মেইন ম্যেনু

‘এটা স্বীকার করতে আমার লজ্জা নেই, এটাই সত্য’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর যে সাধারণ মানুষের আস্থা নেই সে কথা স্বীকার করলেন স্বয়ং কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি এই সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘এটা সত্য যে, মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না, দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে। আমরা সেই রকম কাজ করতে পারিনি বলে এই বিশ্বাসহীনতা, এটা স্বীকার করতে আমার লজ্জা নেই, এটাই সত্য।’

রোববার (৩১ জুলাই) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ‘কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ২০১৬-২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

দুর্নীতির কারণে আমাদের সব অর্জনই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুদকের ওপর মানুষের বিশ্বাস আছে কি নেই আমি এই তর্কে যাবো না, তবে এই দায় শুধু আমাদের না, সমাজের সকল স্তরের মানুষের। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায় বেশি।

তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি ঠিক থাকেন তাহলে কারও পক্ষে দুর্নীতি করা সম্ভব না। এটা আমার অভিজ্ঞতা। আপনি যদি ঠিক থাকেন তাহলে আপনাকে বড়জোর বদলি কিংবা একটু মানহানি করতে পারে, এর বাইরে কিছু করতে পারে না। এই সকল ভয় থেকেই আমরা সমঝোতা করি, আর এই সমঝোতাটা দুর্নীতি। শুধু ঘুষ খাওয়াই যে দুর্নীতি এটা ঠিক নয়।

এসময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগে দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য দিয়ে দুদককে সহায়তা করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান কমিশন চেয়ারম্যান।

মতবিনিময় সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা বেগম, বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরিচালক রওশন আর জামান, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এস এম মাহবুবুল আলম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আমিনুল ইসলাম খান, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ মোস্তফা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শফিক আহমেদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শায়লা ফারজানা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ওহাব খান প্রমুখ।

এসব আমলাদের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি বড় বড় প্রকল্পে দুর্নীতি দূর করার সক্ষমতা আমাদের নেই। এই বিষয়টি আপনারাই দেখবেন, কোন কোন প্রকল্পে দুর্নীতি হতে পারে তা আমাদের জানানো দায়িত্ব আপনাদেরই। আপনাদের উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা, সোচ্চার হওয়া। তাহলেও দুর্নীতির প্রকোপ কমবে।

শুধুমাত্র সরকারের পক্ষে দর্নীতি দূর করা সম্ভব না, সবাইকে একযোগে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ‍দুর্নীতি নিয়ে বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়।সবাই অবকাঠামো নিয়ে কথা বললেও ক্লাসরুমের ভিতরে কি হচ্ছে সেটা নিয়ে কেউ বলে না। আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, শিক্ষকদের অনেকে ঠিকমতো ক্লাসে যান না, কিংবা ক্লাসরুমে গেলেও যে বিষয় নিয়ে পড়ানো কথা তা পড়ান না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাজার হাজার চিকিৎসক আছে, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাদের অনেকেই কর্মস্থলে যান না।

এছাড়া মতবিনিময় সভায় দুদক কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। সভায় দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, জার্মানভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান জিআইজেড এর কারিগরি সহযোগিতায় পাঁচ বছর মেয়াদি দুদকের কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ কৌশলপত্রে আটটি উল্লেখযোগ্য দিক চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি, কার্যকর অনুসন্ধান ও তদন্ত, মামলা পরিচালনা, প্রতিরোধ কৌশল, শিক্ষা কৌশল, উদ্ভাবনী গবেষণা ও উন্নয়ন, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো সুদৃঢ়করণ ইত্যাদি।

এছাড়াও এ কৌশলপত্রে দুর্নীতির কারণসমূহ পর্যালোচনা করে একটি ধারাবাহিক সুপারিশকৃত কার্যাবলি এবং প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে। অগ্রাধিকার ক্ষেত্রে ৫৯টি উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা চিহ্নিত করা হয়, যা আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করার সুযোগ রয়েছে।