকার অভিশাপ। পানি নিষ্কাশন করা তো দূরে থাক, বরং স্যুয়ারেজ লাইনের ভেতর জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা উগলে বের করে মিশিয়ে দিচ্ছে রাস্তায় জমে থাকা কোমর সমান পানির সঙ্গে।

পলওয়েল মার্কেট পার হলেই পল্টন থানা। রাস্তার পানি থানার ভেতরে সিঁড়ির গোড়ায় গিয়েও ঠেকেছে। ফকিরাপুল মোড় পার হয়ে আরামবাগের দিকেও রাস্তায় একই অবস্থা। এজিবি কলোনির পাশ দিয়ে মতিঝিল আইডিয়ালের দিকে রাস্তায় যেন বিশাল বিশাল ঢেউ খেলা করছে। উন্মত্ত পদ্মা কিংবা মেঘনার রূপ ক্ষণিকের জন্য হলেও এ জায়গায় এসে নগরবাসী প্রত্যক্ষ করতে পারত।

মতিঝিল আইডিয়াল হয়ে রাজারবাগের দিকে রাস্তায় দেখা গেল বেশ কয়েকজন শিশু-কিশোরকে পানিতে সাঁতার কেটে খেলা করতে। ঝিল কিংবা নদীর দেখা হয়তো এদের ভাগ্যে জোটেনি। পুকুরে সাঁতার কাটার চিন্তাও হয়তো তারা কখনও করতে পারেনি; কিন্তু বর্ষার বৃষ্টিতে রাস্তায় জমে থাকা পানিই যখন নদীর মতো প্রবাহিত হয় রাস্তার ওপর দিকে, তখন এসব শিশু-কিশোরের দুরন্তপনা বেঁধে রাখার সাধ্য কার!

রাজারবাগ মোড় পার হয়ে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া পর্যন্ত অনায়াসেই পার হয়ে গেলাম। জ্যাম নেই, পানি নেই। আহা! কি শান্তি!! সামনেও বুঝি এতটা সহজ রাস্তা অপেক্ষা করছে? কিন্তু কিসের কী। মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত রাস্তাটা পুরোপুরি ডুবে আছে পানির নিচে। আর সেই পানির কল্যাণে অসহনীয় যানজট। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে থাকতে হলো এই রাস্তায়। আবুল হোটেল পর্যন্ত বলতে গেলে ঘোরা হয়ে গেছে অর্ধেক ঢাকা। পুরোটাই পানির নিচে তলিয়ে আছে।

আবুল হোটেল পর্যন্ত আসার পর বাকি রাস্তা পার হয়ে বাড্ডা লিংক রোডে অফিসে আসতে অবশ্য আর খুব বেশি সময় লাগেনি। ছোট দু-একটি জ্যাম ছাড়া বাকি পথ অনায়াসেই পার হয়ে গেলাম; কিন্তু প্রায় আড়াই ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে ঢাকার যে রূপ দেখলাম, তাতে নদীমাতৃক বাংলাদেশ নয়, ‘নদী মাতৃক ঢাকা’ হিসেবে রাজধানীকে আখ্যায়িত করতেই পারি।

সতীর্থ সাংবাদিকদের শেয়ার করা ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, কারওয়ানবাজার, পল্টন, প্রেসক্লাব, মতিঝিল থেকে শুরু করে ঢাকার অনেকগুলো এলাকা পানির নিচে। কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত পুরো ঢাকা। আরেক সতীর্থ সাংবাদিক বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ভেতরে জমে থাকা পানির ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে লিখেছেন, ‘ফুটবল নয় এখানে নৌকাবাইচ আয়োজন করলেই সবচেয়ে ভালো হতো। আমাদের স্যুয়ারেজ লাইনের অবস্থা একটাই খারাপ যে মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নৌকাবাইচ আয়োজন করার মতো পানি জমে গেছে।’






মন্তব্য চালু নেই