মেইন ম্যেনু

ওদের ট্রেন, মোদের ট্রেন

শিরোনাম সার্থক করতে গেলে দিস্তা দিস্তা কাগজ লাগবে। ১৯৩টি দেশ, একেকটি ধরে ধরে এক প্রতিবেদনে লেখা সম্ভব? ‘শব্দসীমা’ বলেও তো একটি বিষয় রয়েছে। বরং বিশ্বে সবদিক দিয়ে প্রতিনিধিত্বকারী দেশগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা যেতে পারে।

বিভিন্ন সময় পেশাগত প্রয়োজনে নানান দেশে সফর করেছেন সহকর্মীরা। গোয়ালের বাইরের ঘাস গরু না খেলেও, এক্ষেত্রে উল্টো অবস্থানেই থাকাটাই যৌক্তিক মনে হলো।

আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেলব্যবস্থা ইউরোপে। হতেই হবে! কেননা ইউরোপের ২৮টি দেশ এই ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। এটিকে বলে, ‘ইউরেল’। আমরা সবাই জানি, ইউরোপের যেকোনো একটি দেশের ভিসা মিললে বাকি দেশগুলোতেও ভ্রমণ করা যায়। ইউরেল এটিকেই আরও সহজ করে তোলে।

খুব বেশিদিন হয়নি ইউরোপ ঘুরে এসেছেন বিশেষ প্রতিবেদক রহমান মাসুদ। মাসুদ ভাইয়ের কাছে কথা পাড়তেই গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসলেন, ফ্রান্স থেকেই আমার যাত্রা শুরু হয়। বিশ্বের ২য় সর্বোচ্চ গতিসম্পন্ন (ঘণ্টায় ৫০০ কিমি) ট্রেন (টিজিবি ট্রেন) রয়েছে দেশটির। ইউরোপে প্লেনের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া বেশি ট্রেনে। তাও ভ্রমণের জন্য ট্রেনই তাদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। রয়েছে ‘এ-প্লাস’ (ভিআইপি) ও ‘এ’ (সাধারণ) শ্রেণির ট্রেন। এছাড়া দেশের ভেতর রয়েছে আন্তঃনগর এসএনসিএফ ট্রেন। দূর-দূরান্ত মানুষ অফিস ও প্রয়োজনীয় কাজ সেরে চলে যায়। রয়েছে মেট্রোরেল, ট্রাম ও দোতলা ট্রেন।

‘ইউরোপের একটি মজার ব্যাপার হলো, যতো আগে টিকিট কাটা যায় টিকিটের দাম ততো কম। ভ্রমণের তারিখ যতো কাছে আসে ততো ভাড়া বাড়তে থাকে। অনেকসময় তিনগুণ দামেও কাটতে হয়। খুব সাশ্রয়ী ভ্রমণের জন্য সাপ্তাহিক, মাসিক, ষান্মাসিক বা বাৎসরিক কার্ড করে নেওয়া যায়। তাহলে আর বারবার টিকিট কাটার ঝামেলা থাকবে না। সব স্টেশনেই টিকিট বা কার্ড করার মহাযজ্ঞ রয়েছে। ক্যাশ, ক্রেডিট কার্ড, ট্রাভেল কার্ড, ইউরেল পাস- সব মাধ্যমেই সুলভ ব্যবস্থা রয়েছে। সেবাদানকারী কর্মকর্তারা রয়েছেন, শুধু গিয়ে বললেই হবে।’

তবে ইউরোপে ট্রেনভ্রমণ ব্যয়বহুল হলেও ভীষণ উপভোগ্য, বলেই শেষ টানেন মাসুদ ভাই।

হেড অব নিউজ মাহমুদ মেনন ভাই দীর্ঘদিন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও কভার করেছেন সেদেশে গিয়ে। দুর্দান্ত সময়ানুবর্তিতা ও সেবা দিয়েই তার মন কেড়েছে ইউএস রেল।

‘তাদের আন্তঃরাজ্য ট্রেনগুলোকে বলে ‘এম-ট্র্যাক’। প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে যায়, ভাড়াও বেশি। তবে বছরের বিভিন্ন সময় ছাড় থাকে। নির্দিষ্ট সিজন, মাস, দিন, সময়কে কেন্দ্র করে ছাড়গুলো থাকে। সেসময় টিকিট কাটলে অনেক কমে পাওয়া যায়।’

বেশ মজার একটি বিষয়ও জানালেন, কেউ আড়াই ডলার দিয়ে টিকিট কেটে একবার মেট্রো স্টেশন ঢুকলে সারাদিন ট্রেনে চড়েই কাটিয়ে দিতে পারবে। তবে একবার স্টেশন থেকে বেরোলেই মেয়াদ শেষ, ফের নতুন টিকিট। পুরো ব্যবস্থা খুব অত্যানুধিক, স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরজা খোলে-বন্ধ হয়। এজন্য বিশেষ সতর্ক থাকার কথা বলে দিতে ভুললেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রে টিকিটব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি অনলাইন নির্ভরই বলা চলে। এখানে মাসিক-বাৎসরিক কার্ড করার সুযোগ রয়েছে তবে সবাই অনলাইনেই কাজ সেরে নেন।

