মেইন ম্যেনু

এফডিসি ফিরে পাচ্ছে তার হারানো জৌলুস

বিএফডিসি’র সামনে গিয়ে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলেন যে আপনার চিরচেনা বিএফডিসি আর নেই। গেটের পাশের টিনশেড বিল্ডিং, ফাঁকা জায়গা আর গায়ে লাল রঙ মেখে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ৩ নম্বর ও ৪ নম্বর ফ্লোরও নেই। গেটের জায়গায় দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল শপিং কমপ্লেক্স, সিনেপ্লক্স, আর মিডিয়া হাব। কেমন হবে? হ্যাঁ, এমন পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে বিএফডিসির অবকাঠামোতে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) বাংলা চলচ্চিত্রের আঁতুড় ঘর। অথচ অবহেলা অযত্ন আর সময়োপযোগী উদ্যোগের কারণে বিএফডিসি হারিয়েছে তার অাগের জৌলুস। তবে আশার কথা, আবারো ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছে বিএফডিসি। করা হবে অবকাঠামোগত উন্নয়নও। শোনা যাচ্ছে বিএফডিসিতে নির্মিত হবে বহুতল ভবন, সিনেপ্লেক্সসহ নানাকিছু।

বিএফডিসি’র বর্তমান অবস্থা খুব একটা ভালো না। জরাজীর্ন ফ্লোর আর টেকিনিক্যাল যন্ত্রপাতির অভাবে প্রযোজক পরিচালকরা ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলেন না। ঠিক এই সময়েই শোনা গেল বিএফডিসিতে নির্মিত হবে বহুতল ভবন, অবকাঠামোগত উন্নয়নও করা হবে।

জানা যায়, বিএফডিসির সম্মুখভাগ জায়গায় নির্মিত হবে বহুতল ভবন। বসুন্ধরা শপিংমলের আদলে নির্মিত এই বহুতল ভবনটি হবে ২০ তলারও বেশি। ইতিমধ্যেই ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএফডিসি’র পরিচালক (কারিগরী ও প্রকৌশল) মোহাম্মদ আজম।

তিনি জানান, ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর বিএফডিসি পরিচালনা পর্ষদের ২৯১ তম সভায় ভবন নির্মাণের প্রস্তাবের ভিত্তিতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি বিএফডিসি পরিচালনা পর্ষদের ২৯তম সভায় ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। আর এ নির্দেশের ফলেই পরিচালক (কারিগরী ও প্রকৌশল) মোহম্মদ আজম-এর তত্বাবধানে বিএফডিসি’র বহুতল ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, ‘২৯৩-তম সভায় বহুতল ফিল্ম ও বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে যথাযথ বিধিবিধান অনুসরণ এবং আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কতিপয় স্থাপনা ভাঙা এবং মালামাল বিক্রির অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

এই সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হচ্ছেন পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে উপস্থিত থাকেন তথ্যসচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব/যুগ্মসচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব/যুগ্ম সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত/যুগ্ম সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত/যুগ্ম সচিব, বিএফডিসির এমডি, প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি।

এদিকে মাস দুয়েক আগে ভবন নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা পরিদর্শন ও পুরনো স্থাপনা পরিদর্শন করে তা পরিত্যাক্ত ঘোষণা ও ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত অধিদপ্তরেরর পরিদর্শক দল সরেজমিনে পরিদর্শন করেও গেছেন। পরিদর্শক দল রিপোর্ট জমা দিলেই শুরু হবে পুরনো স্থাপনা ভাঙার কাজ।

এদিকে জানা যায়, ভবন নির্মাণের জন্য একজন কনসালটেন্টও নিয়োগ দেওয়া হবে। সেই কনসাল্টেন্ট-এর পরামর্শ মতোই গঠন করা হবে বহুতল ভবনের অবকাঠামো। কি কি থাকবে এই অবকাঠামোতে-
প্রাথমিকভাবে একটা পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ পরিকল্পনা পরিবর্তনও হতে পারে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় যা থাকছে তা হলো:

সিনেপ্রেক্স
বসুন্ধরা স্টার সিনেপ্লেক্স এর আদলে গড়ে তোলা হবে একটি সিনেপ্লেক্স। এতে করে বিএফডিসি যেমন আয় করবে তেমনি প্রযোজকদেরও ছবি প্রদর্শনের সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে।

শুটিং ফ্লোর
বিএফডিসির এই বহুতল ভবনের কয়েকটি ফ্লোরকে শুটিং করার উপযোগী করে নির্মাণ করা হবে। এই সমস্ত শুটিং ফ্লোরে ম্যাকআপ রুম থেকে শুরু করে সমস্ত সুযোগ সুবিধা পাবে ব্যবহারকারীরা। সাশ্রয়ী ভাড়াতেই ফ্লোরগুলো ভাড়া নিতে পারবেন পরিচালক-প্রযোজকরা।

শপিং কমপ্লেক্স
বহুতল এই ভবনে থাকবে শপিং কমপ্লেক্সও। নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে দোকান ভাড়া নিতে পারবেন আগ্রহীরা।

চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থাগুলোর অফিস
শুধুমাত্র সিনেপ্লেক্স বা শপিং কমপ্লেক্স নয়, এই ভবনকে একটি মিডিয়া হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সে কারণে এখানে যেমন প্রযোজক পরিচালকরা অফিস নিতে পারবেন তেমনি কোনো চ্যানেল বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও প্লেস ভাড়া নিতে পারবে।

ফুডকোর্ট/ আবাসিক হোটেল/ রেস্ট হাউস
নির্মিতব্য বহুতল এই ভবনে থাকবে ফুডকোর্ট। এমনকি আবাসিক হোটেল বা রেস্ট হাউস নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

