মেইন ম্যেনু

এখন রাস্তায় ঘুমাই, রাস্তায় খাই, না খেয়েও থাকি!

ওদের দেখার কেউ নেই। পথ শিশুদের কথা বলছি। ঢাকা থেকে বরিশাল যাচ্ছিলাম লঞ্চ যোগে। হঠাৎ একটু মন চাইলো লঞ্চের ছাদে উঠতে, অপেক্ষা না করে দ্রুত লঞ্চের ছাদে উঠে গেলাম। ছাদে উঠে প্রথমেই নজর পড়ল ১২-১৪ বছরের একটি ছেলের দিকে। ছেলেটি চানাচুর বিক্রি করছিল। ওর কাছে যেতেই ভাই চানাচুর খাবেন? আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম কত টাকার বিক্রি কর? উত্তরে ছেলেটি বলল, ১০ টাকা ও ১৫ টাকার। আমি ছেলটিকে প্রশ্ন করলাম ৫ টাকার বিক্রি কর না? উত্তরে বলল ৫ টাকার চানাচুরে আপনার পোষবে না, কম পাবেন। আমি বললাম ৫ টাকারই দাও। এরপর চানাচুর খেতে খেতে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করছিলাম এই বয়সে ওর হাতে বই-খাতা থাকার কথা, কিন্তু ও চানাচুর বিক্রি করছে কেন?

এরপর কেন যেন মনে হলো ছেলেটিকে প্রশ্ন করি, এরপর আর কিছু না ভেবে সোজা ওকে জিজ্ঞাসা করলাম পড়ালেখা বাদ দিয়ে চানাচুর বিক্রি করছে কেন? উত্তরে ছেলেটি আমাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলল আপনার কাছে যদি আমি ৫ টাকা চাইতাম আপনি কি আমাকে দিতেন? আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি বললাম হয়তো দিতাম অথবা দিতাম না।

এরপরে আমি ওর বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলাম? ওর বাড়ি ফরিদপুর। বাবা-মা কি করে জিজ্ঞাসা করায় ছেলেটি কিছুটা বিমর্ষ চেহারা নিয়ে বলল বাবা মারা গেছে, মা আছে। আরেকটু গভীরভাবে প্রশ্ন করলাম, বাবার কি হয়েছিল? তারপরে ছেলেটি বলল, সত্যি কথা বলতে কি ভাই, আমার বাবা নেশা করতো। নেশা করতে করতে একদিন আমার মায়ের সাথে বাবার ঝগড়া হয়। এরপর আমার বাবা আমাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। শুনেছি সে অন্য এক মহিলাকে বিয়ে করছে। তার কিছুদিন পর আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে যায় এবং সেও আরেকটা লোককে বিয়ে করে সেখানে সংসার করছে। মূলত আমার মায়ের কারণেই আমার লেখাপড়া হয়নি। মায়ের কাছে টাকা চাইলেই মা মারধর করতো।

কিছুটা বিস্মিত হলাম। হঠাৎ মনে একটা প্রশ্ন জাগলো, ছেলেটি ব্যবসা করছে কিন্তু টাকা পেল কোথায়? চট করে ওকে প্রশ্ন করে ফেললাম। তুমি যে ব্যবসা করছো, তোমাকে ব্যবসার জন্য কে টাকা দিয়েছে? উত্তরে বলল আপনার মতই একটা ভাই ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে কোকরা কোকরা বড় চুল, আপনার মতো দাড়িও আছে (ফ্রাঞ্চ কাট)।ওনার নাম শেখর দা। আজ সকালে (০৫-১২-২০১৫) আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভিক্ষা করতে গিয়েছিলাম।তখন উনি আমাকে ৫০০ টাকা দিয়েছে আর বলেছে আর কখনও যেন ভিক্ষা না করি। সে তার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরতে আসছিল ওখানে। আমাকে সারাদিন তাদের সাথে ঘুরাইছে, দুপুরে বিরিয়ানী খাওয়াইছে। সে আজ বিদেশ চলে যাবে। বিকেল বেলা যাবার সময় আমাকে ৫০০ টাকা দিয়ে গেছে। আর বলেছে আর কখনও দেখা নাও হতে পারে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম তারপরে কি হল? এরপরে মারুফ বলল, আমি সদরঘাট এসে আমার এক পরিচিত মামাকে দিয়া আমার এই ব্যবসার জিনিসপত্র কিনে নেই। এরপরে ব্যবসা শুরু করি। আজ আমার ব্যবসার প্রথম দিন। কথাগুলো শুনে অচেনা সেই ভাই (শেখর দা) এর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসল। তখন মনে মনে ভাবলাম আমাদের ছোট খাটো একটু চেষ্টা একটা মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনে দিতে পারে। এরপরে আমিও মারুফকে কিছু টাকা দিয়ে বললাম, এই টাকাটা রাখ, তোমার ব্যবসার জন্য দিলাম। প্রথমে নিতে চাইল না, এরপরে একটু মুচকি হেসে টাকাটা নিল।

