মেইন ম্যেনু

এক স্ত্রী নিয়েই কেন খুশি থাকে মানুষ?

আধুনিক সংস্কৃতির বেশিরভাগ মানুষই জীবনের জন্য ‘একজন’ সঙ্গী বেছে নিতে চান, যার সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয়া যাবে। অনেক সংস্কৃতিতে এখনো বহুগামীতার প্রচলন থাকলেও মানুষ অবশ্য এখানো একগামীতার দিকেই ঝুঁকছে। তবে এটা কিন্তু আমাদের পূর্ব-পুরুষদের কোনো আচার নয়। আমরা যাদের বংশধর, তারা কিন্তু ছিলেন বহুগামী। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত নৃবিজ্ঞানে দুটি তত্ত্ব আছে।

একটি তত্ত্ব নিয়ে বলছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’র বিবর্তনবাদী নৃতত্ত্ববিদ কিট ওপি। তিনি মনে করেন, মাত্র এক হাজার বছরে ধরে মানুষ একগামী সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকেছে। আমাদের আদি পুরুষদের শুরুর দিকে, প্রায় ৭৫ মিলিয়ন বছর আগে তারা নির্জনে এবং বিচ্ছিন্নভাবে বাস করতে পছন্দ করতো। শুধু প্রাপ্ত বয়স্করাই তাদের সঙ্গীর সংস্পর্শে আসতো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পূর্ব-পুরুষরা সামাজিক হয়ে উঠতে শুরু করে, দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে শুরু করে। তবে এর মধ্যে শুধু মানুষই একগামী জীবন পছন্দ করে। তাছাড়া আমাদের পূর্ব-প্রজাতির মধ্যে বেবুন এবং শিম্পাঞ্জিরা কিন্তু একাধিক সঙ্গী গ্রহণ করে এবং সবাই মিলে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

মানুষই শুধু ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছে বলে জানান ওপি। প্রশ্ন হচ্ছে: কেন এমনটা হলো? বর্তমান তত্ত্বমতে, মানুষ এবং তাদের বংশধরদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই আমাদের পূর্বসূরিরা বহুগামীতা থেকে সরে এসেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা মতে, মানব সমাজ যখন বড় হয়ে উঠতে শুরু করলো, একেকটি দলে সদস্য সংখ্যা দশ থেকে বেড়ে শতাধিক হয়ে গেলো তখন সম্ভবত যৌনতার মাধ্যমে নানা রোগ ছড়াতে শুরু করে।

বিষয়টি পরীক্ষার জন্য গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন কানাডার ওয়াটার লু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্রিস বচ এবং তার সহকর্মীরা। জনমিতি এবং রোগ বিষয়ক তথ্যাদি কাজে লাগিয়ে গবেষণায় তারা দেখেন, মানব সমাজ যখন বড় হয়ে উঠতে শুরু করে তখন মানুষের মধ্যে যৌনতা থেকে সৃষ্টি হওয়া নানা রোগ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আর এ কারণেই এক ধরনের সামাজিক চাপে মানুষকে একগামী হতে হয়।

কানাডার ওয়াটার লু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো কীভাবে মানুষের সামাজিক নীতি-নৈতিকতার উন্নয়ন এবং বিশেষ করে দলবদ্ধ জীবনধারার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।’

আমাদের আদি পুরুষদের ছোট সমাজগুলোতে, যেসব সমাজে ৩০ জনের মতো লোক বাস করতো সেখানে যৌনবাহিত রোগের সংক্রমণে কম লোকেরই ক্ষতি হতো। পরে সমাজ যখন বড় হয়ে উঠতে শুরু করলো, কৃষির উন্নয়ন ঘটলো তখন বহুগামীতার কারণে সিফিলিস, গনোরিয়ার মতো রোগগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো। আর এর চিকিৎসাও তখন ছিল না। ফলে নারীদের গর্ভধারণের হার কমতে শুরু করে। বলা যায়, বহুগামীতার শাস্তি হিসেবেই আসে যৌনতাঘটিত নানা রোগ।