মেনন ভাইয়ের প্রায় একইরকম অভিজ্ঞতা জাপানের ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হয়ে সেদেশে ঘুরে এসেছেন। জানালেন, সিস্টেম এতো অত্যানুধিক আর নিখুঁত যে একদম সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় এসে দাঁড়াবে। এতোটুকু এদিক-ওদিক হবে না! বুলেট ট্রেন ছাড়াও জাপানেও রয়েছে আন্তঃনগর, লোকাল ও মেট্রো ট্রেন। ট্রেনের ভেতরের পরিবেশের তো জুড়ি নেই। ঝকঝকে-তকতকে, নির্ঝঞ্ঝাট।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় বরাবরই এগিয়ে রাশিয়া। কদিন আগে এটম এক্সপো-২০১৬ সফরে রাশিয়ার পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে একই মত বিশেষ প্রতিবেদক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ ভাইয়েরও, আমার শুধু মেট্রো ট্রেনে চড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সারাদিন প্রতি ৯০ সেকেন্ড পর পর ট্রেন আসছে। অফিস টাইমে আসে ৪৫ সেকেন্ড পরপর। প্রতিদিন প্রায় ৯৫ লাখ মস্কোবাসী মেট্রোর সুবিধা উপভোগ করে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজ মাতৃভূমির সঙ্গে তুলনা চলে আসে। অধিকাংশ দেশে ট্রেন যোগাযোগের প্রধান ও জনপ্রিয় মাধ্যম হলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে বাসের তুলনায় ট্রেন সেভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের ট্রেনের সার্বিক দুর্গতি ও দুরাবস্থা নিয়ে দু’’কথা লিখতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না, প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। ঠিক সময়ে ঠিক ট্রেন আসা নিয়ে অনেক কৌতুকও রয়েছে।

তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-রাজশাহী-সিলেট রুটে সুবর্ণ এক্সপ্রেস, তুর্ণা নিশীথা, পারাবাত এক্সপ্রেসসহ অনেক ট্রেন সঠিক সময় মেনে চলে। দেশের বাস্তবতায় সেগুলো ভ্রমণসেবাও বেশ সন্তোষজনক।

পারাবাত এক্সপ্রেসের অভিজ্ঞতা একদম তরতাজা! কক্সবাজারের পর ‘বছরজুড়ে দেশঘুরে’র এবারের পব সিলেট। বৃহস্পতিবার (১৪ জুলাই) কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করেছে প্রথম টিম। সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটের ট্রেন, ছাড়ে ১০ মিনিট পর। উঁচু-নিচু টিলা পেরিয়ে ট্রেন শ্রীমঙ্গল পৌঁছায় যথাসময়েই। ট্রেনের ভেতরকার পরিবেশও উপভোগ্য। দু’ধারে ফেলে যাওয়া গ্রাম-নদী-গাছ দেখতে দেখতে কখন যে চায়ের দেশে পৌঁছে যাবেন- টেরই পাবেন না!

পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় অঞ্চল সিলেটে পারাবত ছাড়াও রাজধানী থেকে নিয়ে যাবে-আসবে উপবন,জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস ও সুরমা মেইল। বিভিন্ন সময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় এগুলোর সেবা ও সময়ানুবর্তিতার মান সন্তোষজনক।

তবে বাকিদের নোংরা সিট, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও স্যানিটেশন, গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি অবস্থা, টিকিটের কালোবাজারি, অনুন্নত অবকাঠামো ইত্যাদি সমস্যার কথাও ভুলে গেলে চলবে না।

এসব নিয়ে ক্ষোভ সিরাজ ভাইয়েরও, প্রতিবেশী দেশ ভারতে টিকিটে ভ্রমণকারীর নাম লেখা থাকে। চেংকিংয়ের সময় আইডি কার্ডের সঙ্গে নাম মেলায়। এই একটি ব্যবস্থা চালু করলেই পরদিন থেকে টিকিট কালোবাজারী উঠে যাবে। তাদের সেবা ও সময়ানুবর্তিতার মানও বেশ ভালো।

বলা হয়, ইউরোপ আমাদের চেয়ে একশো বছর এগিয়ে আছে। এই একশো বছর আসলে কী? সময়! তারা এগিয়ে যাচ্ছে কারণ, সময়ের মূল্য তারা বোঝে। এজন্য তাদের ট্রেন এক মিনিটও দেরি করে না। আমাদের দেশেও যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেন তাহলে সময়ানুবর্তিতার লেজ ধরে আশাকরি বাকি বিষয়গুলোও চলে আসবে। এ বিষয়টি নিয়ে কারও খুবএকটা দ্বিমত থাকার কথা নয় আশাকরি।বাংলানিউজ