মেইন ম্যেনু

এটিই শামসুজ্জামানের শেষ ছবি !

এটিএম শামসুজ্জামান, একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রের প্রবীণ অভিনেতাদের মধ্যে যিনি সববয়সী দর্শকের কাছে এখনো সেই শুরুর সময়ের মতোই জনপ্রিয়।

এটিএম শামুসজ্জামান শুধু একজন অভিনেতাই নন; একজন কাহিনিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, কবি ও সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ। চলচ্চিত্রে দর্শক তাকে ‘মন্দ মানুষ’ হিসেবে দেখলেও টিভি নাটকে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে।

তবে এখন তিনি শুধুই মীর সাব্বির অভিনীত আরটিভিতে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘নোয়াশাল’-এ অভিনয় করছেন নিয়মিত। সম্প্রতি এই নাটকের তিনশতম পর্ব প্রচার হয়েছে আরটিভিতে। তার আগেই এটিএম শামসুজ্জামানের ছবি তোলার জন্য এই নাটকের শুটিং স্পটে গিয়েছিলাম আমরা।

ছবি তোলার পর এটিএম শামসুজ্জামান বলে উঠেন, ‘হতে পারে এই ছবিই শেষ ছবি। হয়তো এই ছবিই স্মৃতি হয়ে যাবে।’ হাসতে হাসতে এটিএম শামসুজ্জামান বলেন, ‘তখন তোমরা লিখবা, মৃত্যুর মাত্র একদিন আগে তোলা ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল এটিএম শামসুজ্জামান।’

এটিএমের এমন কথায় শুটিংয়ের সবাই বেশ মজা পেলেও বিষয়টি কিন্তু খুব সত্য। যেমন গেল সোমবার দুপুরে এলিফ্যান্ট রোডে গাছে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠু। কে জানত এভাবে তিনি চলে যাবেন।

এটিএম বলেন, ‘পৃথিবীতে কেউ কী মরতে চায়? চায় না। সবাই বাঁচতে চায়, অনেকের মতো আমারও তো বাঁচতে ইচ্ছে করে হাজার বছর। কিন্তু জানি, তা সম্ভব নয়। তাই একটি কথাই বারবার মনে পড়ে যে, মরতে হবে আমাকে, মৃত্যুর জন্য সবসময়ই প্রস্তুত থাকতে হবে।’

ছাত্রাবস্থা থেকেই এটিএম শামসুজ্জামান কবিতা লিখে আসছেন, যা তার কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে বেশ ভালোভাবে। এবার আমরা একটু ফিরে যাই তার ব্যক্তি ও কর্মজীবনে।

১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানার বাড়িতে জন্ম তার। সেখানে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ছোট চাচার সঙ্গে রাজশাহী চলে যান। রাজশাহী লোকনাথ হাইস্কুলে দশম শ্রেণির অর্ধেক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

এরপর এসএসসি ও এইচএসসি করেছেন ময়মনসিংহের সিটি কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে। ১৯৬৮ সালের ১৫ মার্চ রুনির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তার বাবা নূরুজ্জামান, নামকরা উকিল ছিলেন, শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে রাজনীতি করতেন।

১৯৬১ সালে তার চলচ্চিত্রের গুরু ইসমাইল মোহাম্মদ (উদয়ন চৌধুরী) কলকাতায় ‘মানুষের ভগবান’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি ‘বিষকন্যা’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেই চলচ্চিত্রে তার সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান।

দীর্ঘদিন সহকারী হিসেবে কাজ করার সুবাদে যখন ছোট ছোট চরিত্রাভিনেতারা আসতে পারতেন না তখন তিনিই অভিনয় করতেন। এভাবে একসময় আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘নয়নমণি’ ছবিতে অনেকটা জোর করেই একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অভিনেতা হিসেবেও তার পথচলা সুগম হয়ে যায়। হতে চেয়েছিলেন তিনি পরিচালক, কিন্তু হয়ে গেলেন অভিনেতা।

এই বয়সে এসে কি মনে হয়, আপনি একজন সফল কিংবা পরিপূর্ণ অভিনেতা? ‘আমি নিজেকে কখনোই একজন পরিপূর্ণ অভিনেতা মনে করি না। আমি একজন সফল অভিনেতা এটাও কখনো মনে হয়নি। আমি যদি হাজার বছরও বেঁচে থাকি, অভিনয় করে যাই, তবুও এ রকম বিশ্বাস নিজের মনে সৃষ্টি হবে না যে, আমি ভালো অভিনয় করি বা আমি একজন সফল অভিনেতা। এ আমার বিনয় নয়, এ আমার মনের কথা।’ কান ছবিতে অভিনয় করে প্রথম পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন?

‘নায়ক রহমানের ‘কাঙ্গান’ ছবিতে অভিনয় করে প্রথম পারিশ্রমিক হিসেবে আমি দু-তিনশ টাকা পেয়েছিলাম। আমাদের দেশে চরিত্রাভিনেতাদের পারিশ্রমিকের ঠিক-ঠিকানা নেই। ছবি বললেই নায়ক-নায়িকাকে বোঝায়। তারা পয়সা বেশি পায় কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে। তাহলে আমরা কী কেন্দ্রীয় চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত নই?’

জীবনের এই পর্যায়ে এসে জীবনটাকে কেমন মনে হয়? ‘আসলে জীবন একেক জনের কাছে একেক রকম। এই বয়সে এসে মনে হয়, আমি কাউকে কষ্ট দেব না। কেউ আমাকে কষ্ট দিক তাও আমার কাম্য নয়। সবাই ভালো থাকুক। আল্লাহ যদি পৃথিবীতে ভালো থাকার একটি লাইন তৈরি করে দেন তবে সেই লাইনের শেষ মানুষটিও যেন আমি থাকি।’

আপনার নিজের লেখা কয়েকটি ছবির নাম জানতে চাই? ‘আমার লেখা উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো ‘জলছবি’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘মাটির ঘর’, ‘মাটির কসম’, ‘চিত্কার’, ‘লাল কাজল’ ইত্যাদি।’

এ পর্যন্ত পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, তাই না? ‘ঠিক তাই। প্রথম কাজী হায়াতের ‘দায়ী কে’ ছবির জন্য দুটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাই। এরপর ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ ও ‘চোরাবালি’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য একই পুরস্কার লাভ করি।’

বারবার আপনার মৃত্যুকে ঘিরে গুজব ওঠে, কেন এমন হয় বলতে পারেন? ‘আমি নিজেও জানি না কেন এমন হয়। তবে আমারও জানতে ইচ্ছে করে কারা এমন করেন, কেন এমন করেন। একজন মানুষকে নিয়ে এমন মজার কোনো অর্থ আছে কি না জানা নেই। আল্লাহ যাকে যতদিন হায়াত দেবেন তিনি ততদিনই বাঁচবেন। কারণ তিনিই তো এই দিন দুনিয়ার মালিক।’ -ইত্তেফাক