মেইন ম্যেনু

ঐতিহ্য পূবালী ব্যাংক ভবন সংস্কারের দাবি কুমিল্লার নাগরিক সমাজের

মাসুদ আলম, কুমিল্লা প্রতিনিধি:  শত বছরের পুরোনো কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার পূবালী ব্যাংক ভবনটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন কুমিল্লার নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। শুধু নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাই নয় নগরবাসীরও প্রাণের দাবি কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটি সংস্কার করা হোক।

গত ২৫ জুলাই পরিচর্যার অভাবে গজে উঠা একটি বট গাছের শিকড়রের কারেন শত বছরের পুরোনো ব্যাংকের ভবনের পেছনের অংশের একাংশ ধ্বসে পড়ে দুই জন আহত হয়। পরে সিটি কর্পোরেশন ঝুঁলে থাকা ভবনের কার্নিশ গুলো ভেঙ্গে ফেলে। এ সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাত দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু। সিটি মেয়রের এ নির্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাধারণ মানুষও।

জানা গেছে, নগরীর কান্দিরপাড় এলাকার শত বছরের পুরোনো নান্দনিক এই ব্যাংক ভবনটির একাংশের কার্নিশ ধ্বসে পড়াকে কেন্দ্র করে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর ভবনটি ভেঙে ফেলার এ নির্দেশের প্রতিবাদ জানিয়েছেন কুমিল্লার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সর্বস্তরের জনগণ। তাদের দাবি কুমিল্লার প্রাণ কেন্দ্র কান্দিরপার এলাকায় অবস্থিত নান্দনিক এই ভবনটিকে না ভেঙ্গে সংস্কার করে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষনা করা হোক । তাহলে কুমিল্লার সুন্দর্য আরো বৃদ্ধি পাবে।

এ ব্যাপরে কুমিল্লার সুশীল সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জানান, চাকরির হাজিরা ঠিক থাকলে চাকুরি কখনো যায় না, ঠিক তেমনি ইমারত সব সময় মেরামত করে রাখলে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে। যার নজির ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, পৃথিবীর বহুপ্রাচীন স্থাপনা যেমন আগ্রার তাজমহল, ঢাকার আহসান মঞ্জিল, বৃটেনের ট্যাফলগার স্কয়ার, ভারতের কলকাতায় রাইটার্স বিল্ডিং এমনকি দিল্লির মোঘল আমলের স্থাপনাগুলো যদি চার/পাঁচ শত বছর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তাহলে কেন ১৯১৪ সালে নির্মিত মাত্র শত বছরের পুরোনো পূবালী ব্যাংক ভবন ভেঙ্গে ফেলতে হবে?

তারা আরো বলেন, বহু আগ থেকেই শুনে আসছি কুমিল্লা নগরীর প্রাণ কেন্দ্রে একমাত্র নান্দনিক ভবনটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে ভবনটি ভেঙ্গে হাইরাইজ ভবন ও ব্যাংকের জায়গা রেখে মার্কেট করবে। এই জায়গায় আমরা মার্কেট চাইনা। আমরা চাই আমাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে।

এদিকে, শত বছরের পুরোনো পূবালী ব্যাংক ভবনের জায়গাটি সরকারি খাস জমি বলে জানা গেছে। যা পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫২ বছর অবৈধভাবে দখল করে আসছিল। যার খতিয়ান সরকাররি ‘ক’ তফসিলভুক্ত ১/১ খতিয়ানের সম্পত্তি। ওই সম্পত্তির খতিয়ান নং- ৩৬৯। দাগ নং ৭৮৬ ও ৭৮৭। জায়গার পরিমান ০.৩৬।

অবৈধভাবে দখলকৃত জায়গাটি ছেড়ে যাওয়ার জন্য কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের সহকারী কমিশনার মো: আরিফুল ইসলাম সরদার ২০১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী পূরালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিখিত ভাবে একটি কারণ দর্শানো নোর্টিশও প্রদান করেন। এমনকি বর্তমানেও সরকারি খাস জমি নিয়ে জেলা প্রশাসন ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সাথে একটি মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