এই তত্ত্বের সঙ্গে অবশ্য সম্পূর্ণ একমত নন ওপি। তবে তিনি মনে করেন, বৃহৎ সমাজে এসে মানুষের চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে। মানুষ তার সম্পদ সংরক্ষণের একটি উপায় হিসেবে বেছে নেয় বিবাহকে। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে মানুষের যখন বৃহৎ সমাজে উত্তরণ ঘটে বহুগামী হওয়ার কারণে তখন যৌনতাঘটিত রোগগুলোও বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নিজের সম্পদ বাঁচানোর স্বার্থে মানুষ তার ভবিষ্যত বংশধরদের এসব রোগ থেকে রক্ষা করতে চায়। আর এ কারণেই সে বাধ্য হয়ে একগামীতা বেছে নেয়।

অপি বলেন, ‘এটা খুব মজার ব্যাপার। বৃহৎ সমাজে প্রবশের ফলেই এর (একগামীতা) প্রচলন শুরু হয়েছে। একগামীতা প্রথমে ছিল মূলত একটি বিবাহ ব্যবস্থা, সঙ্গী বেছে নেয়ার কোনো ব্যবস্থা নয়।’

বচ এবং তার দল মনে করে, আরো কিছু বিষয়ও এখানে সম্পৃক্ত আছে। যেমন নারীদের পছন্দ। তার দলের মতে, রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে গিয়েই আমাদের আজকের সামাজিক আদর্শগুলো তৈরি হয়েছে। তবে এই আদর্শগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাবেই তৈরি হয়নি।

মানুষের একগামী হওয়ার পেছনে বৃহত্তর দলবদ্ধতা এবং বৃহত্তর সমাজের ভূমিকা ওপি স্বীকার করেন। তবে এর সঙ্গে আরো একটি বিষয় তিনি যোগ করেন। তা হলো: শিশুহত্যা। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষকদের বিশ্বাস, বিবর্তনের ধারায় আমাদের পূর্বসূরিদের অবস্থার যখন উন্নয়ন ঘটতে শুরু করে এবং তারা আরো বেশি সামাজিক হতে থাকে তখন তাদের কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে জটিল হতে থাকে। এই জটিল অবস্থা মোকাবেলার জন্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কও বড় হতে থাকে।

তার মানে দাঁড়ায়, পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মস্তিষ্ক আগের প্রজন্মের লোকদের চেয়ে বড় হতে থাকে। এতে তাদের দেখাশুনার জন্য মায়েদের বেশি মনোযোগ দিতে হয় এবং তাদের আগের চেয়ে বেশি বুকের দুধ পান করাতে হয়। এ কারণে সন্তান জন্মদানের পর মায়েরা তাদের সঙ্গীদের বেশি সময় দিতে পারতেন না।

অপি বলেন, ‘একটি দলের পুরুষেরা নারীদের সঙ্গ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকতো। তবে নারীরা তাদের সময় দিতে না পারায় এক পর্যায়ে পুরুষরা তাদের শিশুদের হত্যা করতো, যাতে তারা তাদের নারী সঙ্গীদের সান্নিধ্য পেতে পারে।’ শিশুর যারা বাবা থাকতো তারা চাইতো তাদের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে। ফলে এক পর্যায়ে তারা একগামীতা বেছে নয়। এতে নারীদের একাধিক সঙ্গী না থাকায় অন্যরা তাদের বিরক্ত করতো না।

2016_05_18_16_45_38_76eRD3yzHCjJXE4g5F2KzlQTrEMGod_original

২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অপি যুক্তি দেখান, পুরুষরা তাদের সন্তানদের রক্ষা করার মানসিকতা থেকেই একগামীতার প্রচলন শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুহত্যা রোধের একটা ব্যবস্থা হিসেবেই নারী এবং পুরুষ উভয়য়েই একগামীতা বেছে নেয়।’ আর একগামীতা থেকেই একবিবাহের সূচনা।

উপরের দুটি তত্ত্ব থেকেই বোঝা যায়, আমাদের পূর্বসূরিরা কেন একগামীতা বেছে নিয়েছিল, যা আমরা আজো ধারণ করে আছি। তবে ওপি মনে করেন, আমরা আস্তে আস্তে একগামীতা থেকে আবার দূরে সরে যাচ্ছি। অবশ্য তার নতুন এই ধারণা কতটা সঠিক- সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব পরবর্তী প্রজন্মের ওপরেই থাকলো।