মেইন ম্যেনু

শুনানিতে আসেনি ৫ এজেন্সি

ওমরাহর নামে মানব পাচার : সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি

পবিত্র ওমরাহ পালনের নামে মানব পাচারের অভিযোগে ১০৪টি এজেন্সিকে শুনানির জন্য ডাকা হলেও ৫টি এজেন্সির মালিক বা তাদের পক্ষে কেউই তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দেয়নি। যে সব এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ উঠেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে সৌদি আরব সরকারের পক্ষ থেকে যে ১১ হাজার ৪৮৫ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছে তার অনেকাংশেরই সত্যতা মেলেনি। তাদের অনেকেই দেশে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামান।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামিম মো. আফজালের কক্ষে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ও শেষ দিন ৫২টি হজ ও ট্রাভেলস এজেন্সিকে ডাকা হয়। এতে মেরিডিয়ান এয়ার সার্ভিস, এহসান এয়ার ট্রাভেলস ও অরবিটান এয়ার ট্রাভেলসের মালিক বা প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত মঙ্গলবার প্রথম দিন ৫২টি এজেন্সিকে তদন্ত কমিটি ডাকলেও উইংস ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরস ও হাশিম ওভারসিজের প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন।

চলতি বছর পবিত্র ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে গিয়ে ১০৪টি হজ ও ট্রাভেলস এজেন্সির ১১ হাজার ৪৮৫ জন ফিরে আসেননি বলে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে গত ১০ আগস্ট বাংলাদেশের ধর্ম মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গত ২৩ আগস্ট ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. শহিদুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।

তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (হজ) নাসির উদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব কাজী নাজির হোসেন, ধর্মমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ড. মো. আবুল কালাম আজাদ ও বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব নায়েব আলী মণ্ডল।

এরপর অভিযুক্ত এজেন্সিগুলোর কাছে বিষয়টি জানার জন্য ১ ও ৩ সেপ্টেম্বর শুনানির জন্য ডাকে তদন্ত কমিটি।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বায়তুল মোকাররমে ইফা ডিজির কক্ষে অভিযুক্ত এজেন্সিদের নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি চলে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। শুনানিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এজেন্সিগুলোর মালিকরা না এসে অফিসের কর্মকর্তাদের পাঠিয়েছেন। হাসান ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার আবসারুল বেলায়েত চৌধুরী বলেন, তার এজেন্সির মালিক হাসান নুর চৌধুরী হজের কাজে ব্যস্ত আছেন। তাই তিনি আসেননি। তার এজেন্সির দু’জন দেশে ফিরে আসেননি। তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন।

লাব্বায়েক ট্রাভেলসের মালিক হজ এজেন্সি এসোসিয়েশনের (হাব) সাবেক সভাপতি জামাল উদ্দিন আহম্মদের মালিকানাধীন লাব্বাইক ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরস এবং তার ছোটভাই কাউছার উদ্দিনের নামে লাইসেন্স করা লাব্বাইক ওভারসিজের ২০৫ জন হজে গিয়ে ফিরে আসেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, আমার এজেন্সির দু’জন ফিরে আসেনি। বাকি সবাই ফিরে এসেছে। যে দু’জন ফিরে আসেননি তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য তার পরিবারকে চাপ দেওয়া হয়েছে। আর ওই দু’জনকে যিনি আমাকে দিয়েছিলেন, তিনি তাদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিয়েছেন।

হাবের ইসি সদস্য সৈয়দ গোলাম সারোয়ারের চ্যালেঞ্জার ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরস এবং তার স্ত্রীর (কানিজ) নামে কানিজ ট্রাভেলসের ২৮ জন হাজী দেশে ফিরে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে গোলাম সারোয়ার বলেন, দু’জন বাদে সবাই দেশে ফিরে এসেছেন। তদন্ত কমিটির কাছে এর ডকুমেন্ট দেখিয়েছি।

দু’জন কেন ফিরে আসেনি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বুঝতে পারিনি যে তারা সেখানে থেকে যাবে। তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। থানায় জিডিও করা হয়েছে।

এদিকে হজ এজেন্সির মালিকদের সংগঠন হাবের মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেছেন, ১০৪টি এজেন্সির যে তালিকা মন্ত্রণালয়ে এসেছে তা সৌদি সরকারের নয়। এটি হাবের মতই সে দেশের একটি বেসরকারি এসোসিয়েশন মোয়াসাসা অফিসের। এর আগে তারা ৮০টি এজেন্সির তালিকা দিয়েছিল, এখন আবার ১০৪টি এজেন্সির তালিকা দিয়েছে।

তবে তার এ তথ্য সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই তালিকা সৌদি সরকারের কাছ থেকেই এসেছে। এবং সে অনুযায়ীই সরকার আমাদের এ তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছে।

সৌদি সরকার যে তালিকা দিয়েছে, তদন্তে তার মিল পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে শহিদুজ্জামান বলেন, সৌদি সরকার যে পরিসংখ্যান দিয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায়নি। তারা যে ১১ হাজার ৪৮৫ জনের তালিকা দিয়েছে তাদের অনেকেই দেশে চলে এসেছেন। ১০৪টি এজেন্সির মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাদের অজান্তেই কিছু লোক সেখানে (সৌদিতে) রয়ে গেছে। তারা তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছেন। মামলাও করেছেন কেউ কেউ।

তিনি বলেন, হজ-ওমরাহ লাইসেন্স নীতিমালা অনুযায়ী যদি কোনো লোক হজে গিয়ে ফিরে না আসে, তাহলে সে দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এজেন্সির।

তদন্ত প্রতিবেদন কতদিন নাগাদ দাখিল করবেন জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, ‘আপনারা জানেন হজের কার্যক্রম একেবারে পিক আওয়ারে। হজ ফ্লাইট চলছে। বিভিন্ন দিকে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। এরপরও আমরা তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুতই দেওয়ার চেষ্টা করব।

আমরা শুনানিতে যা পেয়েছি মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করব। সরকার সিদ্ধান্ত নিবে। এ ছাড়া এ কমিটির পরও এ্যাপিলাট অথরিটি আছে।

তদন্ত কমিটির ওপর কোনো চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। কোনো চাপ নেই।

অনেক এজেন্সিরই আইডি খোলা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে— এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেই কিছু কিছু এজেন্সির আইডি লক করে দেওয়া হয়েছে। কেন খোলা যাচ্ছে না তা দেখা হবে।

উল্লেখ্য যে, সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে যে ১০৪টি এজেন্সির বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছেন হাবের বর্তমান ও সাবেক কমিটির নেতারা। বর্তমান কমিটির সভাপতি ইব্রাহিম বাহারের মেগাটপ ট্রাভেলস ইন্টারন্যাশনাল (প্রা.) লিমিটেডের ৬৭ জন, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিনের মুনা ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেডের ২১৮ জন, ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমেদ মজুমদারের গোল্ডেন বেঙ্গল ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরসের ৪৫১ জন ও মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর সনজরী ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরসের ৬৫ জন উল্লেখযোগ্য। এ নিয়ে গত ২৫ আগস্ট ‘ওমরাহর নামে মানব পাচার : শীর্ষে হাব নেতাদের এজেন্সি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।