মেইন ম্যেনু

এক চায়ের সাত রঙ : ৫৯ পদের চা বানানোর ওস্তাদ মুখলেস

শ্রীমঙ্গলের রমেশ রামগৌড়ের সাত রঙের চায়ের কথা শুনেছেন অনেকে, খেয়েছেনও নিশ্চয়ই। এক গ্লাস চায়ের মধ্যে সাত রঙের সাতটি স্তর এই চায়ের বিশেষত্ব। নেত্রকোনার মুখলেস উদ্দিনও চা বানান। সাদামাটা লাল চা, দুধ চা, গ্রিন টি—এসবের বাইরে গিয়ে মজার মজার চা বানানোর তরিকা বের করেছেন মুখলেস। ফুল, ফল, মসলা ও গাছগাছড়া দিয়ে ৫৯ পদের চা বানাতে পারেন তিনি।

নেত্রকোনা শহরের মুক্তারপাড়ায় পুরাতন ফৌজদারির উল্টো পাশে ফুটপাতের ওপর বসেন মুখলেস। ওপরে টাঙানো কয়েকখানি সাদা কাগজে চায়ের তালিকা দেওয়া। মরিচ চা, বেল চা, কমলা চা, মাল্টা চা, জাফরান চা, লবণ চা, জবা ফুলের চা, পাটপাতার চা, শিউলিপাতার চা, বাসকপাতার চাসহ ৫৯ পদের চা পাওয়া যায় এখানে।

চায়ের দাম ৫ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে। এর মধ্যে ১০ টাকার চা-ই বেশি। ১০০ টাকা দামের চায়ের নাম ‘মামা স্পেশাল মধু চা’। কী আছে এতে জানতে চাইলে ‘মামা লাল চায়ের দোকান’-এর মালিক মুখলেস উদ্দিন জানালেন, মধু তো আছেই সঙ্গে ৫০ থেকে ৬০ রকমের মসলাও দেওয়া হয় ওই চায়ে। স্পেশাল এই চা বানাতে চার-পাঁচ মিনিট সময় লাগে।

এমনি দামি চা আরও আছে। যেমন অশ্বগন্ধা মধু চা। এই চায়ের দাম ৮০ টাকা। অনন্ত মূল মধু চায়ের দামও বেশ। প্রতি কাপ চায়ের দাম রাখা হচ্ছে ৬০ টাকা করে। তবে বেশি চলে ৫ টাকা দামের কাঁচা মরিচের চা, জানালেন মুখলেস উদ্দিন।

বছর দশেক ধরে চায়ের ব্যবসা করছেন। এখন তাঁর বয়স ৫৫। আগে সাধারণ চা-ই বেচতেন। বছর দুই-তিন ধরে নানা পদের চা বানানোর ফর্মুলা বের করেন। আয়-রোজগার ভালোই। দিনে ৫০০ কাপের মতো চা বিক্রি করেন। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে ছোট্ট সংসারটা ভালোই চলে তাঁর।

ঈদের আগের দিন, রাত তখন সাড়ে ১১টা। ফুটপাতে কয়েকখানি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। ছোট একটা বেঞ্চও আছে। শহর তখন প্রায় ঘুমিয়ে। কিন্তু মুখলেস উদ্দিনের চায়ের দোকানে তখনো গোটা আষ্টেক লোক চা খাচ্ছে। জানতে চাইলাম, আপনার দোকানে টানানো এই তালিকার যেকোনো চা যদি এখন বানিয়ে দিতে বলি, পারবেন দিতে? এক গাল হেসে জবাব দিলেন, ‘অহনি বানায়া দিয়াম। কইন আপনের কোনডা লাগব।’

এত এত চা বানানোর কায়দাকানুন শিখলেন কোত্থেকে জানতে চাইলে তিনি জানান, নিজে নিজেই ভেবেচিন্তে বের করেছেন। একসময় বই পড়ার বাতিক ছিল। পাঠাগারে বসে পড়তেন। পড়ার সেই নেশাটা এখনো আছে। পত্রপত্রিকা পড়েন। গাছগাছড়া নিয়ে কোনো লেখা দেখলেই সেটা পড়ে ফেলেন।

নানা রকম মসলাপাতি ছড়ানো টেবিলের ওপর। তার পাশেই একগাদা মগ। চুলায় চারটি কেটলি। চা বানাতে বানাতেই কথা বলছিলেন মুখলেস। আপনার এত ব্যস্ততা, কোনো লোক রাখেন না কেন? জবাবে মানুষটি বললেন, ছেলেপিলে রাখতে গেলেই বিপদ। সব রসদ ঠিকমতো না দিলে চা তো হবেই না, উল্টো বিষ হয়ে যাবে। মূলত এই ভয়ে তিনি সাহায্যকারী হিসেবে কাউকে রাখেন না।