সুইমিং পুল
পাঁচতারা হোটেলগুলোর মতো করে এই বহুতল ভবনে নির্মাণ করা হবে দৃষ্টিনন্দন সুইমিং পুল।

জিম
নায়ক-নায়িকাদের শরীর ঠিক রাখতে নিয়মিত জিম করতে হয়। আর তা যদি বিএফডিসিতেই হয়ে যায় তাহলে তো এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়ে গেল। শুটিং করতে এসে জিমটাও সেরে নিতে পারবেন তারা। এমন কিছু মাথায় রেখেই এই ভবনে নির্মাণ করা হবে অত্যাধুনিক জিম।

বিএফডিসির গেট দিয়ে ঢুকেই চোখের সামনে যে গেট, ফাঁকা জায়গা, পাশের টিনশেড তা হারিয়ে যাবে। আর লাল রঙ মেখে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সগর্বে দাঁড়িয়ে থাকা ৩ নম্বর আর ৪ নম্বর ফ্লোরও থাকছে না। শুধু তাই নয়, এসবের পাশে জরাজীর্ন সুইমিং পুলটিও হারিয়ে যাবে বহুতল ভবনের গর্ভে।

অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন
বহুতল এ ভবন প্রকল্পের বাইরেও বেশকিছু উন্নয়নমুলক কাজ হাতে নিবে বিএফডিসি। ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার এই প্রজেক্টে থাকবে শুটিং স্পট আধুনিকায়ন, নতুন স্পট নির্মাণ, ঝর্ণা স্পট মেরামত, বিএফডিসির অভ্যন্তরে সুইমিং পুল নির্মাণ, গেটের আধুনিকায়ন, ভেতরের রাস্তার উন্নয়ন, বাগান সৃজনসহ আরও নানাকিছু।

এই কর্মসূচিটি তথ্য মন্ত্রণালয় ঘুরে এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ে অবস্থান করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড় পেলেই শুরু হবে উন্নয়নমুলক কাজ।

বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে প্রায় ৭-৮ মাস আগে এই কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়া হয় তথ্যমন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে পাশ হয়ে কর্মপরিকল্পনাটি মাস দুয়েক আগে অর্থমন্ত্রণালয়ে পৌঁছে। অর্থমন্ত্রণালয় থেকে পাশ হলেই বিএফডিসি’র অভ্যন্তরীণ এই উন্নয়নমুলক কাজ শুরু হবে।

প্রকল্পগুলো নিয়ে বিএফডিসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) মোহাম্মদ আজম জানান, ‘আমরা চেষ্টা করছি একটি উন্নত ও আধুনিক বিএফডিসি গড়ে তুলতে সেজন্য ফিল্ম কমপ্লেক্স নির্মাণ করে একটি ফিল্ম হাব গড়ে তোলার লক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। জানিনা কবে নাগাদ প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখবে। তবে এতটুকু বলতে পারি খুব শিগগিরই আপনারা উন্নত এক বিএফডিসডি দেখতে পাবেন।’

শুধু তাই নয়, বিএফডিসির প্রশাসনিক কার্যক্রমেও যুক্ত হবে ডিজিটাল প্রক্রিয়া। বিএফডিসির র্যাকভর্তি ফাইলগুলো জায়গা করে নিবে কম্পিউটারে।

এদিকে ডিজিটাল মেশিন বসানোসহ আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বিএফডিসি। পরিচালক (উৎপাদন) লক্ষণ চন্দ্র দেবনাথ-এর তত্বাবধানে ডিজিটাল ক্যামেরাসহ বেশকিছু যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে বিএফডিসিতে।

এ প্রসঙ্গে লক্ষণ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘ক্যামেরা, এডিটিং সিস্টেম, লাইটসহ বেশকিছু আধুনিক ইকুইপমেন্ট ক্রয় করছি আমরা। এর ফলে বিএফডিসিতেই সবকাজ শেষ করতে পারবেন প্রযোজক পরিচালকরা।’

বিএফডিসির বহুতল ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন চলচ্চিত্রের জন্য কতটা সুবিধাজনক হবে তা জানতে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অমিত হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র ভবন নির্মাণ বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই চলচ্চিত্রের উন্নয়ন হবে বলে আমি মনে করি না। কারণ যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে তা চলচ্চিত্রের মানুষদের জন্য কতটা সহনশীল হবে সেটাও ভাবা দরকার। এখন অবকাঠামোগত উন্নয় করার পর ফ্লোর ভাড়া বাড়িয়ে দিলেন, চলচ্চিত্রের যারা কাজ করে তাদেরকে সুযোগ না দিয়ে বেশি মুনাফা লাভের আশায় বাইরের লোকজনকে সেই সুবিধা দিলে তো চলচ্চিত্রের উন্নয়ন হবে না। যেটা বর্তমানে প্রতিনিয়ত হচ্ছে। আমি মনে করি উন্নয়ন অবশ্যই দরকার কিন্তু সেটা হবে চলচ্চিত্রের মানুষদের কথা ভেবে।’

বিএফডিসি’র ভবন নির্মাণের ফলে চলচ্চিত্রের কোনো উন্নয়ন হবে না বলে জানিয়ে পরিচালক সমিতির সহ-সভাপতি সোহানুর রহমান সোহান বলেন, ‌’বিএফডিসিতে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ফলে চলচ্চিত্রের উন্নয়নের বদলে বিএফডিসিকে ব্যবহার করে ব্যবসা করা হবে। এটা আমরা আশা করি না। আমরা চাই চলচ্চিত্রের উন্নয়ন। প্রযোজক-পরিচালকরা যাতে বিএফডিসিতে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারে সে দিকে তাদের নজর দেওয়া উচিত।’ প্রিয়.কম