মেইন ম্যেনু

এখনো শনাক্ত হয়নি তাবেলার হত্যাকারীরা

রাজধানীর গুলশানে কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজারকে (৫০) হত্যার ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের এখনো শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনার মূল রহস্য উদ্‌ঘাটন বা কারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

হত্যাকাণ্ডের পর ওই এলাকার সিসিটিভির ফুটেজে অপরাধীদের চলাফেরা ও হত্যার দৃশ্য অস্পষ্ট থাকায় সঠিকভাবে শনাক্ত বা তাদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি গোয়েন্দা পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মো. মনিরুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, তাবেলা হত্যাকাণ্ডের সূত্র, কারণ ও উদ্দেশ্যের বিষয়ে পুলিশ সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণা পায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গুলশান-২ নম্বর এলাকার ৮৯ নম্বর সড়ক ছাড়া অন্য সব সড়কে সিসি ক্যামেরা ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীরা ৮৩ নম্বর সড়ক ধরে ৮৯ নম্বর সড়ক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হলেও ওই সময় ৮৩ নম্বর সড়কের বাতি বন্ধ থাকায় সেখানকার সিসিটিভির ফুটেজ অস্পষ্ট দেখায় অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে ঘটনার পর তাবেলার ফ্ল্যাট থেকে একটি ল্যাপটপ, একটি স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোর অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন, একটি নকিয়া হ্যান্ডসেট এবং নগদ তিন হাজার টাকা উদ্ধার করে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে পুলিশের পক্ষ থেকে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ ছাড়া মামলার সহায়তায় মনিরুল ইসলামকে প্রধান করে গোয়েন্দা পুলিশের ১১ সদস্যের আরেকটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

সূত্রটি জানায়, সিজারের শরীর থেকে উদ্ধার হওয়া গুলিটি ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবারের এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া গুলির খোসা যথাক্রমে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) ব্যালাস্টিক ও ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আয়োজিত এক সভায় ভারপ্রাপ্ত আইজিপি মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘এ ঘটনাকে আমরা একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটন নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পুলিশের সব ইউনিটকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ফুট ও মোটরসাইকেল প্যাট্রল, চেকপোস্ট, তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি সংস্থার জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তাবেলার বান্ধবীকে জিজ্ঞাসাবাদ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি তাবেলার বান্ধবী ডাচ নাগরিক নিগার রিগ্যালকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। একই সঙ্গে তার কর্মস্থল আইসিসিওর কর্মকর্তা মার্টিনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছে।

ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন জমা

হত্যাকাণ্ডের পর ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো সিজারের দেহ থেকে পাওয়া গুলির ব্যালাস্টিক প্রতিবেদন এসেছে শুক্রবার। নিহতের মৃতদেহ থেকে বের করা গুলির ব্যালাস্টিক রিপোর্ট সিআইডি ঘটনার তদন্তকারী উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবারের গুলিটি পিস্তল দিয়ে ছোড়া হয়েছিল। রিপোর্টে গুলির ভারসাম্য কেমন ছিল, সেটিও উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন বিদেশি নাগরিককে হত্যার পরিকল্পনা ছিল

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আমেরিকান নাগরিক মনে করেই তাবেলাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীরা খুব দ্রুত পরিকল্পনা করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কারণ তাবেলাকে যেখানে হত্যা করা হয়েছে, এর চেয়ে নিরাপদ ও নিরিবিলি ছিল তার বাড়ির সামনে । ধারণা করা হচ্ছে, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য কোনো একজন বিদেশি নাগরিক বিশেষ করে আমেরিকান নাগরিককে খুন করার জন্য ঘাতকদের ওপর নির্দেশ ছিল।

সন্দেহভাজনদের তালিকা করা হয়েছে

সূত্রটি জানায়, হত্যাকাণ্ডে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিক দলের সদস্য হলেও এরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত করা হচ্ছে।

তাবেলার শত্রু ছিল না

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, তদন্তকারী কমিটি তদন্তে তাবেলার কর্মস্থল ওই এনজিও সংস্থায় কর্মরতদের সঙ্গে তার কোনো দ্বন্দ্ব বা শত্রুতা থাকার তথ্য পায়নি। অফিস, বাসা ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সুইমিংপুল ও বিকেলে জগিং করার মাধ্যমেই সময় অতিবাহিত করতেন তিনি। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন তাবেলা সিজার।

তাবেলা সিজারের পরিচয়

তাবেলা সিজারের পিতার নাম তাবেলা কোররাদো। তার স্থায়ী ঠিকানা- ইতালির ভি. স্যাতেফোনি, ১৪ ক্যাসোলা, ভ্যালসেনিও, ৪৮০১০ আবাসিক এলাকা। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আইসিসিও কো-অপারেশন নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রুফের (প্রফিটেবল অপরচুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি) কর্মসূচির নামের একটি এনজিওতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে চুক্তিতে চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশে আসেন তাবেলা। পাশাপাশি তিনি গুলশানে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সুইমিং শিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন।

সোমবার রাতেই হত্যার দায় স্বীকারের ব্যাপারে যুগ্ম কমিশনার আরো বলেন, হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের বিবৃতির কোনো সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি।

আইএসের দেওয়া বিবৃতির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, দেশে কোনো আইএস জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। ইতালিয়ান নাগরিককে পরিকল্পিতভাবে একটি গোষ্ঠী গুলি করে হত্যা করেছে। তাদের খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে, তাদের গ্রেফতার করা হবে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশান-২ এর ৯০ নম্বর সড়কে তাবেলা সিজারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনাস্থলের পাশে আগে থেকেই মোটরসাইকেলে একজন যুবক বসে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আরো দুই যুবক দৌড়ে আসেন। ওই দুজন মোটরসাইকেলে চড়তেই একজন তাবেলাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। তিন রাউন্ড গুলি করে মোটরসাইকেলে চড়ে সৌদি দূতাবাসের দিকের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যান দুর্বৃত্তরা। পরে তাবেলাকে উদ্ধার করে গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনার পরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেন। হত্যার ঘটনায় গুলশান থানায় তার সহকর্মী হেলেন ভেনদার বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পরে মঙ্গলবার রাতে মামলাটি গোয়েন্দা কার্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক (উত্তর) জিহাদ উদ্দিন। তবে এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। গুলশান এলাকাতেই সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ আল আলীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।