মেইন ম্যেনু

এটিএমে জালিয়াতির: অপারেশন ১ মিনিট ২৭ সেকেন্ড

ব্যাংকের বুথে ঢুকে সময় নিয়েছিল এক মিনিট ২৭ সেকেন্ড। ঢোকার আগেই সিসিটিভির ফুটেজ এড়াতে অভিনব কৌশল নেয় জালিয়াত চক্রের সদস্য। চেহারা লুকাতে মাথা নিচু করে প্রথমে বুথের ভেতরে প্রবেশ করে। এর পর মাথায় ক্যাপ পরে সে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য চুরি করতে বসিয়েছিল ‘স্কিমিং ডিভাইস’। পরে ক্লোন কার্ড তৈরি করে টাকা তুলে নেয়।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানী এলাকায় বেসরকারি ইউসিবি (ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক) বুথে ঢুকে এমন জালিয়াতি করেছে এক যুবক। সিসিটিভির ফুটেজে ধরা পড়েছে পুরো দৃশ্য। এরই মধ্যে এ ঘটনায় বনানী থানায় দায়ের করা মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ। গুরুত্ব বিবেচনা করে গতকাল রোববার মামলাটি স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক তদন্তে দেখা যায়, অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার সময় ১৯৩ গ্রাহকের তথ্য চুরি করেছে প্রতারক চক্রটি। এসব কার্ড এরই মধ্যে নিষ্ক্রিয় করে গ্রাহককে জানানো হয়েছে। এর বাইরে ইবিএল, ইউসিবি ও সিটি ব্যাংকের কার্ডধারী যেসব গ্রাহক নিজস্ব এটিএম বুথে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাদের কার্ডও নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর ইবিএলসহ কয়েকটি ব্যাংকের যে ২৮ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা খোয়া যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের টাকা ফেরতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের গুলশান অঞ্চলের সিনিয়র সহকারী কমিশনার রফিকুল ইসলাম জানান, জালিয়াতি করে বুথ থেকে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। চক্রটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তদন্ত সূত্র জানায়, ৭ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪২ মিনিটে সুঠাম দেহের অধিকারী এক ব্যক্তি বনানী এলাকার ইউসিবি ব্যাংকের একটি বুথে ঢুকে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসায়। তার চেহারা দেখতে বিদেশি নাগরিকের মতো। বিশেষ যন্ত্রটিতে তাকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। যন্ত্রটি গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করতে পারে। ইউসিবির এটিএম ব্যবহার করে ইস্টার্ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ডে টাকা উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে। চক্রটি ইস্টার্ন ব্যাংকের কয়েকজন এটিএম কার্ডকারী গ্রাহকের হিসাব নম্বর থেকে টাকা তুলে নিয়েছে। পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত এক লাখ ২৬ হাজার টাকা তুলে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, এটিএম বুথে টাকা নেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন যুবক বিদেশি নাগরিক হতে পারে বিবেচনায় দেশের সব বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সিসিটিভি থেকে নেওয়া সন্দেহভাজন যুবকের অস্পষ্ট ছবি স্থল, বিমান ও নৌবন্দরে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংকের বুথে এমন জালিয়াতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা অত্যন্ত ধূর্ত। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনায় তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এর সঙ্গে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন কি-না তাও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত : বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনটি টিম গতকাল থেকে চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। জানা গেছে, ইস্টার্ন ব্যাংকের চারটি, ইউসিবি ও দ্য সিটির একটি করে বুথে প্রতারকরা হানা দেয়। এসব বুথে যে সময় স্কিমিং ডিভাইস লাগানো ছিল, ততক্ষণে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের ১৯৩ গ্রাহকের গোপন তথ্য তারা চুরি করে। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আরও কয়েকশ’ গ্রাহক ওই সময়ে লেনদেন করেছেন।

প্রসঙ্গত, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ, বাংলাদেশ (এনপিএসবি) নামে আন্তঃব্যাংক নেটওয়ার্ক তদারকি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এনপিএসবিতে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে নির্দিষ্ট ব্যাংকের কার্ডধারী যদি ওই ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা তোলেন, তাহলে তা এনপিএসবিতে হিসাব থাকবে না। ওই তথ্য নির্দিষ্ট ব্যাংকের কাছে থাকবে। তবে নিজস্ব ব্যাংকের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সংরক্ষিত না থাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কতজন ওই সময়ে লেনদেন করেছেন, তা এখনও সুনির্দিষ্ট করা যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা সমকালকে বলেন, ইবিএলের চারটি এটিএম বুথ ও অন্য দুই ব্যাংকের দুটি বুথে স্কিমিং ডিভাইস লাগিয়ে কার্ডের তথ্য চুরির ঘটনা ঘটেছে। যেসব ব্যাংকের বুথে ডিভাইস লাগানোর তথ্য পাওয়া গেছে, ওই সময়ে লেনদেন হওয়া সব কার্ড নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্য কোনো ব্যাংকের বুথে এ ধরনের ঘটনা থাকলে তা যাচাই করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, এনপিএসবিকে ‘চিপ বেজড কার্ড’ ব্যবহার উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। দেশের অধিকাংশ ব্যাংক যেহেতু এখনও চিপ বেজড কার্ডে যেতে পারেনি, এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা সময় নিচ্ছে। প্রসঙ্গত, চিপ বেজড কার্ড অধিকতর নিরাপদ।

দেশের বৃহত্তম এটিএম সেবাদানকারী ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোহাম্মদ শিরিন বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ও এটিএম বুথ ‘ম্যাগনেস্ট্রিপ’ পদ্ধতির। এ পদ্ধতির কার্ডের তথ্য সহজে চুরি করা যায়। এটিএম কার্ডের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ‘ইএমভি’র তথ্য চুরির সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাপী বড় কার্ড সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ইউরো-পে, মাস্টারকার্ড ও ভিসা কার্ডের যৌথ প্রযুক্তির এ পদ্ধতির এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস লাগিয়ে তথ্য চুরির সুযোগ নেই। বাংলাদেশে ডাচ্-বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ব্যাংক এখনও ইএমভি পদ্ধতির ডেবিট কার্ড সেবা শুরু করতে পারেনি। তিনি মনে করেন, গ্রাহকের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চিপ বেজড সেবা চালুর বিষয়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দিলেও বেশির ভাগ ব্যাংক এখনও তা চালু করতে পারেনি।

ইবিএলের বক্তব্য :গত কয়েক দিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইবিএলের কার্ডধারীদের টাকা খোয়া যাওয়ার তথ্য প্রকাশের বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে গতকাল একটি বক্তব্য পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ব্যাংকটির ২১ জন গ্রাহকের টাকা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ তারা পেয়েছেন। তবে তাদের কেউ ইবিএলের এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা তোলেননি। তাদের দুটি এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসানোর তথ্য পাওয়া গেছে। ওই সময়ে এ দুই বুথে যত কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে, তা ব্লক করে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সমকাল