মেইন ম্যেনু

ওরা অবসরপ্রাপ্ত ৭ সৈনিক: গ্রামের মানুষকে বিনামূল্যে চলচ্চিত্র দেখানো যাদের কাজ

অন্ধকার গ্রামের এই একটি জায়গায় উজ্জ্বল আলো। চারপাশ আলোকিত হচ্ছে এই আলোয়। এই আলো ছিট্‌কে পড়ছে একটি প্রজেক্টরের পর্দা থেকে। পর্দায় চলচ্চিত্র দেখানো হচ্ছে। গ্রামবাসীদের কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখছেন। নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু-কিশোর—সব বয়সী দর্শক আছেন এখানে। প্রজেক্টরে চলচ্চিত্র দেখাচ্ছেন ৮ জন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। তাদের গায়ে সামরিক পোশাকের মতো পোশাক। সবার বয়স ৫০-এর আশেপাশে। সবাই পুরুষ। চীনা মুক্তিফৌজ থেকে অবসর নেওয়ার পর বিগত ২০ বছর ধরে তারা সপ্তাহে দু’দিন অর্থাত শনিবার ও রবিবার গ্রামবাসীদের চলচ্চিত্র দেখানোর কাজটি করে আসছেন। আজকের ‘পুবের জানালা’য় আমরা তাদের গল্প বলবো।

১৯৯৬ সালের জুন মাস। লিউ চিন চেং টেলিভিশনে একটি খবর দেখলেন। চীনের লিয়াও নিং প্রদেশের একটি গ্রামে ৬০ বছর বয়সী একজন মহিলা তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছেন সিনেমা দেখাতে। তিনি এক সাংবাদিককে জানালেন, তার ছেলে ২০ বছরে একবারও চলচ্চিত্র দেখেনি। তিনি তার ছেলেকে চলচ্চিত্র দেখাতে চান। দৃশ্যটি লিউ চিন চেংকে মর্মাহত করলো। ওই রাতে তিনি ঘুমাতে পারলেন না। তিনি নিজে প্রশ্ন করলেন: কেন চীনে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ নীতি চালুর ২০ বছর পরও অসংখ্য গ্রামের মানুষ চলচ্চিত্র দেখা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে? আমি কি তাদের জন্য কিছু করতে পারি না? ঠিক তখনই গ্রামের মানুষকে বিনামূল্যে চলচ্চিত্র দেখানোর ধারণা তার মনে আসে।

এর আগে ১৯৯৪ সালে লিউ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। কর্মক্ষেত্রে তার অনেক বন্ধু ছিল। তিনি ৭ জন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এই সাতজনও তার মতো সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। ৮ বন্ধুই ভালো সৈনিক ছিলেন। কর্মরত অবস্থায় তারা মোট ২৮টি পদক পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ জন আবার সেনাবাহিনীতে প্রজেকশনিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। সরকারি চাকরি ছাড়ার পর ৮ জনই বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তো তাদের হাতে সময় বলতে আছে শনিবার ও রবিবার। তারা সপ্তাহে দু’দিন গ্রামবাসীদের সেবায় উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

কিন্তু গ্রামবাসীদের সিনেমা দেখানোর জন্য প্রজেক্টর প্রয়োজন, যথাযথ পর্দা বা স্ক্রিন প্রয়োজন। এসব তাদের নেই। তারা নিজেদের জমানো টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয় করেন। লিউ চিন চেং নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য সঞ্চয়কৃত ৫০ হাজার ইউয়ান খরচ করেন। এভাবে গড়ে ওঠে একটি দল।

তাদের প্রথম গন্তব্য ছিল দূরবর্তী একটি গ্রাম। গ্রামের নাম দোয়েল। ১৯৯৬ সালের অক্টোবর মাস। দোয়েল গ্রামের বাসিন্দারা নতুন কাপড় পরে উৎসবের আমেজে গ্রামের একটি প্রাথমিক স্কুলে আসে। স্কুলের খেলার মাঠে প্রজেক্টরে চলচ্চিত্র দেখানো হবে। চারপাশের উঁচু দেওয়াল, গাছ বা বাসার ছাদেও মানুষের ভিড়।

গ্রামবাসীদের অনেকে এই প্রথম চলচ্চিত্র দেখতে পেলো। কিছুদিন পর, লিউ চিন চেং ও তার দল কযেকজন শিক্ষার্থীর একটি যৌথ চিঠি পেলো। তারা চিঠিতে জানিয়েছে,

