মেইন ম্যেনু

এক ফোঁটা পানি রক্ষাই যার কাজ

রোববার সকালে ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালেন ভারতের ব্যস্ত নগরী মুম্বাইয়ের মিরা রোডের একটি বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে। দালানটিতে থাকা ৫৬টি ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটিতে পর্যায়ক্রমে যান তিনি। প্রত্যেক ফ্ল্যাটে গিয়েই তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার বাসার পানির কলগুলো ঠিক আছে তো?’। কেউ যখন তাকে জানান যে, তাদের বাসার পানির কল ঠিকাছে তখন তিনি ওই ফ্ল্যাট মালিকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে চলে যান অন্য আরেক ফ্ল্যাটে। আর যাদের পানির কলে সমস্যা থাকে, তাদের কিলটি নিজ উদ্যোগেই সেরে দেন তিনি। এভাবেই প্রতি রোববার আমাদের এই আশি বছর বয়সী মানুষটি শহরের বিভিন্ন দালান থেকে দালানে যান পানির কল ঠিক করবার জন্য। কিন্তু কে এই বৃদ্ধ?

মুম্বাইয়ের এই পানির কল সারাই করা বৃদ্ধের নাম আবিদ সুরতি। ভারতের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট, শিল্পী এবং আশিটি বইয়ের লেখক আবিদ সুরতি আজ অনেক বছর ধরেই পানির অপচয় রোধে নিজে উদ্যোগী হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন যাতে মানুষ পানির অপচয় না করেন। শহরের অধিকাংশ বাসা বাড়িতেই দেখা যায়, পানির কল খারাপ থাকার কারণে একটু একটু করে অনেক পানির অপচয় হয়ে যায়। আর সেই পানির অপচয় ঠেকাতেই তিনি সঙ্গে কল সারাইয়ের মানুষ নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান।

“বিশাল কোনো পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রতিটি বিন্দুই গণনা করা হয় নিখুঁতভাবে”

গুণী এই মানুষটি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরিবারগুলোর কল ঠিক করে দিয়ে আসেন। এমনও হয়, যদি কোনো পরিবারের পানির কল খারাপ থাকে তিনি নিজের পয়সায় সেখানে কল লাগিয়ে দিয়ে আসেন। শুরুর দিকে মুম্বাইয়ের অনেক ধনী অধিবাসীর কাছে বিষয়টি একটু আপত্তিজনক ঠেকেছিল। কিন্তু আবিদ সুরতির মোহনীয় ব্যক্তিত্ব আর বাচনভঙ্গি সহজেই অন্যকে আপন করে নেয়। আর একবার তাকে আপন করে নিলেই তিনি শুরু করে দেন তার কাজ। সঙ্গে থাকা একজন স্বেচ্ছাসেবক ও পানির কল মিস্ত্রি তৎক্ষণাত কাজে লেগে যান।

সম্প্রতি ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে পানির কল সারাইয়ের বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলেন আবিদ সুরতি। সেই আলাপের এক স্থানে তিনি জানান, ‘আমি যখনই আমার কোনো বন্ধু বা আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে যেতাম কানে আসতো বিন্দু বিন্দু পানি পড়ার শব্দ। আমি তাদের কলটি ঠিক করে নিতে বলতাম।’ অবশ্য আমাদের এই শিল্পী পানির কল ঠিক করার ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়ার কারণ কিন্তু অনেক গভীর। এই মুম্বাই শহরেরই একেবারে প্রান্তিকে শৈশব কেটেছে আবিদ সুরতির। তার মা এক বালতি পানির জন্য ভোর চারটার সময় উঠে মূল সড়কে যেতেন। সেই শৈশব থেকেই তিনি দেখেছেন পানির জন্য কতটা কষ্ট করতে হয় মানুষকে। আজও সেই স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত।

‘এক ফোঁটা পানির জন্য মানুষকে আমি মারামারি করতে দেখেছি। আজ যখন কোথাও এক ফোঁটা পানিও অপচয় হতে দেখি তখন আমার শৈশবের স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার মাথায় পানি অপচয়ের দৃশ্য আসলেই খুব অস্থির লাগে। এটা ভাবতেই পারি না যে কেউ স্রেফ বেখেয়ালবশত এক হাজার লিটার পানি স্রেফ নর্দমায় ফেলে দিচ্ছে।’

২০০৭ সালে আবিদ সুরতি পত্রিকায় একটি রিপোর্ট লেখেন সকলের জ্ঞাতব্যের জন্য। সেই রিপোর্টে তিনি লেখেন, প্রতি সেকেন্ডে যদি এক ফোঁটা পানির অপচয় হয় তাহলে প্রতি মাসে এক হাজার লিটার পানি স্রেফ নর্দমায় চলে যায়। এরকম আরও বেশকিছু পরিসংখ্যান তিনি তুলে ধরেন সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার জন্য। পানির সমস্যা নিরসন ও মানুষকে সচেতন করতে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ড্রপ ডেড ফাউন্ডেশন’ নামের একটি বে-সরকারি সংস্থা। সংস্থায় তিনিই একমাত্র কর্মী আর স্লোগানও একটি। আর সেই স্লোগানটি হলো, ‘প্রতি ফোঁটা পানি বাঁচাও অথবা অকালমৃত্যু বরণ করো’। কাজের সুবিধার জন্য তিনি একজন মানুষকে ভাড়া করেন, যার কাজ হলো ত্রুটিযুক্ত পানির কলগুলোকে ঠিক করা।

অধিকাংশ সময়েই ফ্ল্যাটের দরজা খোলেন পরিবারের নারী সদস্যটি। তাই আবিদ সুরতি কাজের সুবিধার জন্য একজন নারী কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছেন। কারণ প্রথমদিকে তিনি মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে বুঝতে পেরেছেন যে, দুজন পুরুষ মানুষকে দেখে অধিকাংশ নারীই দরজা খুলতে সাহস পান না। তাই নারীদের ভরসা দিতেই এই নারী কর্মী নিয়োগ। প্রায়শই দেখা যায়, অনেক পরিবারই এক ফোঁটা পানিকে আমলে আনতে চান না। আর তখন আবিদ সুরতির কাজ হয় সেই পরিবারটিকে ঠিকঠাক করে বোঝানো এক ফোঁটা পানির গুরুত্ব।

কিন্তু এই স্বেচ্ছাসেবার খরচটা কীভাবে আসে শিল্পীর? আমরা আবিদের কণ্ঠেই শুনতে পাই প্রশ্নের উত্তর, ‘সত্যি করে বললে আপনি যখন কোনো ভালো কাজ করতে যাবেন তখন এই গোটা মহাবিশ্ব আপনার সঙ্গে থাকবে। শুধু তাই নয়, ঈশ্বর আপনার হয়ে পয়সা সংগ্রহ করবে।’ যেদিন আবিদ ফাউন্ডেশন খোলার সিদ্ধান্ত নিলেন ঠিক তার পরের দিনই তিনি খবর পেলেন যে, তিনি একটি পুরস্কার পেয়েছেন এবং সেই পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থের পরিমান এক লাখ রুপি। আর মজার বিষয় হলো, সেই অর্থ দিয়েই তিনি শুরু করে দিলেন তার কাজ। শুরুর দিকে স্বেচ্ছাসেবক ও নারী কর্মীটিকে প্রতিদিন পাঁচশ করে টাকা দিতেন তিনি। কিন্তু একটা সময় ওই স্বেচ্ছাসেবীরা পর্যন্ত তার কাছ থেকে টাকা নিতে চাইতো না।



« (পূর্বের সংবাদ)