পূবালী ব্যাংক ভবন নিয়ে কুমিল্লার সাংষ্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শাহাজান চৌধুরী বলেন, ২০১৪ সালে যখন কুমিল্লার নান্দনিক ঐতিহ্যবাহী পূবালী ব্যাংক ভবনটির শতবর্ষের পদার্পন করলে আমি ১০ আগষ্ট ২০১৪ সালে স্থানীয় একটি দৈনিকে ‘‘হারিয়ে যা”েছ কি, কুমিল্লার ঐতিহ্য পূবালী চত্ত্বর?’’ এই শিরোনামে কুমিল্লার ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি লেখা লিখে ছিলাম। সেখানেই আমি ঈংগিত করেছিলাম পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভবনটি ভেঙ্গে ফেলার চিন্তা করছে।

দীর্ঘ ২ বছর পর ভবনটির সামান্য কার্নিশ ভেঙ্গে পড়ায় পুরো পূবালী ব্যাংক ভবন ভাঙ্গার নির্দেশের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভবনটির সামান্য একটি অংশ ভেঙ্গে পড়ায় যদি পুরো পূবালী ব্যাংক ভবনটি ভাঙ্গতে হয়, তাহলে আমাদের মনে হয় রাণীর দীঘিতে পাড়ে যদি কেউ মারা যায় এজন্য কি রাণীর দীঘিও ভরাট করে ফেলতে হবে ? এসব ভাঙ্গা গড়ার চিন্তা না করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে আমাদের কুমিল্লাবাসীর দাবি জানানো উচিত। যেন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী এই নান্দনিক ভবনটিকে সংস্কার করে ‘‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’’ হিসেবে ঘোষনা করা হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ভূদেব মজুমদার (স্বপন), মির সেন গুপ্ত, পার্থ সারতি দত্ত, বেলায়েত হোসেন অভিযোগ করে বলেন, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী পূবালী ব্যাংক ভবনটি ধ্বংস করার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা জেলা প্রশাসক, সিটি কর্পোরেশ ও এমপি সাহেবের কাছে আবেদন করি যেন নান্দনিক এই ভবনটি না ভেঙ্গে সংস্কার করা হয়। তারা আরো জানান, এ ব্যাপারে রোববার সংসদ সদস্য হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সাথে বসবেন দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিক উল্লাহ খোকন।

দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতিক উল্লাহ খোকন বলেন, পূবালী ব্যাংক কুমিল্লার ঐতিহ্যের এপিট-ওপিটের সাথে জড়িয়ে গেছে। আমরা চাইনা যে কুমিল্লার ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে মার্কেট নির্মান করা হক। সংসদ সদস্য হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের সাথে রোববার বসবো যেন ভবনটি না ভেঙ্গে সংস্কার করা হয়।

কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল বলেন, শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী পূবালী ব্যাংক ভবন শুধু একটি ভবন নয়! এই ভবনটির নামে কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানের নামকরণও করা হয়েছে পূবালী চত্ত্বর। আমি মনে করি, ঐতিহ্যবাহী এই নান্দনিক ভবনটা না ভেঙ্গে সংস্কার করলেই শত বছরের এই ভবনটা আরো শত বছর দাঁড়িয়ে থাকবে। এমনকি বর্ধিত হবে কুমিল্লার সুন্দর্য, হারিয়ে যাবে না ঐতিহ্য।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহমেদ বাবুল বলেন, কুমিল্লা মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি যেন পূবালী ব্যাংক ভবনটি ভেঙ্গে কুমিল্লার ঐতিহ্য বিলপ্তি না ঘটায়। এমনিতেই এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে কুমিল্লা ঐতিহাসিক স্থান গুলো।

এ বিষয়ে সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ভবনটির কার্নিশটা ধ্বসে পড়ার পর রাতেই আমরা ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা গুলো ভেঙ্গে অপসারণ করি। তিনি বলেন, ভবনটি যেহেতু অনেক পুরাতন, জরাজীর্ণ সেহেতু কিভাবে ভুবনটি সংস্কারের মধ্যে ঐতিহ্যটি রক্ষা করা যায়। এনিয়ে জেলা প্রশাসক ও এমপি সাহেবের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।