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তারা অনেককিছু শিখেছে এবং তারা আরও মন দিয়ে লেখাপড়া করবে। লিউ চিন চেং বলেন, এ চিঠি পড়ার পর তিনি বুঝেছেন যে তাদেরকে এ কাজ চালিয়ে যেতে হবে। চলচ্চিত্রের প্রতি গ্রামবাসীদের আগ্রহও তাদের উৎসাহিত করছে।

লিয়াও নিং প্রদেশের লিং হাই জেলার ওয়েন চিয়া কো গ্রামে একটি স্কুল আছে। স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ৪ জন। তাদের একজন শিক্ষক আছে এবং এ শিক্ষক স্কুলের প্রধানও বটে। পাহাড়ে অবস্থিত এ স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা বাইরের জগত সম্পর্কে কিছুই জানে না। চলচ্চিত্র দেখা ছিল তাদের অনেক দিনের ইচ্ছা।

১৯৯৭ সালের শরত্কাল। লিউ চিন চেং তার দল নিয়ে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের একটি চলচ্চিত্র দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ওই স্কুলে যাওয়ার পথ সহজ নয়। তাদের মিনিবাস পাহাড়ের উপরে উঠতে পারে না। তাই পাহাড়ের পাদদেশে গাড়ি রেখে তারা পায়ে হেঁটে উঠতে লাগলেন। সাথে বিভিন্ন সরঞ্জাম। কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে হয় তাদের। একসময় তারা স্কুলে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে তাদের কাপড়, পা, হাত কাটার আঘাতে জর্জরিত।

তারা ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিয়ে আসেন কিছু শিক্ষা-সামগ্রী ও মনিহারী পণ্য। ওই দিন এ গ্রামে প্রথমবারের মতো প্রদর্শিত হয় একটি চলচ্চিত্র। স্কুলের প্রধান ওয়া কুই ওয়েনের চোখ দুটো সজল হয়ে ওঠে। তিনি লিউ চিন চেং ও তার দলের সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, শিশুদের জন্য তারা বাইরের জগতকে গ্রামে নিয়ে এসেছেন। শিশুরা পাহাড়ের ফুল দিয়ে বানানো একটি তোড়া তাদেরকে উপহার দেয়। তাদের কেউ কেউ লিউ চিন চেং ও তার দলের সদস্যদের মতো হতে চায় বলে জানায়।

গেল ২০ বছরে লিউ চিন চেং ও তার দল হাজারের বেশি গ্রামে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছে। লিউ চিন চেং বলেন, প্রজেক্টরের শব্দ তার সবচে’ ভালো লাগে।

১৯৯৮ সালের বসন্ত উৎসবে লিউ চিন চেং ও তার দল একটি গ্রামে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য গেলেন। শীতকালে ঘরের বাইরের তাপমাত্রা তখন মাইনাস ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তো, বরফ হয়ে যাওয়া একটি নদী অতিক্রম করার সময় তাদের গাড়িটি একটি গর্তে পড়ে যায়। তাদেরকে নগ্নপদে বরফে দাঁড়িয়ে গাড়ি ঠেলতে হয়। বরফে তাদের পা কেটে যায় এবং নদীর বরফের কিছু অংশ হয়ে যায় রক্তলাল। কিন্তু এ কষ্ট তাদের দমাতে পারেনি। গ্রামে পৌঁছে তারা বিশ্রাম নিলেন না, বা কিছু খেলেনও না। কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষে যখন তারা ডিনার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন দেখা গেল খাবার সব ঠাণ্ডায় জমে গেছে। গত ২০ বছরে তারা যখনই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য কোথাও গেছেন, তাদের কপালে গরম খাবার জোটেনি। কারণ, তারা কখনও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কোনো সুবিধা নেন না; টাকা-পয়সা তো দূরের কথা।

ক্লান্ত হলে মিনিবাসে একটু ঘুম, খিদে লাগলে ব্রেড এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলস খান তারা। যত রাতেই চলচ্চিত্র দেখানো শেষ হোক না কেন, তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে হয়। কারণ, পরের দিন তাদের অফিস আছে। মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষ তাদের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা হাসিমুখে তা প্রত্যাখ্যান করেন। লিউ চিন চেং বলেন, “আমরা তাদের সুবিধা দিতে এখানে আসি। তাদের কাছ থেকে খাবার বা টাকা নিয়ে কষ্ট দিতে চাই না। টাকা ব্যয় করেই যদি তাদের চলচ্চিত্র দেখতে হয়, তবে এ কাজের জন্য পেশাদার লোকজনই উপযুক্ত, আমরা নই।”

