মেইন ম্যেনু

এলপিজি ব্যবহারে ভর্তুকি যাবে ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে

দেশের মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ পাইপ লাইনের গ্যাস ব্যবহার করে। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জনপ্রিয়তা থাকলেও অধিক দামের কারণে ব্যবহার কম। এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে তাই ব্যক্তি পর্যায়ে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এলপিজি ব্যবহারকারীর জন্য সংরক্ষিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভর্তুকির এ অর্থ সরবরাহ করা হবে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ১৯ নভেম্বর পেট্রোবাংলার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে এক বৈঠকে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ভর্তুকি দেয়ার উপায় নিয়েও আলোচনা হয়।

কেন ভর্তুকি
এখন দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনমিটার। পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ৭৭ কোটি ঘনমিটারের কিছু বেশি। দেশের বর্তমান গ্যাস মজুত ১০-১২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট)। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে বর্তমান ব্যবহারের হারে আগামী এক দশকের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। তখন এলপিজি হয়ে ওঠবে অন্যতম বিকল্প।

এলপিজিতে ভর্তুকির প্রয়োজনিয়তা সম্পর্কে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশে প্রায় ২০ লাখ আবাসিক পরিবার গৃহস্থালির কাজে পাইপ লাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন। অর্থাৎ প্রায় এক কোটি জনগণ পাইপ লাইনের গ্যাসের সুবিধা পান, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশ। বাকি ৯৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে। এ বৈষম্য থেকে মুক্তি দিতেই ভর্তুকি দিয়ে হলেও এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক মূল্য হিসাবেও আবাসিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে এলপিজি ব্যবহার দেশের জন্য লাভজনক। কারণ আবাসিকে একটি গ্যাস সংযোগ দিতে পাইপ লাইনসহ সরকারের মাথাপিছু লাখ টাকার ওপরে খরচ হয়। কিন্তু বছরে রাজস্ব আয় হয় মাত্র ৮ হাজার টাকা।’

তামিম বলেন, ‘বর্তমানে গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত গ্যাস দিয়ে অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আর এক হাজার মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র সারা বছর চললে জিডিপিতে শিল্প খাতে বছরে ৪০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হয়।’ তাই এলপিজির ব্যবহার বাড়িয়ে ধীরে ধীরে পাইপ লাইন গ্যাসের ব্যবহার কমানো উচিৎ বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই বিশেষজ্ঞ।

সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুসারে, সম্প্রতি দাম বাড়ানোর পরও বাংলাদেশে একজন আবাসিক গ্রাহক পাইপ লাইনের গ্যাস ব্যবহার করে (দুই চুলার মাসিক হিসাবের ভিত্তিতে গ্যাস লাগে ৮৮ ঘনমিটার) মাসে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকা ব্যয় করেন। সেখানে ভারতের একজন গ্রাহকের ব্যয় হয় চার হাজার টাকা, পাকিস্তানে ব্যয় হয় তিন হাজার টাকা। আবার পাইপ লাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারে (১২ দশমিক ৮ কেজি একটি বোতলের মূল্য দেড় হাজার টাকা ধরে) দেশে একজন গ্রাহকের মাসে ব্যয় হয় তিন হাজার টাকা। তাই সংশ্লিষ্টরা এ খাতে ভর্তুকি জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন।

ভর্তুকির আর্থিক দিকটি ব্যাখ্যা করে আরেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আবাসিকের গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সে বর্ধিত মূল্য এলপিজিতে ভর্তুকি দেয়া যায়।’

গত ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতেও গ্যাসের বর্ধিত মূল্য থেকে এলপিজির ওপর ভর্তুকি দেয়ার দাবি ওঠে। এরপর গত ২৭ আগস্ট গ্রাহক পর্যায়ে ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), যা সেপ্টেম্বর মাস থেকে কার্যকর হয়। এ ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ আদেশ ৪ নভেম্বর প্রকাশিত হয়। সে আদেশে গ্যাসের সম্পদ মূল্য (প্রতি হাজার ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ২৫ টাকা) থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ নিয়ে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল-ইএসএফ’ নামের ফান্ডটি গঠনের কথা বলা হয়। এতে বছরে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা জমা হবে বলে জানায় বিইআরসি। আমদানিকৃত তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও এলপি গ্যাসের ব্যবহারে ভর্তুকি যোগাতে এ ফান্ডের অর্থ কাজে লাগানো হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।

এদিকে ১৯ নভেম্বরের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বিকল্প হিসেবে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ এলাকায় এলপিজির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এলপি গ্যাস রান্না, শিল্প, বাণিজ্য এমনকি যানবাহনেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে পাইপ লাইনের গ্যাসের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় এর ব্যবহার কম। বৈঠকে এ বিষয়ে ভারতের উদাহরণ টেনে বলা হয়, এলপিজি ক্রেতার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ভর্তুকির অর্থ বছর শেষে তাতে জমা দেয়া হবে। এ জন্য একটি কমিটি কাজ করছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

তথ্য মতে, ভারতে প্রতিটি রেজিস্টার্ড ব্যবহারকারী পরিবার ভর্তুকিসহ বছরে ১২টি এলপিজি বোতল কিনতে পারে। দেশটিতে ১৪ দশমিক ২ কেজির একটি বোতলের বাজারমূল্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ রুপি (টাকায় ১ হাজার ১৬০ থেকে ১ হাজার ৩৯০ টাকা)। থাইল্যান্ডেও সরকার এলপিজিতে ভর্তুকি দেয় বলে জানা গেছে।

এলপি গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ
সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে এলপি গ্যাসের চাহিদা বছরে অন্তত তিন লাখ মেট্রিক টন। আর বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মতে এ চাহিদা সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টন। সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানি মিলে বছরে সরবরাহ করা হয় প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার টন।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস আমদানি, সিলিন্ডারজাত ও বিপণনের লাইসেন্স নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় ২০টি এখন পর্যন্ত কোনো কার্যক্রম শুরু করেনি।

সরাকরি পর্যায়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)র নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানি এলপিজি লিমিটেড বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন এলপি গ্যাস সরবরাহ করে। আর দেশি-বিদেশি মিলে মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠান নিজেরা এলপি গ্যাস আমদানি করে বাজারজাত করছে। দেশি প্রতিষ্ঠান চারটি হচ্ছে- বসুন্ধরা, যমুনা স্পেসটেক, ওমেরা এলপিজি ও বিএম এনার্জি। বিদেশি দুই প্রতিষ্ঠান হলো- পেট্রিগ্যাজ (সাবেক ক্লিনহিট) ও টোটাল গ্যাস। এ কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশ ব্যবহার করছে। আর কিছু কোম্পানি আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করে বাজারে বিক্রি করছে।বাংলামেইল