কথা বলার এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলাম রাতে খাওয়া হয়েছে কিনা? উত্তরে বলল না, লঞ্চের হোটেলের খাবার অনেক দাম, তাই খাব না। আমি বললাম রাতে না খেয়ে থাকবে? উত্তরে বলল হ্যাঁ। এরপরে আমি বললাম চল নিচে যাই, নিচে গিয়ে আমরা চা আর কেক খাবো। প্রথমে যেতে চাইল না। এরপরে বলল ঠিক আছে চলেন যাই। চা খেতে খেতে এক পর্যায়ে ছেলেটি আমাকে বলল ভাই যেই দোকানে চা খাচ্ছেন এই দোকানে আমি এক সময় কাজ করতাম। কোন টাকা দিত না। শুধু তিন বেলা পেটে-ভাতে খাওয়াতো। তাও আবার আলু ভর্তা আর ডাল, মাঝে মধ্যে মাছ-মাংস দিতো তাও হোটেলের কাস্টমাররা খাবার পরে যদি থাকতো। আর হাত থেকে যদি কাপ কিংবা গ্লাস পরে ভেঙ্গে যেতো তাহলে অনেক মারধর করতো। তাই এখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিছি।

হঠাৎ করে কিছুটা আবেগ কণ্ঠে বলল, আমার গলায় যে লকেটটা দেখছেন এখানে লেখা প্রিয় আমার ‘মা’। আমি আমার মাকে অনেক ভালোবাসি। তার জন্যই আমার লেখাপড়া হয় নাই। এরপরে জিজ্ঞেস করলাম তোমার মা এখন কোথায় থাকে তুমি জানো? ও বললো, মা এতোদিন বিদেশে ছিল। আমার এক খালা আমার মাকে বিদেশ নিয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন হয় দেশে আসছে। খবর পেয়ে আমি আমার মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমাকে অনেক আদর করছে। বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে। আমার গায়ের যে টি শার্ট এটা আমার মা দিয়েছে, আমার পরনের প্যান্টও মা দিয়েছে। তারপরে কিছুদিন আমাকে ১০ টাকা ১৫ টাকা দিয়েছিল মা। আমি বেশ কিছুদিন তার কাছে ছিলাম। শেষের দিকে আমি টাকা চাইলে আমার মা আমাকে মারতো। তাই আমি ঢাকায় চলে এসেছি।

এখন রাস্তায় ঘুমাই, রাস্তায় খাই আবার কখনও কখনও না খেয়েও থাকি। এখন তোমার মা কোথায় আছে তুমি জানো? ও বললো, হ্যাঁ জানি এখন শুনছি আবার বিদেশ চলে গেছে। এরপরে আমি মারুফকে জিজ্ঞেস বললাম বড় হয়ে তোমার কি করার ইচ্ছা আছে? মারফ বলল, বড় হয়ে আমি বড় ব্যবসায়ী হতে চাই। আমার যখন অনেক টাকা হবে তখন আমি একটা মসজিদ বানাবো যেখানে সবাই নামাজ পড়বে। মানুষ নামাজ পড়তে যায়, আমার দেখতে খুব ভালো লাগে।

আমি বললাম, আল্লাহ তোমার মনের আশা পূরণ করুক। এরপরে প্রশ্ন করলাম, তুমি কোন শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করছো? প্রথম শ্রেনীতে কিছুদিন পড়েছিলাম এরপর আর স্কুলে যাওয়া হয় নাই। এরপরে আমি বললাম, তুমি বড় ব্যবসায়ী হলে টাকা পয়সার হিসাব কিভাবে রাখবে? মারুফ বলল, তখন পারব। তুমি কি লিখতে পড়তে পারো? ও বলল, আমি শুধু আমার নাম বাংলায় এবং ইংরেজিতে লিখতে পারি।

পরিশেষে সমাজের সবার উদ্দেশ্যে এতটুকুই বলা, আমাদের একটু প্রচেষ্টাই পারে ওদের মতো পথ শিশুদের ভবিষ্যত গড়ে দিতে। আর বাবা-মায়েদের উদ্দেশ্যে মেসেজ দিতে চাই যে আপনাদের দাম্পত্য কিংবা পারিবারিক কলহের কারণে যেন আর কোনও মারুফের ভবিষ্যত নষ্ট করে। অবশেষে আবারও ধন্যবাদ জানাই সেই অজানা অচেনা (শেখর দা) শেখর ভাইকে।