গত ২০ বছরে লিউ চিন চেং ও তার দল নিজেদের তহবিল থেকে ১০ লাখ ইউয়ান ব্যয় করে ৬০০০টির বেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করেছেন। ২৬ লাখের বেশি মানুষ তাদের প্রদর্শিত চলচ্চিত্র উপভোগ করেছেন।

শুরুর দিকে লিউ চিন চেং-এর দলের লোকসংখ্যা ছিল ৮। হান কুও সি তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তবে তার শরীরের অবস্থা ভাল না। ১৯৯৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেলেন। তখন তার বয়স মাত্র ৪২ বছর। তার স্ত্রী জানালেন, শরীর খারাপ নিয়েও তিনি দলের হয়ে সবসময় কাজ করতে পছন্দ করতেন। তিনি একবার স্বামীকে জিজ্ঞাস করেছিলেন, ‘কেন এত পরিশ্রমের কাজ করেন?’ স্বামী বলেছিলেন, ‘বাড়িতে বসে থেকে ১০০ বছর বেঁচেও আনন্দ নাই।’ হান কুও সির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর বাকি ৭ জন নিয়মিতভাবে গ্রামে চলচ্চিত্র দেখাতে থাকেন। একদিন হান কুও সির স্ত্রী তার মেয়েকে নিয়ে গোপনে গ্রামে গেলেন। তারা ৭ জনের দলটিকে সাহায্য করতে চাইলেন। লিউ চিন চেং ও তার দলের বাকি ৬ সদস্য তাদের দেখে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেলেন। হান কুও সির স্ত্রী তখন বলেন, “আমার স্বামী একবার বলেছেন, ‘একজন মানুষকে সারা জীবনে কিছু-না-কিছু অর্থবহ কাজ করতে হবে।’ এ পৃথিবীতে তিনি এখন নেই। কিন্তু তার স্বপ্নের কাজটি আমি করে যেতে চাই।’

এতদিন দলটিতে ৮ জন সদস্য ছিল। প্রতিবার যাত্রার সময় নাম ডাকা হয়। এখন হান কুও সির নাম ডাকা হলে বাকি ৭ জন একসাথে উত্তর দেন। প্রতিবছর তারা হানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

২০০৮ সালে যখন চীনের সি ছুয়ান প্রদেশের ভয়াবহ ভূমিকম্প হয় তখন তারা ওখানে যান। খাবার বিতরণ ছাড়া তারা দুর্গত লোকদের জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। তারা আশা করেন, এতে দুর্গত লোকগুলো মানসিক শক্তি লাভ করবে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে তারা মোট দু’বার সি ছুয়ান প্রদেশে গিয়ে দুর্গত এলাকার মানুষদের চলচ্চিত্র দেখিয়েছেন।

২০১৩ সালে তারা একটি দ্বীপে গিয়ে ওখানে দায়িত্বপালনরত মাত্র একজন সৈনিকের জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। ওখানে একটি কুকুর ছাড়া সৈনিকটির কোনো সাথী নেই। সৈনিকটি সেদিন ৪টি চলচ্চিত্র দেখেন।

জীবন চলচ্চিত্র নয়। ৭ জনের জীবনে নানা কষ্ট আছে। তবে তারা কখনও নিজেদের কাজের বিজ্ঞাপন প্রচার করেননি। লিউ চিন চেং বলেন, সৈন্যবাহিনীতে

থাকাকালে কমান্ডার তাদের ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করতেন। এ কথা এখনও তাদের মনে আছে। লিউ চিন চেং বলেন, মানুষ যতদিন চাইবে, ততদিন তার দল এ কাজ করবেন।

তাদের দেখাদেখি এখন হে পেই, সান সি ও হে লং চিয়াংসহ নানা প্রদেশে গঠিত হয়েছে ৬০টির বেশি দল। দলের সদস্যরা সবাই অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক এবং তারা বিভিন্ন স্থানে গ্রামবাসীদের চলচ্চিত্র দেখিয়ে থাকেন।-চায়নারেডিও