মেইন ম্যেনু

এমপিও বহির্ভুত শিক্ষকদের প্রতি নিষ্ঠুরতা আর কতদিন?

ড. মোহাম্মদ এমরান হোসেন : শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। তাঁর নিরলস চেষ্টায় শিক্ষা ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের জন্য তিনি ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার। মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি সংগঠন তাকে ‘শিক্ষাবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ইতোমধ্যে দেশের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরাও এ স্কেলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও সরকার ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি চরম সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ।

সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও থাকতে পারে। সফলতাকে উপজীব্য করে ধরে রাখতে হলে দেশে আর কি কি সমস্যা আছে সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। সমস্যা ও সমাধান একটি চলমান প্রক্রিয়া। কখনো কখনো ছোট-খাট একটি সমস্যা বা ব্যর্থতা সব সফলতাকে ম্লান করে দিতে পারে।

এ সরকারের শত সফলতার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে একটি অবহেলা জ্বলন্ত সমস্যা হিসেবে বিরাজমান। এমপিওবহির্ভুত শিক্ষকদের চরম অবহেলা ও অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন শতকরা শতভাগ বৃদ্ধি করে তাদের ডাল-ভাতের পরিবর্তে মাছ-ভাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অপর দিকে এমপিওবহির্ভুত শিক্ষকদের অবহেলা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন করে অভুক্ত রাখা হয়েছে। এটি নিন্দনীয়।

সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এতে আমাদের অন্তরে আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন আমরা উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু প্রায় আট হাজারের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক এমপিওবহির্ভুত শিক্ষক দারীদ্রসীমার নিচে বসবাস করছেন। কাজেই আমাদের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার মিল কোথায়? শিক্ষক সমাজকে যদি এক বেলা পাঠ দান করে অপর বেলা পেটের দায়ে কামলা খাটতে হয় তাহলে কি করে আমরা জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবো? শিক্ষক সমাজকে যদি অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের ন্যায় মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য অপরের নিকট হাত পাততে হয় তাহলে শিক্ষকতার পেশাকে মহান পেশা হিসেবে আখ্যায়িত করার কোন যৌক্তিকতা থাকে কি?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছেলে এবং তাঁর তথ্য উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক দুর এগিয়েও গিয়েছি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছেন সেই আইসিটি শিক্ষকদেরকে অভুক্ত রাখা হয়েছে। এটাই কি তাদের পুরস্কার? মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক হাজার ৩৫২ জন এবং মাদ্রাসার প্রায় ৫ শতাধিক আইসিটি শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

এমপিওবহির্ভুত শিক্ষক-কর্মচারীরাও মানুষ। তারাও এদেশের নাগরিক। তারাও অনেক স্বপ্ন নিয়ে লেখা পড়া করেছেন। তারা তাদের স্ত্রীদের হক আদায় করতে পারছেন না, তাদের নিষ্পাপ শিশুদের যথাযথ যতœ নিতে পারছেন না। তাদের অনেকের উপর তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা যত্ন নির্ভর করছে, যেই মা-বাবা অনেক স্বপ্ন নিয়ে, অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে তাদেরকে লেখা পড়া শিখিয়েছেন। যেই মা-বাবা বুক ভরা আশা নিয়ে তাদেরকে লেখা পড়া শিখিয়েছেন তাদের অনেকেই বুক ভরা ব্যাথা নিয়ে ইহধাম ত্যাগ করেছেন।

অনেক শিক্ষক বেতন না পেয়েই অবসরে গেছেন এমনকি কেউ কেউ বেতনের মুখ না দেখেই চির না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এমপিওবহির্ভুত শিক্ষকেরা তাদের স্ত্রীদের কাছে নিজেদেরকে একজন সার্থক স্বামী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছেন। সন্তানদের নিকট একজন অযোগ্য পিতা হিসেবে তারা গন্য হচ্ছেন। শিক্ষিত হয়েও পরিবারে একটি বোঝা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। মা-বাবার হক আদায় করতে না পেরে, উপয্ক্তু স্বামী ও যথার্থ দায়িত্ব পালনকারী পিতা হতে না পেরে তারা হয়ত অন্তরে অন্তরে কাঁদছেন এবং তাদের অন্তরে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে। তাদের প্রতি এ নিষ্ঠুরতা আর কতদিন চলবে? এ নিষ্ঠুরতার অবসান হওয়া উচিত।

যাদের মনোজগতে এত ব্যাথা, এত দুঃশ্চিন্তা তাদের দ্বারা শ্রেণিতে যথার্থ পাঠদান হতে পারে না। ফলে ঐ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ লাখ ছাত্র-ছাত্রীদের সুপ্ত মেধার যথার্থ বিকাশ ঘটতে পারে না। এর জন্য দায়-দায়িত্ব কে নিবে? এর দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানরত শিক্ষকদের ভরণ-পোষণের দায়-দায়িত্বও নৈতিকভাবে সরকারের উপর বর্তায়। কেউ যদি তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানকে তার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় কিন্তু তার ভরণ-পোষণের দায়-দায়িত্ব না নেয় তাহলে তার সিদ্ধান্তকে পৃথিবীর কেউ সঠিক বলবে না। অনুরূপভাবে সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরও বেতন না দেওয়া কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

শিক্ষামন্ত্রীর নিকট আমাদের আবেদন, শিক্ষক সমাজের নিকট আপনি একজন সফল শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। আপনি সকলের আস্থাভাজনে পরিণত হয়েছেন। শিক্ষক সমাজ আপনাকে প্রকৃত অভিভাবক ও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানোন্নয়নে আপনি তৎপর ও আন্তরিক এ কথা সবাই বিশ্বাস করেন। আপনার শিক্ষা পরিবারের কিছু সদস্য মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের জন্য আপনার মন কাঁদা উচিত। আপনি আরো তৎপর হবেন, আরো সচেষ্ট হবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এক মন দুধে একটু মল পড়লে সমস্ত দুধই নষ্ট হয়ে যায়। অনুরূপভাবে এমপিওভুক্তির দ্বার না খুললে শিক্ষা ক্ষেত্রের সমস্ত সফলতাই নষ্ট হয়ে যাবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমাদের বিনীত আবেদন, এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের আপনি একজন সচেতন অভিভাবক। অসহায় মানুষের প্রতি আপনার হৃদয় খুব নরম। মানবেতর জীবন যাপনকারী এ দেশের শিক্ষিত সমাজের একটি অংশের প্রতি আপনি দয়াদ্রচিত্ত হবেন দেশের নাগরিক হিসেবে হতভাগ্য শিক্ষকদের এটাই প্রত্যাশা। রূপকল্প-২০২১ এর সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানুষ গড়ার কারিগর ও জাতির মেরুদ- গঠনে নিয়োজিত অভুক্ত শিক্ষক সমাজের প্রতি আপনি সদয় দৃষ্টি দান করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

বাধ্য হয়ে এমপিওবহির্ভুত শিক্ষক-কর্মচারীরা শ্রেণিতে না গিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আগামী ১১ মে বুধবার ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছেন। আমরা আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ১০মে সূর্যাস্তের পূর্বেই এমপিওভুক্তির ঘোষণা দিয়ে হতাশাগ্রস্থ শিক্ষকদের আশস্ত করবেন এবং সমস্যার ইতি টানবেন।

লেখক: অধ্যক্ষ, শংকরবাটী হেফজুল উলুম এফ. কে. কামিল মাদ্রাসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।